৯ সেপ্টেম্বর নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিচ্ছেদের দাবি, ১৭ সেপ্টেম্বর ইউপি সদস্যকে বিয়ে; অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের কেন্দ্রে ১১ বছরের সন্তান
মোঃ ইশারাত আলী :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে লাবনী সরকারকে ঘিরে ডিভোর্স, নতুন বিয়ে ও পারিবারিক বিরোধের ঘটনায় মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে দুই পক্ষ। লাবনী ও তাঁর পরিবারের দাবি, সাবেক স্বামী অর্জুন সরকারের সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ডিভোর্স সম্পন্ন করার পর ১৭ সেপ্টেম্বর তারালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য দেবপ্রসাদ মণ্ডল বাবুকে বিয়ে করেছেন তিনি।
অন্যদিকে অর্জুনের অভিযোগ, টিকটকের মাধ্যমে দেবপ্রসাদের সঙ্গে লাবনীর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার পর তিনি সংসার ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর দাবি, এ ঘটনায় তাঁদের ১১ বছরের সন্তান অর্ক সরকার মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ঘটনার পর স্থানীয় পর্যায়ে মূল প্রশ্ন উঠেছে ৯ সেপ্টেম্বরের কথিত বিচ্ছেদ এবং এর মাত্র আট দিনের মাথায় অনুষ্ঠিত নতুন বিয়ের আইনগত অবস্থান নিয়ে। বিশেষ করে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সম্পাদিত কোনো ঘোষণাপত্র বা হলফনামা একটি হিন্দু বিবাহের আইনগত অবসান ঘটিয়েছে কি না, তা নথিপত্র ও প্রযোজ্য আইনের আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নোটারি পাবলিকের সামনে হলফনামা বা ঘোষণাপত্র তৈরি করলেই একটি হিন্দু বিবাহ আইনগতভাবে বিলুপ্ত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। ১৯৪৬ সালের Hindu Married Women’s Right to Separate Residence and Maintenance Act-এর ২ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পৃথক বসবাস ও ভরণপোষণের অধিকার নিয়ে বিধান রয়েছে। তবে সেটি নিজে কোনো ‘ডিভোর্স ডিক্রি’ নয়। ফলে ৯ সেপ্টেম্বরের ৫৫৬/২৬ নম্বর নোটারি নথির প্রকৃতি, এর ভিত্তি এবং এর সঙ্গে কোনো আদালতের আদেশ বা মামলা সংশ্লিষ্ট আছে কি না, তা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১৭ সেপ্টেম্বরের নতুন বিয়ের বিষয়টি। দেবপ্রসাদ মণ্ডল দাবি করেছেন, তাঁরা বৈধভাবেই বিয়ে করেছেন। তবে এই বিয়ের আইনগত অবস্থান নির্ধারণে বিয়েটি কোন আইনের অধীনে, কোথায় এবং কী প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে, তা জানা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিবাহ নিবন্ধন আইন, ২০১২ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন, সনদ ও নিবন্ধকের রেকর্ড রয়েছে কি না, সেটিও যাচাইয়ের বিষয়। প্রথম বিবাহ আইনগতভাবে বহাল থাকলে দ্বিতীয় বিয়েকে ঘিরে আলাদা আইনি প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এই বিরোধের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হয়ে উঠেছে ১১ বছরের শিশু অর্ক সরকার। অর্জুনের দাবি, ১৭ সেপ্টেম্বর লাবনী অর্ককে নিয়ে বাবার বাড়িতে যান এবং পরে শিশুটিকে নবাবকাটি গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অর্ক মায়ের সঙ্গে থাকতে চাইছে এবং কান্নাকাটি করছে, এমন একটি ভিডিও বক্তব্যও অর্জুনের কাছে রয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন। অন্যদিকে লাবনীর পরিবারের বক্তব্য, দাম্পত্য সম্পর্কের অবসানের পর লাবনী নিজের সিদ্ধান্তেই নতুন জীবন শুরু করেছেন।
এদিকে পাল্টাপাল্টি অভিযোগে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। লাবনী ও তাঁর পরিবার সংবাদ সম্মেলনে অর্জুনের বিরুদ্ধে যৌতুক দাবি, মাদক সেবন ও মারধরের অভিযোগ তুলেছেন। এসব অভিযোগ অস্বীকার করে অর্জুন লাবনীর বিরুদ্ধে অন্য একজনের সঙ্গে সম্পর্ক ও সংসার ছেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন। একই সঙ্গে লাবনী বাড়ি ছাড়ার সময় নগদ আড়াই লাখ টাকা ও প্রায় আড়াই ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে গেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে লাবনীর পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
আইনগতভাবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে শুধু বক্তব্য যথেষ্ট নয়। মারধর বা যৌতুকের অভিযোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা সনদ, জিডি, মামলা, সাক্ষ্য বা অন্যান্য প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একইভাবে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার নেওয়ার দাবির পক্ষে কোনো জিডি, মামলা, রসিদ বা অন্য নথি রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।
অর্জুন গত ১৯ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে একটি আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে। তবে কোনো আবেদন করা হয়েছে মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এমন নয়। আদালত আবেদনটি কীভাবে গ্রহণ করেছেন, মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে কি না, তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কি না এবং পরবর্তী আদেশ কী, তা আদালতের নথি থেকেই নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
ঘটনাটির প্রকৃত আইনি অবস্থান স্পষ্ট করতে কয়েকটি নথি পর্যালোচনা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে অর্জুন ও লাবনীর মূল বিবাহের প্রমাণ ও নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি, ৯ সেপ্টেম্বরের ৫৫৬/২৬ নম্বর নোটারি নথির পূর্ণাঙ্গ কপি, ওই নথির ভিত্তি এবং এর সঙ্গে কোনো আদালতের মামলা বা আদেশ ছিল কি না।
একইভাবে ১৭ সেপ্টেম্বরের নতুন বিয়ের নিবন্ধন সনদ, সংশ্লিষ্ট বিবাহ নিবন্ধকের রেকর্ড, বিয়ের স্থান ও প্রযোজ্য আইন, অর্কের অভিভাবকত্ব বা হেফাজত নিয়ে কোনো আদালতের আদেশ আছে কি না এবং ১৯ সেপ্টেম্বর করা আদালতের আবেদনের কপি ও পরবর্তী আদেশও গুরুত্বপূর্ণ।
সব পক্ষের বক্তব্য ও নথি পাশাপাশি যাচাই না করে এ ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে ৯ সেপ্টেম্বরের কথিত বিচ্ছেদের আইনি প্রকৃতি, ১৭ সেপ্টেম্বরের নতুন বিয়ের বৈধতা এবং ১১ বছরের শিশু অর্কের নিরাপত্তা, অভিভাবকত্ব ও স্বাভাবিক পারিবারিক যোগাযোগের বিষয়গুলো আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে নোটারি নথি, বিবাহ নিবন্ধন, আদালতের আদেশ এবং অন্যান্য প্রামাণ্য নথিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হতে পারে।
প্রতিনিধির নাম 








