Yazoo-Mississippi Delta অঞ্চলের সামাজিক-অর্থনৈতিক বন্যাঝুঁকি মূল্যায়নে স্থানভিত্তিক গবেষণা কাঠামো | আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা ও নীতিনির্ধারণ
নিজস্ব প্রতিবেদক :
দুর্যোগের ঝুঁকি কি শুধু বন্যার পানি, নদীর প্রবাহ কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে? নাকি মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থান, জীবনযাত্রা, সম্পদের প্রাপ্যতা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাও নির্ধারণ করে একটি জনগোষ্ঠী কতটা ঝুঁকিতে পড়বে?
এমন প্রশ্নকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়াজু-মিসিসিপি বদ্বীপ অঞ্চলের বন্যাঝুঁকি নিয়ে গবেষণা করেছেন বাংলাদেশি গবেষক মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ হোসাইন। তাঁর গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত International Journal of Disaster Risk Reduction জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাপত্রটির শিরোনাম “A Place-Based Framework for Assessing Flood-Related Socio-Economic Vulnerability in the Yazoo-Mississippi Delta”। গবেষণাটি বন্যার প্রাকৃতিক ঝুঁকির পাশাপাশি একটি এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা কীভাবে দুর্যোগের প্রভাবকে বাড়িয়ে দিতে পারে, তা স্থানভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে ধরেছে।
বন্যা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়
গবেষণাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বন্যাকে শুধু একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে না দেখে এর সঙ্গে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা।
গবেষণায় দেখানো হয়েছে, একই ধরনের বন্যার মুখোমুখি হলেও সব জনগোষ্ঠী সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। কোনো এলাকার মানুষের আয়, আবাসন পরিস্থিতি, সামাজিক অবস্থান, সম্পদের প্রাপ্যতা, অবকাঠামো এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতার পার্থক্য বন্যার প্রভাবকে ভিন্ন করে তুলতে পারে।
এ কারণে শুধু কোথায় বন্যা হবে তা জানা যথেষ্ট নয়; কোথায় বন্যা হলে সবচেয়ে বেশি মানুষ ও কোন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—তা চিহ্নিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানভিত্তিক বিশ্লেষণে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী শনাক্ত শাহনেওয়াজ হোসাইনের গবেষণায় Census tract-স্তরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক তথ্যের সঙ্গে ভূ-স্থানিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইয়াজু-মিসিসিপি বদ্বীপ অঞ্চলের কোন কোন এলাকায় সামাজিক-অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং বন্যার ঝুঁকি একই সঙ্গে বেশি, তা শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
গবেষণাটির এই পদ্ধতি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণাকে সামনে আনে—একটি অঞ্চলের সব মানুষের জন্য একই ধরনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কৌশল কার্যকর নাও হতে পারে।
বরং স্থানীয় বাস্তবতা, জনগোষ্ঠীর সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য এবং নির্দিষ্ট এলাকার বন্যাঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তুতি, জরুরি সেবা ও সম্পদ বণ্টনের পরিকল্পনা করা হলে তা অধিক কার্যকর হতে পারে।
স্থানীয় জ্ঞানও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ
শুধু পরিসংখ্যান ও ভূ-স্থানিক তথ্যের ওপর নির্ভর না করে গবেষণায় স্থানীয় পর্যায়ের জরুরি ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও কমিউনিটি পর্যায়ের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফলে গবেষণাটি একদিকে যেমন পরিমাণগত তথ্য ও স্থানিক বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, অন্যদিকে স্থানীয় বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গেও এর সংযোগ রয়েছে।
গবেষণার এই সমন্বিত পদ্ধতি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি মানচিত্রে কোনো এলাকার ঝুঁকি উচ্চ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর সেই ঝুঁকির পেছনে থাকা সামাজিক ও মানবিক বাস্তবতা বোঝাও জরুরি।
গবেষণার পেছনে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা
শাহনেওয়াজ হোসাইনের গবেষণার আগ্রহের সঙ্গে তাঁর পূর্ববর্তী পেশাগত অভিজ্ঞতারও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
Mississippi State University-তে পিএইচডি শুরু করার আগে তিনি আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা IOM Bangladesh-এর সঙ্গে কাজ করেছেন। সেখানে বাস্তুচ্যুত মানুষ, অভিবাসন, দুর্যোগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করার সুযোগ পান তিনি।
মাঠপর্যায়ে দুর্যোগ ও বাস্তুচ্যুতির বাস্তব প্রভাব প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তাঁর একাডেমিক গবেষণায়ও প্রতিফলিত হয়েছে। মানুষের বাস্তব সমস্যাকে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বোঝা এবং সেই জ্ঞানকে নীতি প্রণয়নে কাজে লাগানোর বিষয়টি তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক শিক্ষা গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়াজু-মিসিসিপি বদ্বীপ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হলেও এর গবেষণাগত পদ্ধতি বাংলাদেশের মতো বন্যা ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের জন্যও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীবিধৌত ও উপকূলীয় এলাকায় বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলাবদ্ধতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে মানুষের সামাজিক-অর্থনৈতিক দুর্বলতা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে শুধু দুর্যোগের ভৌগোলিক বিস্তার নয়, বরং কোন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে এবং কেন—তা শনাক্ত করা দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
শাহনেওয়াজের গবেষণায় ব্যবহৃত স্থানভিত্তিক কাঠামো ভবিষ্যতে এ ধরনের গবেষণায় একটি কার্যকর পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে।
গবেষণায় যারা ছিলেন
গবেষণাপত্রটিতে শাহনেওয়াজ হোসাইনের সঙ্গে সহলেখক হিসেবে রয়েছেন ড. শ্রিনিধি আম্বিনাকুডিগে, ড. ব্রায়ান উইলিয়ামস, ড. ডিন হার্ডি এবং জো মেনসা।
গবেষণাটি তাঁর পিএইচডি গবেষণার বৃহত্তর কাজের অংশ, যেখানে জলবায়ু ও দুর্যোগঝুঁকি, সামাজিক-অর্থনৈতিক, পরিবেশগত দুর্বলতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিনিধির নাম 








