ইতিহাস বড় নির্মম। জীবনের সায়াহ্নে এসে মানুষ যখন শান্তিতে দু’দণ্ড জিরিয়ে নেওয়ার কথা, তখন ৭৫ বছর বয়সে এসে একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সংসদ সদস্য এবং জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের কপালে জুটেছে কেবল ধিক্কার, অভিশাপ আর চরম অবক্ষয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অর্জন, সংগ্রাম, নির্যাতন আর ত্যাগের ঝুলি এক নিমিষে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে মুহূর্তের এক স্খলনে। রণাঙ্গনের এক অপ্রতিরোধ্য বীর থেকে আজকের এই করুণ পরিণতি—বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক জীবন্ত ট্র্যাজেডির নাম গাজী নজরুল ইসলাম।
যাঁরা আজীবন কোনো আদর্শের পতাকা হাতে নিয়ে লড়াই করেছেন, তাঁদের জীবন সাধারণত সহজ হয় না। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকা গাজী নজরুল ইসলামের জীবনও কম ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ছিল না।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশকে মুক্ত করতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেওয়ার প্রত্যয়ে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিনি। অস্ত্র হাতে সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়া সেই তরুণ মুক্তিযোদ্ধার বুকে তখন শুধু একটাই স্বপ্ন ছিল—একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর তাঁর পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। স্বৈরশাসনের আমল, রাজনৈতিক পালাবদল এবং দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে জীবনের দীর্ঘ সময় তাঁকে কাটাতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতা আর জেল-জুলুমের ভেতর দিয়ে। পুলিশি হয়রানি, হামলা-মামলা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দিনের পর দিন ঘরছাড়া থাকতে হয়েছে তাঁকে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের পথ বেয়ে একসময় তিনি সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। এলাকার মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি আর রাজনৈতিক প্রভাব তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিল এক অনন্য উচ্চতায়। কিন্তু কে জানত, এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে তাঁর জন্যই অপেক্ষা করছে এমন এক নিষ্ঠুর পরিণতি!
রাজনীতিতে মানুষের সবচেয়ে বড় পুঁজি হলো তার চরিত্র, আদর্শ এবং জনগণের বিশ্বাস। কিন্তু বিশ্বাসের সেই সূতো যখন ছিঁড়ে যায়, তখন আর অনুসারীদের ভালোবাসা ধরে রাখা যায় না।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর একটি ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো দেশজুড়ে ঝড় বয়ে যায়। তিনি দাবি করার চেষ্টা করেছেন যে, এটি তাঁর বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্র; তাঁর ড্রাইভার ও প্রতিপক্ষরা ব্যক্তিগত ভিডিওর অপব্যবহার করে তাঁকে ফাঁসিয়েছে। কিন্তু যুক্তি যাই হোক না কেন, বয়সের এই অন্তিম লগ্নে এসে এমন নৈতিক স্খলন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি সাধারণ মানুষ।
যিনি সারাজীবন ইসলামি মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বুলি আওড়েছেন, সাধারণ মানুষকে সততার সবক শিখিয়েছেন, তাঁর নিজের মুখেই যখন সেই আদর্শের মাজার ভেঙে পড়ে, তখন তার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কিছু হতে পারে না। রাজনৈতিক সতীর্থ ও ভক্ত-অনুসারীরা আজ লজ্জায় মুখ লুকাচ্ছেন। যে মানুষটিকে একসময় মানুষ আদর্শ মানত, আজ তাঁকেই ঘিরে চলছে তীব্র ঘৃণা।
একটি রাজনৈতিক দল কেবল একটি সংগঠন নয়, এটি একজন নেতার দ্বিতীয় পরিবার। কিন্তু যখন নৈতিক অপরাধ প্রমাণিত হয়, তখন দলও মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
ভিডিও ভাইরালের জেরে জনরোষের মুখে দলীয় ভাবমূর্তি রক্ষায় জামায়াতে ইসলামী বেশি সময় নেয়নি। দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গঠনতন্ত্রের ধারা অনুযায়ী নৈতিক স্খলনের দায়ে তাঁকে দল থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা হয়। যে দলের জন্য তিনি জীবনের বহু মূল্যবান সময় উৎসর্গ করেছিলেন, আজ সেই দলই তাঁকে দুপায়ে ঠেলে ফেলে দিয়েছে বাইরে।
একসময় যে এলাকায় তাঁর এক ইশারায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতো, আজ সেই সাতক্ষীরার শ্যামনগরেই তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে, জুতো মিছিল নিয়ে ক্ষুব্ধ জনতা তাঁর শাস্তির দাবি জানিয়েছে। নিজের গড়া ও চেনা সেই জনপদেই আজ তিনি একঘরে, চরম নিঃসঙ্গ।
আজ ৭৫ বছর বয়সের জরাগ্রস্ত শরীরে গাজী নজরুল ইসলাম যখন আয়নায় নিজের দিকে তাকান, তখন হয়তো তিনি দেখতে পান একখণ্ড ধূসর ইতিহাস। একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর, সাবেক সংসদ সদস্য, নির্যাতিত রাজনৈতিক নেতা—সব পরিচয় ছাপিয়ে আজ তাঁর কপালে সেঁটে গেছে চরম পতন ও ঘৃণার তকমা।
রাষ্ট্র বা সমাজ তাঁকে হয়তো আইনি কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে, কিন্তু তার চেয়েও বড় শাস্তি তিনি পেয়ে গেছেন নিজের কর্মের ফল হিসেবে। ইতিহাসের এই নির্মম ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—কত বড় মাপের নেতা বা মুক্তিযোদ্ধা হোন না কেন, চরিত্র ও নৈতিকতার পতন ঘটলে মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায় জীবনের সমস্ত গৌরব। রণাঙ্গনের একাত্তরের সেই বীর সৈনিক আজ হেরে গেছেন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ও নির্মম লড়াইতে।
প্রতিনিধির নাম 
















