সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো যেন এখন চোর চক্রের ‘নিরাপদ অভয়ারণ্যে’ পরিণত হয়েছে। একের পর এক দুঃসাহসিক চুরির ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চরম উদাসীনতা ও নীরব ভূমিকায় চরম ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
সবশেষ ১৩৩ নং পিরোজপুর পথকলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হানা দিয়ে ল্যাপটপ, প্রজেক্টর ও গচ্ছিত নগদ টাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ধ্বংস করেছে দুর্বৃত্তরা। গত দুই মাসে তুলাকাটি, তারালী, বাথুয়াডাঙ্গা, হিজলা চন্ডিপুর, বারদহ, সাতবসু, ব্রজপাটুলীসহ ডজনখানেক বিদ্যালয়ে ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ আজ পর্যন্ত একটি প্রজেক্টর বা ল্যাপটপও উদ্ধার করতে পারেনি; গ্রেপ্তার হয়নি একজন অপরাধীও।
স্থানীয় ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা রেহানা সুলতানা প্রতিষ্ঠানে এসে দেখতে পান প্রধান ফটক ও ছাদের ওপরের গেটের তালা ভাঙা এবং লোহার অ্যাঙ্গেল দুমড়ে-মুচড়ে ফেলা হয়েছে। ছাদের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল খালি ল্যাপটপের ব্যাগ ও ভাঙা তালা। ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে তাণ্ডবের ভয়াবহ দৃশ্য-অফিস রুমের আসবাবপত্র এলোমেলো ও তছনছ করা।

দুর্বৃত্তরা অফিস কক্ষ থেকে একটি ল্যাপটপ, একটি প্রজেক্টর এবং শিক্ষার্থীদের সুপেয় পানির ব্যবস্থার জন্য রক্ষিত নগদ ৩ হাজার টাকা চুরি করে নিয়ে যায়। শুধু চুরি করেই ক্ষান্ত হয়নি এই সংঘবদ্ধ চক্র; বিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চেক বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলে রেখে অপরাধের হিংস্রতার প্রমাণ রেখে গেছে।
ঘটনার পর চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ লিখিত অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে-পুলিশের এই আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন ও মামলা-অভিযোগ গ্রহণ কি শুধুই ‘কাগজ-কলমের আইওয়াশ’?
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মীর আজিজুর রহমান চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন:
“ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর চুরি হওয়ায় আমাদের কোমলমতি শিশুদের ডিজিটাল ও মাল্টিমিডিয়া পাঠদান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এতে করে শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে এবং শিক্ষার দৌড়ে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়বে।”
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত দুই মাসের ব্যবধানে কালিগঞ্জের তুলাকাটি, তারালীসহ একের পর এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় একই কায়দায় রাতের আঁধারে তালা ভেঙে মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম ও সরকারি সম্পদ লুট করা হচ্ছে।
পরিকল্পিতভাবে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের তাণ্ডব চালানোর পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিশ্চুপ ও নির্বিকার ভূমিকা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও নানা গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি সম্পদ লুট হয়ে গেলেও কেন পুলিশ কোনো সূত্র (ক্লু) বের করতে পারছে না কিংবা জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে পারছে না-তা এখন বড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কালিগঞ্জের সচেতন সমাজ ও এলাকাবাসীর স্পষ্ট দাবি-অবিলম্বে বিশেষ অভিযান চালিয়ে পিরোজপুর পথকলিসহ পূর্বে চুরি হওয়া সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঘটনায় জড়িত সংঘবদ্ধ চোর চক্রকে চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করতে হবে। একই সাথে উদ্ধার করতে হবে চুরি যাওয়া সব মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম। অন্যথায় উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সরকারি সম্পদের নিরাপত্তা চিরতরে ভেস্তে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিনিধির নাম 















