“লাভের আশায় কষ্টার্জিত টাকা জমা দিয়েছিলাম। এখন লাভ তো দূরের কথা, মূল টাকাটাও ফেরত পাচ্ছি না। অফিসে গেলে শুধু আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে কোনো সমাধান নেই।”
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে বুশরা গ্রুপের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ জমা রাখা এক গ্রাহকের এই আক্ষেপ এখন যেন হাজারো মানুষের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি। সঞ্চয় নিরাপদ থাকবে, মুনাফা পাওয়া যাবে এবং প্রয়োজনের সময় টাকা ফেরত মিলবে, এমন প্রত্যাশায় অর্থ জমা দিয়েছিলেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে টাকা ফেরত না পাওয়ার অভিযোগে ক্ষোভ বাড়ছে গ্রাহকদের মধ্যে।
বুশরা গ্রুপের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের আমানত ফেরত না দেওয়া, দীর্ঘসূত্রতা এবং পাওনা পরিশোধে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা আইনগতভাবে প্রমাণিত নয়। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যও রয়েছে। কিন্তু গ্রাহকদের অভিযোগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব একটি নথিতে ‘তারল্য সংকট’-এর উল্লেখ থাকায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বুশরা গ্রুপ লিমিটেডের প্যাডে প্রকাশিত ১২ আগস্ট ২০২৫ তারিখের একটি অফিস সার্কুলারে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলামের স্বাক্ষর রয়েছে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন কার্যক্রম কমে যাওয়ায় ‘তারল্য সংকটের কারণে’ চলতি অর্থবছরের মাসিক প্রকল্প ও সকল প্রকল্পের উত্তোলন কার্যক্রম নিয়মিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নথিতে তারল্য সংকটের উল্লেখ থাকায় গ্রাহকদের প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
যদি তারল্য সংকটের কারণে গ্রাহকদের টাকা পরিশোধে সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের মোট দায় কত? গ্রাহকদের কত টাকা পাওনা? প্রতিষ্ঠানের হাতে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে? আর সেই অর্থ কবে ও কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে?এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর চান ভুক্তভোগীরা।
গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওয়া একটি তালিকায় ২৩ জনের নাম ও তাদের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ উল্লেখ রয়েছে। তালিকাটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই ২৩ জনের মোট অর্থের পরিমাণ ১ কোটি টাকা।
তালিকায় সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা থাকা গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছেন নারায়ণপুরের শাহাবুদ্দীন, ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা; ছনকার মুন্না, ১০ লাখ টাকা এবং বাজারগ্রামের শফিকুল, ১০ লাখ টাকা।
এ ছাড়া মুর্শিদা ৫ লাখ ৫০ হাজার, মনোয়ারা ৫ লাখ, আঃ মালেক ৪ লাখ, পাপিয়া ৩ লাখ, আফরোজা ২ লাখ ৫০ হাজার, সাইদুল বাবু ২ লাখ, আঃ সোবাহান ২ লাখ, নাসরিন ২ লাখ, মুসলিমা ১ লাখ ৫০ হাজার, সুলতানা ১ লাখ ৫০ হাজার, আমিরুল ১ লাখ ১০ হাজার, আজমিরা ১ লাখ, ইছানুর ৮০ হাজার, মনোয়ারা (ছনকা) ৮০ হাজার, আজিয়ার ৭৫ হাজার, ফারহান ৪৮ হাজার এবং মর্জিনা ৩০ হাজার টাকা জমা রেখেছেন বলে তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।
তবে এই ২৩ জনের তালিকা কোনো পূর্ণাঙ্গ গ্রাহক তালিকা নয়। ফলে বুশরা গ্রুপের কাছে মোট কত টাকা আটকে আছে, তা এই তালিকা থেকে নির্ধারণ করা যায় না।
স্থানীয় গ্রাহকদের দাবি, কালিগঞ্জ উপজেলার ছনকা, গণপতি, শীতলপুর, রহিমপুর, বাজারগ্রাম ও চরদাহসহ আশপাশের এলাকায় বুশরা গ্রুপের বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুলসংখ্যক মানুষ অর্থ জমা রেখেছেন।
গ্রাহকদের একটি অংশের দাবি, স্থানীয়ভাবে গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। একই সঙ্গে ছনকা, গণপতি ও শীতলপুর এলাকায় বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে থাকার অভিযোগও রয়েছে।
তবে ১৫ হাজার গ্রাহক এবং শত কোটি টাকা আটকে থাকার দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকৃত সংখ্যা ও অর্থের পরিমাণ নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ গ্রাহক তালিকা এবং স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও তারা মূলধন কিংবা প্রত্যাশিত লভ্যাংশ পাচ্ছেন না। কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাননি বলে দাবি করেছেন।
গ্রাহকদের ভাষ্য, মানি রিসিট ও পাশবইয়ে তাদের জমাকৃত অর্থের প্রমাণ থাকলেও টাকা ফেরতের ক্ষেত্রে তারা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
একাধিক গ্রাহক বলেন, তাদের কেউ সংসারের প্রয়োজন মেটাতে, কেউ চিকিৎসার জন্য, আবার কেউ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অর্থ জমিয়েছিলেন। সেই টাকা আটকে যাওয়ায় পরিবারে আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে বুশরা গ্রুপের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমাদের তরল টাকা সংকটের কারণে টাকা দিতে পারিনি। আমরা চেষ্টা করছি।”
চেয়ারম্যানের বক্তব্যে তারল্য সংকটের বিষয়টি উঠে এলেও গ্রাহকদের প্রশ্ন, কত দিনের মধ্যে এই সংকট কাটবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তাদের পাওনা পরিশোধ করা হবে?
গ্রাহকরা মৌখিক আশ্বাসের পরিবর্তে লিখিত সময়সূচি, পূর্ণাঙ্গ হিসাব এবং কার্যকর অর্থ ফেরত পরিকল্পনা দাবি করছেন।
পরিস্থিতির সমাধানে সাতক্ষীরা-৩ (কালিগঞ্জ-আশাশুনি) আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মুহাঃ রবিউল বাশারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য হাফেজ মুহাঃ রবিউল বাশার বলেন, “আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি এবং বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। আমি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং এটি কীভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান করা যায়, তা নিয়ে আমি কাজ করব।”
বুশরা গ্রুপকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু সমাধানে এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে প্রকৃত হিসাব প্রকাশ।
গ্রাহকদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের মোট আমানত, মোট দায়, বর্তমান সম্পদ, ইতোমধ্যে কত টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং অবশিষ্ট অর্থ কীভাবে ও কত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা হবে, তা প্রকাশ্যে জানানো হোক।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, হাজার হাজার মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের বিষয়টি কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজন হলে স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষা, প্রশাসনিক তদন্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
কারণ এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের সঞ্চয়, ভবিষ্যৎ এবং বিশ্বাস।
তারল্য সংকট যদি সত্যিই থাকে, তাহলে মানুষের আমানত ফেরতের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ কোথায়?
মোঃ ইশারাত আলী 
















