চোখ, ঠোঁট ও গলায় ক্ষতের বর্ণনা, পানিতে পাওয়া মরদেহ ঘিরে আরও ঘনীভূত রহস্য
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ঠেকরা রহিমপুরে সঞ্জীব সরকার (৩০) হত্যা মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে সামনে এসেছে পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদন। ৫নং কুশলিয়া ইউনিয়নের ঠেকরা মৌজায় সঞ্জীব হত্যা মামলার ২ নং আসামী তাপস সরকারের ঘেরের ক্যানেলের পানি থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের বাহ্যিক পরীক্ষায় চোখ, মুখ ও গলাসহ একাধিক আঘাতের চিহ্নের উল্লেখ তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
পুলিশের প্রস্তুত করা সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলেই বাহ্যিকভাবে শরীর পরীক্ষা করা হয়। সেখানে নিহতের মুখমণ্ডল, চোখ ও গলায় দৃশ্যমান কিছু আঘাতের চিহ্ন লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। পরবর্তীতে এসব পর্যবেক্ষণই ময়নাতদন্তের প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, নিহতের চোখের পাতার ওপর আঘাতের চিহ্ন, দুই ঠোঁটে থেঁতলানো ধরনের ক্ষত এবং গলায় কালচে দাগ দেখা যায়। এছাড়া শরীরের অবস্থান, হাতের ভঙ্গি এবং পানিতে থাকার কারণে ত্বকের পরিবর্তনের বিষয়ও প্রতিবেদনে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুরতহাল প্রতিবেদন মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করে না। এটি কেবল ঘটনাস্থলে দৃশ্যমান বাহ্যিক অবস্থার একটি নথিভুক্ত বিবরণ। তবে কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় এই নথি পরবর্তী তদন্ত ও ময়নাতদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
সুরতহালের তথ্য অনুযায়ী, মরদেহ উদ্ধারের সময় শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের সুস্পষ্ট কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে মুখমণ্ডল ও গলার দাগ তদন্তকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, এসব আঘাত মৃত্যুর আগে না পরে হয়েছে এবং এগুলোর সঙ্গে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক আছে কি না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মরদেহটি পানির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হলেও সুরতহাল প্রতিবেদনে এমন কিছু বাহ্যিক চিহ্নের উল্লেখ রয়েছে, যা কেবল ডুবে যাওয়ার ঘটনায় সাধারণত সব সময় দেখা যায় না। তবে এ ধরনের আলামতের প্রকৃত অর্থ নির্ধারণের দায়িত্ব ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, মরদেহ উদ্ধারের স্থান এবং সুরতহালে লিপিবদ্ধ তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সাক্ষীদের বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে।
এদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো হত্যা মামলায় সুরতহাল প্রতিবেদনকে এককভাবে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। তবে এটি তদন্তের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীতে ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য আলামতের সঙ্গে এই প্রতিবেদনের মিল খুঁজে দেখা হয়।
নিহতের পরিবারের দাবি, সুরতহালে পাওয়া আঘাতের চিহ্ন তাদের শুরু থেকেই করা হত্যার অভিযোগকে আরও শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে তদন্তকারী সংস্থা বলছে, তারা কোনো পূর্বধারণা নিয়ে এগোচ্ছে না; বরং সব তথ্য-উপাত্ত ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বিশ্লেষণ করেই তদন্ত সম্পন্ন করা হবে।
তদন্তে আরেকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখিত গলার দাগ এবং মুখমণ্ডলের আঘাত পরবর্তীতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। কারণ চিকিৎসকদের মতামতই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এলাকাবাসীর অনেকের মতে, সঞ্জীব সরকারের মৃত্যুকে ঘিরে শুরু থেকেই নানা গুঞ্জন ছিল। কিন্তু সুরতহাল প্রতিবেদনে বাহ্যিক আঘাতের উল্লেখের পর ঘটনাটি আরও আলোচনার জন্ম দেয়। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলেও মনে করছেন সচেতন মহল।
সঞ্জীব হত্যা মামলার কালিগঞ্জ থানা পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা আব্দুর রহিম জানিয়েছে, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। সংগৃহীত সব আলামত, সাক্ষ্য ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে থাকছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে কী উঠে এসেছে? চিকিৎসকরা কেন মৃত্যুকে শ্বাসরোধজনিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে মত দিয়েছেন এবং সেই প্রতিবেদনে থাকা তথ্য মামলার গতিপথ কীভাবে বদলে দিল।
মোঃ ইশারাত আলী 


















