ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের জন্য এক গভীর শোকের সংবাদ। না ফেরার দেশে চলে গেলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পটেকর। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ায় নিজের বাসভবনে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সংজ্ঞা হারান তিনি। তড়িঘড়ি গোয়ার মণিপাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই দাপুটে অভিনেতা। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।
বৃহস্পতিবার ভোরে নিজের বাড়িতে বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন নানা পটেকর। তার পরেই সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান তিনি। পরিবারের পক্ষ থেকে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে একটি দল তাঁর গোয়ার বাড়িতে পৌঁছায়। কিন্তু ততক্ষণে তিনি পুরোপুরি অচৈতন্য হয়ে পড়েন। একটানা সিপিআর দেওয়ার পরেও সাড়া না মেলায় তাঁকে দ্রুত গোয়ার মণিপাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সংবাদসংস্থা এএনআই সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালে আনার আগেও সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করেছিলেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে সকাল সাড়ে ৫টা ২০ মিনিট নাগাদ নানাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে হাসপাতালেই তাঁর দেহের ময়নাতদন্ত করা হবে। অভিনেতার পুত্র মালহার পটেকর বাবার প্রয়াণের এই খবর সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন নানা পটেকর। তাঁর আসল নাম বিশ্বনাথ পটেকর, তবে অভিনয়জগতে তিনি ‘নানা’ নামেই বিশ্বজুড়ে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। চলচ্চিত্র এবং থিয়েটারে অভিনয়ে হাতেখড়ি হওয়ার আগে তিনি মুম্বইয়ের বিখ্যাত জেজে স্কুল অফ আর্ট-এ পড়াশোনা করেছিলেন।
১৯৭৮ সালে নীলকান্তি পটেকরকে বিয়ে করেন নানা। অভিনয়ের জগতে আসার আগে নীলকান্তি একটি ব্যাঙ্কে চাকরি করার পাশাপাশি থিয়েটারের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। থিয়েটারে কাজ করার সূত্রেই তাঁদের পরিচয় এবং পরবর্তীতে পরিণয়। নানার অভিনয়জীবনের শুরুর দিনগুলিতে তিনি ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হলেও বহু বছর ধরে আলাদা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের আনুষ্ঠানিক বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি।
বিয়ের পর তাঁদের প্রথম পুত্রসন্তান দুর্বাসার জন্ম হয়। তবে জন্ম থেকেই নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিল সে। মাত্র আড়াই বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। ছেলেকে হারানোর সেই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা নানা পটেকরের জীবনে গভীর ক্ষত ও প্রভাব ফেলেছিল। বহু বছর পর এক সাক্ষাৎকারে সেই কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি নিজের প্রতি কঠোর আত্মসমালোচনাও করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁদের দ্বিতীয় পুত্র মালহার পটেকরের জন্ম হয়।

অভিনয়ের তীব্রতা, সংলাপ উচ্চারণের নিজস্ব ভঙ্গি এবং জটিল ও গতানুগতিকতার বাইরের চরিত্রগুলোকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলার দক্ষতাই তাঁকে এক স্বতন্ত্র অভিনেতার মর্যাদা দিয়েছিল। তিন বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত এই অভিনেতার উল্লেখযোগ্য ছবির তালিকায় রয়েছে ‘নটসম্রাট’, ‘ওয়াজুদ’, ‘পরিন্দা’, ‘আব তক ছাপ্পান’ এবং ‘যশবন্ত’। মূলত হিন্দি এবং মরাঠী সিনেমায় দাপটের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি তিনি তামিল সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা ঘটেছিল।
নানা পটেকরের অভিনয়ে কেবল যৌবনের তেজ ছিল না; তাঁর অভিনয়ের নিজস্ব অভিধানে ছিল গলার স্বরের জাদুকরি ওঠানামা, চোখের স্থির দৃষ্টি, শরীরী ভাষা এবং সংলাপের স্বতন্ত্র ছন্দ। এই অভিনয়-ভাষাই কখনও চরিত্রকে করেছে ভয়ঙ্কর, কখনও অসহায়, আবার কখনও নিখাদ হাসির উৎস।
পরিন্দা: অণ্ণা শেঠের চরিত্রে হিংস্রতা ও মানসিক অস্থিরতার মিশ্রণ তাঁকে এনে দিয়েছিল জাতীয় পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ারের সেরা সহ-অভিনয়ের সম্মান।
ক্রান্তিবীর: প্রতাপনারায়ণ টিলকের চরিত্রে তাঁর ক্রোধ ও প্রতিবাদের বিস্ফোরণ তাঁকে জাতীয় স্তরে সেরা অভিনেতার শিরোপা এনে দেয়।
খামোশি: দ্য মিউজ়িক্যাল: শ্রবণ ও বাক্শক্তিহীন মেয়ের বাবার চরিত্রে সংলাপের চেয়ে মুখের অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষাকে প্রধান অস্ত্র বানিয়ে তিনি অনন্য নজির গড়েন।
নটসম্রাট: গণপত বেলভালকরের ভূমিকায় এসে নানা পটেকর যেন নিজের অভিনয়ক্ষমতার শেষ সীমানায় পৌঁছেছিলেন। সংলাপের চেয়েও সংলাপের পরের নীরবতা, অহঙ্কার থেকে অসহায়তায় রূপান্তর তাঁর মুখকেই এক জীবন্ত মঞ্চে পরিণত করেছিল।

চলতি বছরেই মুক্তি পাওয়া ‘সুবেদার’ সিনেমায় অনিল কপূরের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেছিলেন নানা। এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে মুক্তিপ্রাপ্ত বিশাল ভরদ্বাজের ‘ও রোমিয়ো’ সিনেমাতেও অভিনয় করেছিলেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৩ সালে তাঁকে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’তে ভূষিত করা হয়।
তাঁর মৃত্যুতে চলচ্চিত্র শিল্পে এক যুগের অবসান ঘটল। চরিত্রকে কেবল ফুটিয়ে তোলা নয়, চরিত্রের অস্বস্তি, ক্ষত আর ক্রোধকে নিজের শরীরের ভিতর দিয়ে দর্শকের সামনে দৃশ্যমান করে তোলার যে বিরল ক্ষমতা তাঁর ছিল, তা চিরকাল দর্শকের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে।
প্রতিনিধির নাম 
















