1. satkhiranews24@yahoo.com : নিজস্ব প্রতিবেদক :
সাতক্ষীরা ০৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
কালিগঞ্জে পিরোজপুর পথকলি স্কুলেও দুঃসাহসিক চুরি, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ কালিগঞ্জে কাপড়ের দোকানে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ, ২৩ বস্তা মালামাল উদ্ধার কালিগঞ্জে ড্রিংকিং ওয়াটার প্ল্যান্ট মালিক সমিতির সভা, নতুন কমিটি গঠন ও চারা বিতরণ কালিগঞ্জে প্লাস্টিকের ব্যবহার হ্রাস ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে সচেতনতামূলক সংলাপ অনুষ্ঠিত প্রয়াত বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পটেকর, গোয়ার বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ৭৫ বছর বয়সে সম্পাদকীয় : সারের ডিলারশিপ ও রাজনৈতিক আধিপত্য: বদলাচ্ছে শুধু ব্যানার, কৃষকের ভাগ্য কি বদলাবে? চাঁচাই বৃক্ষমেলা: অনুমোদনহীন আয়োজন ও ব্যবসায়ীদের লোকসান-দায় কার? কালিগঞ্জের বিষ্ণুপুরে মৎস্যজীবী দলের কর্মী সম্মেলন ও নতুন কমিটি ঘোষণা কালিগঞ্জে ডাচ-বাংলা ব্যাংক এজেন্ট আউটলেটের স্বচ্ছতা ও অঙ্গীকার নিয়ে গ্রাহক সমাবেশ শিক্ষক দিবসে প্রশ্ন—শিক্ষককে কতটা শিক্ষক থাকতে দিচ্ছি?

কালিগঞ্জে এবার ‘পেট্রোল সিন্ডিকেট’: পাম্পে পাম্পে ‘তেল নেই’ নাটক, কালোবাজারে মিলছে চড়া দামে!

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৩৯:৪৯ অপরাহ্ণ, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬
  • ১১৮৫ বার পড়া হয়েছে

মোঃ ইশারাত আলী : 

সারের পর এবার সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে জ্বালানি তেল নিয়ে শুরু হয়েছে ভয়াবহ সিন্ডিকেট বাণিজ্য। ‘তেল নেই’-পাম্প মালিকদের এমন এক শব্দের অজুহাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার মোটরসাইকেল চালক, কৃষক ও পরিবহন শ্রমিক। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে তেল না মিললেও পাম্পের পেছনের দরজা দিয়ে ড্রামভর্তি পেট্রোল ও অকটেন চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের হাতে। লিটারপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা বাড়তি দিলে পাড়ার মুদি দোকানে মিলছে তেল, অথচ পাম্পে ঝুলছে ‘নো স্টক’ বোর্ড। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রশাসনের তদারকিহীনতা এবং সিন্ডিকেটের সাথে গোপন সমঝোতার কারণেই এই নৈরাজ্য চরমে পৌঁছেছে।

গত কয়েকদিন ধরে কালিগঞ্জের প্রধান প্রধান পাম্পগুলোতে তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন চালকরা।

মটর বাইক চালক সফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “সকাল থেকে তিনটা পাম্প ঘুরলাম, সবাই কয় তেল নাই। কিন্তু পাড়ার দোকানে ঠিকই ২৫০ টাকা লিটার বেচতিছে। গরিবের পকেট কাটার এই মগের মুল্লুক দেখার কি কেউ নেই?”

মোটরসাইকেল চালক নজরুল ইসলাম জানান, “জরুরি রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাব, কিন্তু পাম্পে তেল দিচ্ছে না। অথচ পাম্পের ভেতরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ড্রাম ভরতে দেখেছি।”

তিনি আরও বলেন দীর্ঘ লাইন ধরে দাড়িয়ে থেকে ১০০ অথবা ২০০ টাকার তেল পাওয়া যায়। তাতে খুব বেশী হলে ৪০ কিলোমিটার চলে। অন্যদিকে একটি মানুষ দৈনিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা জোনের দাম ক্ষতি করে। এভাবে চললে আমাদের সংসার লাঠে উঠবে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিপো থেকে তেল আসার পরপরই পাম্প কর্তৃপক্ষ সাধারণ গ্রাহকদের জন্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এরপর রাতের অন্ধকারে সেই তেল সরিয়ে নেওয়া হয় নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেট চক্রের গুদামে। খুচরা দোকানে বোতলজাত পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ডিজিটাল মিটারের বদলে মান্ধাতা আমলের বোতলে তেল মাপার ফলে পরিমাণেও কম পাচ্ছেন গ্রাহকরা।

