মো: ইশারাত আলী :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার জনজীবন ও সমাজব্যবস্থা আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। আপাতদৃষ্টিতে এটি সাধারণ কিছু জমিজমা বা সীমানা নিয়ে বিরোধ মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, এবং স্থানীয় রাজনীতির এক কালো অধ্যায়। বাপ-দাদার আমল থেকে একসাথে বসবাসের জন্য জমি বিন্যাস বা অদলবদল (বিনিময়) করা হলেও, খতিয়ান ও পর্চার জটিলতা এবং এক শ্রেণির সুযোগসন্ধানী মহলের কারণে আজ সাধারণ মানুষের জীবন নরকতুল্য হয়ে উঠেছে।
১. খতিয়ানের জটিলতা ও জবরদখলের নির্মম ফাঁদ
ঘটনার শুরু হয় যখন বাপ-দাদার আমলের চার শতক জমি এক জায়গায় গুছিয়ে বসবাসোপযোগী করার বহু বছর পর আধুনিক খতিয়ানের রেকর্ডে গরমিল ধরা পড়ে। চার শতক জমি চারটি ভিন্ন দাগে ছড়িয়ে থাকায় এবং কাগজপত্রে অন্যের জমি নিজের অংশে আর নিজের জমি অন্যের অংশে চলে যাওয়ায় তৈরি হয় বড় ধরণের জট।
- সুযোগসন্ধানী মহল বিষয়টি বুঝতে পেরেই কোনো আলোচনা বা মীমাংসায় না গিয়ে জবরদখল শুরু করে।
- দুর্বল ভুক্তভোগীকে ঘায়েল করতে আদালতে ১৪৪/১৪৫ ধারা বা ফৌজদারি কার্যবিধির নানা ধারার নোটিশ নিয়ে আসা হয়।
২. পুলিশ, নায়েব ও সালিশদারদের ত্রিমুখী বাণিজ্য
নোটিশ আসার পরই শুরু হয় আসল ‘ব্যবসা’। এই প্রক্রিয়াটি ভূমি অফিসের নায়েব থেকে শুরু করে থানা পুলিশ এবং স্থানীয় সালিশদারদের জন্য উপার্জনের এক মোক্ষম সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়:
- পুলিশের ভূমিকা: পুলিশের একটি অংশ এমন ভীতি ও গল্পের সৃষ্টি করে যে, ভুক্তভোগী বাধ্য হয়ে নিজের জমি নিজের দখলে রাখার জন্য বা পুলিশের মন জোগাতে ২/৩ হাজার টাকার মটর সাইকেল ভাড়া এমনিতেই নিয়ে নেন।
- সালিশদারদের পকেট ভারী: বিচার বা মীমাংসার নামে বসা মাতবর ও সালিশদাররা উভয় পক্ষের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে শুরু করে ৫০ হাজার এক লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেন। প্রভাব ও পজিশন বুঝে এই উৎকোচের পরিমাণ বাড়তেই থাকে।
৩. রাজনৈতিক মেরুকরণ ও স্বার্থান্বেষী মহলের আস্ফালন
কালিগঞ্জের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামান্য একটি জমির দখল নিয়ে শুরু হয় মর্যাদার লড়াই। এই সুযোগে স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী মাঠে নেমে পড়ে:
- একদিকে ধানের শীষ ও অন্যদিকে ফুটবল, সাথে দাঁড়িপাল্লা, জাতীয় পার্টি এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী কলকাঠিড় নাড়তে শুরু করে।
- এর সাথে যুক্ত হয় স্থানীয় কিছু নামধারী সমন্বয়কারী ও সুবিধাভোগী প্রতিবেদনকারী।
এক শতক জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে যখন এতগুলো পক্ষ মাঠে নামে, তখন ভিকটিমের অবস্থা পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। রশি টানাটানির এই খেলায় যতদিন ভুক্তভোগীর পকেট ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সচল থাকে, ততদিন ভিকটিমের হিতৈষীরা চারপাশে ভিড় জমায়।
৪. নিঃস্ব হওয়ার পর একাকী ভুক্তভোগী
একপর্যায়ে আইনি লড়াই, পুলিশি হয়রানি এবং বিভিন্ন নেতার পেছনে ঘুষ ও হাদিয়া দিতে দিতে যখন ভুক্তভোগীর কাছে আর এক টাকাও থাকে না, তখন দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। পকেট ফাঁকা হওয়ার সাথে সাথেই সব রাজনৈতিক নেতা, সালিশদার ও সুবিধাভোগীরা উধাও হয়ে যান। শেষ পর্যন্ত যিনি জোর যার মুল্লুক তার নীতিতে জমি দখল করতে চান, তিনিই সফল হন। আর ভিকটিম নিঃস্ব হয়ে আইনি মারপ্যাঁচ ও ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েন।
৫. উত্তরণের উপায়: মানসিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা
কালিগঞ্জের এই অবক্ষয় থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হলে শুধু আইনি সংস্কার নয়, কাঠামোগত কিছু পরিবর্তন অপরিহার্য:
- বেকার রাজনৈতিক নেতাদের কর্মসংস্থান ও আদর্শিক রাজনীতি: কালিগঞ্জের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অন্যতম মূল কারণ হলো কিছু নিষ্ক্রিয় ও পেশাদার রাজনৈতিক নেতার মাঠে টিকে থাকার জন্য এসব ফন্দিফিকিরে লিপ্ত হওয়া। এদের জন্য গঠনমূলক কর্মসংস্থান এবং রাজনীতিতে আদর্শিক চর্চা ফিরিয়ে আনা জরুরি, যাতে তারা অন্যের জমি দখলের মধ্যস্থতা করে ফায়দা লুটতে না পারে।
- ভূমি রেকর্ড ও জরিপের আধুনিকায়ন: খতিয়ানের দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে দ্রুত ডিজিটাল ল্যান্ড সার্ভে এবং কার্যকর ভূমি সংস্কার প্রয়োজন, যাতে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার না হয়।
- প্রশাসনের জবাবদিহিতা: পুলিশ প্রশাসন ও ভূমি অফিসের (তহসিল অফিস) দুর্নীতি কঠোরহস্তে দমন করতে হবে। দালাল চক্র ও সালিশের নামে অর্থ আদায়কারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
- সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার উন্নয়ন ঘটাতে হবে, যাতে সামান্য স্বার্থের জন্য প্রতিবেশীকে নিঃস্ব করার প্রবণতা সমাজ থেকে দূর হয়।
কালিগঞ্জের সাধারণ মানুষ চায় একটি সুশৃঙ্খল সমাজ, যেখানে আইনের শাসন থাকবে কিন্তু দালাল ও পরজীবী রাজনীতিকদের দৌরাত্ম্য থাকবে না। এই চক্র ভাঙতে না পারলে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
প্রতিনিধির নাম 








