মোঃ ইশারাত আলী :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগের মধ্যেই গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে মেমো ও চালানবিহীন দুই ব্যারেল পেট্রোল ও এক ব্যারেল ডিজেল জব্দ করেছেন কালিগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাইনুল ইসলাম খান। ঘটনাটি ঘিরে পুরো উপজেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার (১৯ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার দিকে পরিচালিত অভিযানে কলেজের প্রধান ফটকের সামনে থেকে ভ্যানযোগে সরিয়ে নেওয়ার সময় তিন ব্যারেল জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়। এ সময় মালিকবিহীন দুটি মোটরসাইকেলও উদ্ধার করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মোটরসাইকেল দুটি প্রতিষ্ঠানের নৈশ প্রহরী মনিরুল ইসলামের জিম্মায় একটি কক্ষে তালাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দেন এসিল্যান্ড। অভিযানে কালিগঞ্জ থানার এসআই সাব্বিরের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল অংশ নেয়। খবর ছড়িয়ে পড়লে শতাধিক শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় করেন।
এই অভিযানের পর নতুন করে সামনে এসেছে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে বহুদিনের অভিযোগ। সম্প্রতি বদলি হওয়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও চিফ ইন্সট্রাক্টর (অটো) মো. হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, আর্থিক অনিয়ম, তহবিল আত্মসাৎ, শিক্ষক হয়রানি, ভাইভা বাণিজ্য এবং জ্বালানি তেল আত্মসাতের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার বিষয় ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে চার ব্যারেল জ্বালানি তেল আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তে স্টকের ঘাটতি ধরা পড়ার পর তা গোপন করতে রাতের আঁধারে নতুন করে তেল এনে মজুদের চেষ্টা করা হচ্ছিল। ঠিক সেই সময়ই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রশাসনের অভিযানে তিন ব্যারেল তেল জব্দ হয়।
এদিকে এর আগেও কলেজ থেকে কম্পিউটার, ফটোকপি মেশিন, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন সরকারি মালামাল রাতের অন্ধকারে সরিয়ে নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। তবে ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের চিফ ইন্সট্রাক্টর সঞ্জয় কুমার বাহাদুর অভিযোগ করেন, তাকে অন্যায়ভাবে ভোলা জেলার লালমোহনে বদলি করা হয়েছে। তার ভাষ্য, অনিয়মের প্রতিবাদ করায় তাকে টার্গেট করা হয়। অভিভাবক গোলাম রব্বানী বলেন, “যেসব শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নিতেন এবং শিক্ষার্থীদের ভালো পড়াতেন, তাদেরই বিভিন্নভাবে হয়রানি ও বদলি করা হয়েছে।”
যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশে অধ্যক্ষ হুমায়ুন কবিরকে ইতোমধ্যে বদলি করা হয়েছে, তবুও স্থানীয়দের অভিযোগ, তার গড়ে তোলা প্রভাববলয় এখনো সক্রিয় রয়েছে। তাদের দাবি, ব্যক্তি বদলি হলেও অনিয়মের সংস্কৃতি এখনো বন্ধ হয়নি।
শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে জ্বালানি তেল জব্দের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিতে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তবে উল্লেখ্য, অভিযানে জ্বালানি তেল জব্দের ঘটনা নিশ্চিত হলেও, হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত তদন্ত বা আদালতের কোনো রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে এসব অভিযোগ তদন্তসাপেক্ষ।
প্রতিনিধির নাম 

