অনুসন্ধানে জানাগেছে কালিগঞ্জের রতনপুর, ধলবাড়িয়া, সেকেন্দারনগর চৌমুহনী, পিরোজপুর, মহৎপুর, কুশলিয়া, পারুলগাছা, চৌমুহনী, কৃষ্ণনগর, বিষ্ণুপুর, বাঁশতলা, উজিরপুর, তারালী, নলতাসহ সর্বত্র  খুচরা তেল বিক্রেতা ইতিমধ্যে পেট্রোলপাম্প থেকে তেল নিয়ে নিজের এলাকায় মজুদ করেছে। তারা এখন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা দরে পেট্রোল বিক্রি করছে। সাথে ইউনিয়ন তেল ডিলার যারা ব্যারেলে করে তেল আনে তারা অধিকাংশ তেল মজুদ করে লুকিয়ে রেখেছে এমন অভিযোগ উঠেছে। আরও অভিযোগ উঠেছে, সারের মতো এই জ্বালানি সিন্ডিকেটেও জড়িয়ে আছে কিছু অসাধু কর্মকর্তা। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের খবর আগেই সিন্ডিকেট সদস্যদের কাছে পৌঁছে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাম্প কর্মচারী জানান, “ওপর মহলে মাসোহারা ঠিক থাকলে তেল না দিলেও কেউ কিছু বলতে পারে না। আমরা শুধু নির্দেশ পালন করি।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সারের সংকট নিয়ে যখন উপজেলা উত্তাল, তখন জ্বালানি তেলের এই নতুন সংকট সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।

উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ডাঃ শেখ শফিকুল ইসলাম বলেন, “কৃষক সেচের জন্য ডিজেল পাচ্ছে না, সাধারণ মানুষ পেট্রোল পাচ্ছে না। এই কৃত্রিম সংকটের পেছনে যারা আছে, তাদের চিহ্নিত করে এখনই ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।”

ইতিমেধ্যে কালিগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মঈনুল ইসলাম খান তেলের পাম্প গুলো ভিজিট করলেও কোন কাঙ্খিত সুফল বয়ে আনেনি। উল্টো যতদিন যাচ্ছে তত বেশী তেলের দাম বাড়ছে।

সাতক্ষীরা ৩ আসনের এমপি হাফেজ মুহাঃ রবিউল বাশার তেলের সংকট তৈরী না করে নায্যতার ভিত্তিতে বন্টন করার অনুরোধ করেছেন।

কালিগঞ্জের মানুষ এখন প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছে। পাম্পগুলোতে নিয়মিত তদারকি, সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই এবং মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই ‘তেল নাটক’ বন্ধ হবে না। সারের সিন্ডিকেটের পর তেলের এই জুলুম কি থামবে? নাকি সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করতেই সাধারণ মানুষের পকেট কাটা চলতে থাকবে?

ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কালিগঞ্জে পিরোজপুর পথকলি স্কুলেও দুঃসাহসিক চুরি, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ

কালিগঞ্জে এবার ‘পেট্রোল সিন্ডিকেট’: পাম্পে পাম্পে ‘তেল নেই’ নাটক, কালোবাজারে মিলছে চড়া দামে!

আপডেট সময় : ০২:৩৯:৪৯ অপরাহ্ণ, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬

মোঃ ইশারাত আলী : 

সারের পর এবার সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে জ্বালানি তেল নিয়ে শুরু হয়েছে ভয়াবহ সিন্ডিকেট বাণিজ্য। ‘তেল নেই’-পাম্প মালিকদের এমন এক শব্দের অজুহাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার মোটরসাইকেল চালক, কৃষক ও পরিবহন শ্রমিক। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে তেল না মিললেও পাম্পের পেছনের দরজা দিয়ে ড্রামভর্তি পেট্রোল ও অকটেন চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের হাতে। লিটারপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা বাড়তি দিলে পাড়ার মুদি দোকানে মিলছে তেল, অথচ পাম্পে ঝুলছে ‘নো স্টক’ বোর্ড। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রশাসনের তদারকিহীনতা এবং সিন্ডিকেটের সাথে গোপন সমঝোতার কারণেই এই নৈরাজ্য চরমে পৌঁছেছে।

গত কয়েকদিন ধরে কালিগঞ্জের প্রধান প্রধান পাম্পগুলোতে তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন চালকরা।

মটর বাইক চালক সফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “সকাল থেকে তিনটা পাম্প ঘুরলাম, সবাই কয় তেল নাই। কিন্তু পাড়ার দোকানে ঠিকই ২৫০ টাকা লিটার বেচতিছে। গরিবের পকেট কাটার এই মগের মুল্লুক দেখার কি কেউ নেই?”

