মোঃ ইশারাত আলী, কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) থেকে :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অস্থিরতা, দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগের পর অবশেষে নতুন অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন নিজাম উদ্দীন। সোমবার (২০ জুলাই) সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বদলি হয়ে তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেন। নতুন অধ্যক্ষকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেয় শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ সংকটের পর নতুন নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশ ফিরবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
এর আগে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও চিফ ইন্সট্রাক্টর (অটো) মো. হুমায়ুন কবীর-এর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, শিক্ষক হয়রানি, ভাইভা বাণিজ্যসহ একাধিক অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তাকে বদলি করা হয়। তবে অভিযোগগুলোর তদন্ত এখনো চলমান এবং এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রশাসনিক বা আইনি সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি। শুধুমাত্র তাকে অন্যত্র বদলী করা হয়েছে।
নতুন অধ্যক্ষকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন চিফ ইন্সট্রাক্টর (রসায়ন) সঞ্জয় কুমার বাহাদুর, ইন্সট্রাক্টর দীনবন্ধু মণ্ডল, মো. অজিহার রহমান, মো. শিমুল হাসান, মো. মেহেদী হাসান, মো. হাবিবুল্লাহ, জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর আল-আমিন, আশিকুর রহমান, নিয়াজ মাহমুদ, মো. মহিউদ্দিন আলম, রমেশ চন্দ্র ঘোষ, মো. আলহাজ উদ্দীন, ক্রাফট ইন্সট্রাক্টর তৌহিদুজ্জামানসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা।
তবে নতুন অধ্যক্ষের যোগদানের ঠিক আগের রাতে, ১৯ জুলাই, কলেজ ক্যাম্পাসে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো মেমো বা চালান ছাড়াই ভ্যানে করে দুই ব্যারেল পেট্রোল ও এক ব্যারেল ডিজেল আনার সময় স্থানীয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা তা আটকান।
খবর পেয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাইনুল ইসলাম খান পুলিশের একটি দল নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনটি ব্যারেল জ্বালানি তেল এবং মালিকবিহীন দুটি মোটরসাইকেল জব্দ করেন। মোটরসাইকেল দুটি নৈশপ্রহরী মনিরুল ইসলাম-এর জিম্মায় রাখা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে চার ব্যারেল জ্বালানি তেল আত্মসাতের যে অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে, সেই ঘাটতি আড়াল করতেই রাতের আঁধারে নতুন করে তেল এনে মজুদের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে এই অভিযোগেরও তদন্ত চলছে এবং এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এক ব্যারেল তেলের কোন হদিস মেলেনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিয়ম, সরকারি তহবিলের অপব্যবহার, শিক্ষক হয়রানি, ভাইভা বাণিজ্য এবং কম্পিউটার, ফটোকপি মেশিন ও আসবাবপত্রসহ সরকারি মালামাল রাতের আঁধারে সরিয়ে নেওয়া বা আনার অভিযোগ রয়েছে।
চিফ ইন্সট্রাক্টর সঞ্জয় কুমার বাহাদুর অভিযোগ করেন, অনিয়মের প্রতিবাদ করায় তাকে অন্যায়ভাবে ভোলা জেলার লালমোহনে বদলি করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, কিছু টেকনিক্যাল শিক্ষক নন-টেকনিক্যাল শিক্ষকদের বদলির পেছনে ভূমিকা রেখেছেন।
শিক্ষকরা বলেন, অনেক ভাউচার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই নিজেদের হাতে লিখে বিল তৈরি করেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ভাউচার তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
শুধু তাই নয়, শিমুল হাসান (ইন্সট্রাক্টর, আইটি সাপোর্ট/কম্পিউটার), দীনবন্ধু মণ্ডল (ইন্সট্রাক্টর, রসায়ন) ও বিশ্বনাথ সরকারসহ কয়েকজনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকরা বলেন, “যে প্রকৃত অপরাধী, তার বিচার হোক। যারা জড়িত, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হোক।”
অভিভাবক গোলাম রব্বানী অভিযোগ করেন, যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের সরিয়ে দিয়ে একটি কুচক্রী মহল প্রতিষ্ঠানটিকে অকার্যকর করার চেষ্টা করেছে।
নবাগত অধ্যক্ষ নিজাম উদ্দীন বলেন, “আমি সবে যোগদান করেছি। এখনো সবকিছু বুঝে নেওয়া হয়নি। সাময়িক চার্জ গ্রহণ করেছি। চার্জ না নিলে তদন্ত কমিটি গঠন করা সম্ভব হতো না। স্টোরের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট নেওয়া হবে এবং তা অধিদপ্তর ও আঞ্চলিক কার্যালয়ে পাঠানো হবে।”
জ্বালানি তেল জব্দের বিষয়ে তিনি বলেন, “হয়তো কোনো কারণে বা নির্ধারিত সময়ে ক্রয় করা হয়েছিল। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, “সবার আগে প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। অনিয়মের অভিযোগগুলোও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি আর সৃষ্টি না হয়।”
নতুন অধ্যক্ষের যোগদানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসবে বলে আশা করছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল। তারা চান, চলমান সব অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে কলেজটি আবারও একটি মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক।
প্রতিনিধির নাম 
















