সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ঠেকরা রহিমপুর গ্রামের আলোচিত সঞ্জীব সরকার (৩০) হত্যা মামলায় ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন তদন্তকে নতুন মোড় দিলেও, এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রধান অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় জনমনে প্রশ্ন বাড়ছে। ফরেনসিকভাবে মৃত্যুকে “হোমিসাইডাল ডেথ (হত্যাজনিত মৃত্যু)” হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ৩০ জুন ২০২৬। পরে ২ জুলাই হত্যা মামলা দায়ের হয়। ১৪ জুলাই ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয় এবং ১৫ জুলাই তদন্ত কর্মকর্তার হাতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পৌঁছায়। কিন্তু সেই প্রতিবেদন হাতে আসার পরও প্রধান অভিযুক্ত তাপস সরকার, আনন্দ সরকার ও শাওন সরকার এখনো পলাতক।
সাতক্ষীরা সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সঞ্জীবের মৃত্যুকে স্পষ্টভাবে হত্যাজনিত মৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরতহাল প্রতিবেদনে গলায় স্পষ্ট লিগেচার মার্ক এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে একাধিক আঘাতের চিহ্নের কথা উল্লেখ রয়েছে। চিকিৎসা ও ফরেনসিক বিজ্ঞানের আলোকে এ ধরনের আলামত শ্বাসরোধ ও শারীরিক নির্যাতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এই বৈজ্ঞানিক মতামত মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করলেও সেটি এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান গ্রেপ্তার অভিযানে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।
প্রিয়া সরকারের প্রশ্ন: “হত্যা নিশ্চিত, তবে আসামিরা কোথায়?” নিহত সঞ্জীব সরকারের স্ত্রী প্রিয়া সরকার বলেন, “ময়নাতদন্তে যখন চিকিৎসকেরা স্পষ্টভাবে বলেছেন এটি হত্যা, তখনও মূল আসামিরা কেন গ্রেপ্তার হচ্ছে না? ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে অপরাধীদের শনাক্ত করতে এত সময় লাগছে কেন?”
তিনি অভিযোগ করেন, একটি প্রভাবশালী মহল মামলাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি এবং পুলিশও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
প্রিয়ার ভাষায়, স্বামীকে হারানোর পর এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বিচার পাওয়া। তিনি দাবি করেন, দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
সঞ্জীব সরকারের পিতা বলেন, ময়নাতদন্তে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তারা দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় তাদের হতাশা বাড়ছে। তাদের মতে, হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ সত্য উদঘাটনে প্রত্যেকটি আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং ডিজিটাল তথ্য গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা জরুরি।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই আব্দুর রহিম বলেন, “সব সাক্ষ্য-প্রমাণ, ময়না তদন্তের রিপোর্ট ও পারিপার্শ্বিক তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। আসামিরা নেটওয়ার্কের বাইরে রয়েছে এবং তারা মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে না। তাদের অবস্থান শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত ৭ থেকে ৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রধান অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তবে এখনো তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
এলাকাবাসীর মতে, ময়নাতদন্তে হত্যার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়ার পর তদন্তের গতি আরও দৃশ্যমান হওয়া উচিত ছিল। তারা জানতে চান ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ সম্পন্ন হয়েছে কি? ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামতের পরীক্ষার ফল কী? মোবাইল কল রেকর্ড ও লোকেশন ডেটা বিশ্লেষণে কী তথ্য মিলেছে? পলাতক অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে কী ধরনের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে? এসব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের নিবিড় তদারকিতে মামলাটির তদন্ত দ্রুত শেষ করা উচিত। তাদের মতে, একটি আলোচিত হত্যা মামলায় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হাতে থাকার পরও দীর্ঘ সময় ধরে আসামিদের পলাতক থাকা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
সঞ্জীব সরকার হত্যা মামলার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক দলিল হিসেবে মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে চিহ্নিত করেছে। এখন তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সেই বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, সাক্ষ্য, আলামত ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা। তদন্ত যত স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত হবে, ততই ভুক্তভোগী পরিবার এবং জনমনে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা বাড়বে। বর্তমানে এই মামলার দিকে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকার মানুষের নজর রয়েছে।
প্রতিনিধির নাম 