মোটরসাইকেল চালক নজরুল ইসলাম জানান, “জরুরি রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাব, কিন্তু পাম্পে তেল দিচ্ছে না। অথচ পাম্পের ভেতরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ড্রাম ভরতে দেখেছি।”

তিনি আরও বলেন দীর্ঘ লাইন ধরে দাড়িয়ে থেকে ১০০ অথবা ২০০ টাকার তেল পাওয়া যায়। তাতে খুব বেশী হলে ৪০ কিলোমিটার চলে। অন্যদিকে একটি মানুষ দৈনিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা জোনের দাম ক্ষতি করে। এভাবে চললে আমাদের সংসার লাঠে উঠবে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিপো থেকে তেল আসার পরপরই পাম্প কর্তৃপক্ষ সাধারণ গ্রাহকদের জন্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এরপর রাতের অন্ধকারে সেই তেল সরিয়ে নেওয়া হয় নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেট চক্রের গুদামে। খুচরা দোকানে বোতলজাত পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ডিজিটাল মিটারের বদলে মান্ধাতা আমলের বোতলে তেল মাপার ফলে পরিমাণেও কম পাচ্ছেন গ্রাহকরা।

অনুসন্ধানে জানাগেছে কালিগঞ্জের রতনপুর, ধলবাড়িয়া, সেকেন্দারনগর চৌমুহনী, পিরোজপুর, মহৎপুর, কুশলিয়া, পারুলগাছা, চৌমুহনী, কৃষ্ণনগর, বিষ্ণুপুর, বাঁশতলা, উজিরপুর, তারালী, নলতাসহ সর্বত্র  খুচরা তেল বিক্রেতা ইতিমধ্যে পেট্রোলপাম্প থেকে তেল নিয়ে নিজের এলাকায় মজুদ করেছে। তারা এখন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা দরে পেট্রোল বিক্রি করছে। সাথে ইউনিয়ন তেল ডিলার যারা ব্যারেলে করে তেল আনে তারা অধিকাংশ তেল মজুদ করে লুকিয়ে রেখেছে এমন অভিযোগ উঠেছে। আরও অভিযোগ উঠেছে, সারের মতো এই জ্বালানি সিন্ডিকেটেও জড়িয়ে আছে কিছু অসাধু কর্মকর্তা। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের খবর আগেই সিন্ডিকেট সদস্যদের কাছে পৌঁছে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাম্প কর্মচারী জানান, “ওপর মহলে মাসোহারা ঠিক থাকলে তেল না দিলেও কেউ কিছু বলতে পারে না। আমরা শুধু নির্দেশ পালন করি।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সারের সংকট নিয়ে যখন উপজেলা উত্তাল, তখন জ্বালানি তেলের এই নতুন সংকট সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।

উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ডাঃ শেখ শফিকুল ইসলাম বলেন, “কৃষক সেচের জন্য ডিজেল পাচ্ছে না, সাধারণ মানুষ পেট্রোল পাচ্ছে না। এই কৃত্রিম সংকটের পেছনে যারা আছে, তাদের চিহ্নিত করে এখনই ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।”

ইতিমেধ্যে কালিগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মঈনুল ইসলাম খান তেলের পাম্প গুলো ভিজিট করলেও কোন কাঙ্খিত সুফল বয়ে আনেনি। উল্টো যতদিন যাচ্ছে তত বেশী তেলের দাম বাড়ছে।

সাতক্ষীরা ৩ আসনের এমপি হাফেজ মুহাঃ রবিউল বাশার তেলের সংকট তৈরী না করে নায্যতার ভিত্তিতে বন্টন করার অনুরোধ করেছেন।

কালিগঞ্জের মানুষ এখন প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছে। পাম্পগুলোতে নিয়মিত তদারকি, সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই এবং মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই ‘তেল নাটক’ বন্ধ হবে না। সারের সিন্ডিকেটের পর তেলের এই জুলুম কি থামবে? নাকি সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করতেই সাধারণ মানুষের পকেট কাটা চলতে থাকবে?