মোঃ ইশারাত আলী :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের মৌতলা ইউনিয়নের বুক চিরে বয়ে চলা বাতাস আর গ্রামীণ মেঠোপথগুলো যেন এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের জীবনসংগ্রাম, স্বপ্ন ও রাজনীতির নীরব সাক্ষী। এই জনপদের প্রতিটা ধূলিকণায় মিশে আছে সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের গল্প। এই মৌতলা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এমনই এক লড়াকু ও আপসহীন মানুষের নাম শেখ আলমঙ্গীর হোসেন। রাজপথের রাজনীতি, পুলিশের খড়্গ, প্রতিপক্ষের হামলা আর অর্থনৈতিক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েও যিনি আজ অনড় ও অবিচল।
আব্দুর রাশেদ ও মোছাঃ আলেয়া বেগম দম্পতির কোল আলো করে পৃথিবীতে আসা শেখ আলমঙ্গীর পরিবারের সবার বড় সন্তান। দুই ভাই ও চার বোনের এই বিশাল ও সংগ্রামমুখর সংসারে আলমঙ্গীরের কাঁধে ছোটবেলা থেকেই ছিল দায়িত্বের ভারী বোঝা। মা-বাবার স্বপ্ন ছিল বড় ছেলে পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের হাল ধরবেন, ভাইবোনদের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু নিয়তির চিত্রনাট্য ছিল অন্যরকম। পারিবারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশের মাটি ও মানুষের অধিকার আদায়ের তাগিদ তাকে টেনে নিয়ে যায় রাজনীতির কঠিন মাঠে। তিনি বেছে নেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র আদর্শ। আর এই আদর্শের পথেই শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির একজন সক্রিয় ও ত্যাগী নেতা হিসেবে কাজ করতে গিয়ে শেখ আলমঙ্গীরকে যে মূল্য চুকাতে হয়েছে, তা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। রাজনীতিকে তিনি পেশা নয়, নেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। দলের দুর্দিনে রাজপথে সরব থাকার কারণে একে একে তার ঘাড়ে চেপে বসে ৩১টি রাজনৈতিক মামলা। পুলিশি হয়রানি, গ্রেফতারি পরোয়ানা আর কোর্ট-কাচারির বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে তার জীবনের সোনালী সময়গুলো কেটে গেছে।
তবে মামলার মারপ্যাঁচের চেয়েও বড় আঘাত এসেছিল তার অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর। এক সময় তিনি ছিলেন এলাকার একজন সফল ও স্বাবলম্বী মাছের ব্যবসায়ী। নিজস্ব ঘের ও চিংড়ি ব্যবসার সুবাদে তার হাত দিয়ে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার লেনদেন হতো। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং মিথ্যা মামলার কারণে তার সেই বিশাল সাম্রাজ্য আজ ধূলিসাৎ। শুধুমাত্র বিএনপির রাজনীতি করার অপরাধে তাকে প্রায় দুই কোটি টাকার মাছের ব্যবসা বিসর্জন দিতে হয়েছে। রাজনৈতিক বৈরিতার আগুনে তার পরিবারকে সচ্ছলতা দেওয়া সেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি আজ সম্পূর্ণ ভস্মীভূত।
তৃণমূলের মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার কারণে মৌতলা ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের মনে শেখ আলমঙ্গীর জায়গা করে নিয়েছেন গভীর আস্থার সাথে। এলাকার মানুষের অনুরোধে এবং নিজের রাজনৈতিক সততার জোরে তিনি অতীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে নির্বাচন তাঁর জন্য কেবল ভোটের লড়াই ছিল না, সেটি ছিল এক অসম যুদ্ধ। প্রতিপক্ষের বহুমুখী হামলা, মিথ্যা মামলার জিইয়ে রাখা এবং প্রশাসনের একপেশে ভূমিকার কারণে তাকে প্রতি পদক্ষেপে হোঁচট খেতে হয়েছে। নির্বাচনের মাঠে লড়তে গিয়ে তিনি তার সহায়-সম্পত্তি ও স্থাবর-অস্থাবর সবকিছু হারিয়ে আজ নিঃস্ব প্রায়। প্রতিপক্ষের পেশিশক্তি এবং নির্বাচনী কূটকৌশলের কাছে বারবার মার খেলেও তার নৈতিক মেরুদণ্ড কখনো বাঁকেনি। ভোটের বাক্সে ফল যাই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তিনি একজন আপসহীন নেতার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পথচলা শেখ আলমঙ্গীর হোসেনকে শিখিয়েছে চরম কিছু বাস্তবতা। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপট তাকে আরও বেশি সতর্ক করে তুলেছে। তিনি এক তিক্ত সত্য উপলব্ধি করেছেন-যাঁরা অতীতে সুবিধাবাদী চরিত্র নিয়ে ছদ্মবেশে রাজনীতি করেছেন, তাঁদের থেকে সাবধান থাকার কোনো বিকল্প নেই।
শেখ আলমঙ্গীরের স্পষ্ট বার্তা, “বিগত সময়ে যারা নিজেদের স্বার্থে আদর্শ বিসর্জন দিয়ে স্বৈরাচারী শক্তির সাথে আঁতাত করে নানামুখী সুবিধা লুটে নিয়েছে, সেই সুবিধাবাদীরাই আজ আবার নতুন খোলসে ময়দানে ভিড় জমাতে চাইছে। দলের দুর্দিনে যারা পালিয়ে ছিল কিংবা আঁতাত করে নিজেরা আখের গুছিয়েছিল, ত্যাগী নেতাকর্মীরা যদি তাদের ব্যাপারে এখন সতর্ক না হয়, তবে দলের মূল আদর্শ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য এই সুযোগসন্ধানীদের চিহ্নিত করে রাজনীতির মূল ধারা থেকে দূরে রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
আজকের দিনে শেখ আলমঙ্গীর হোসেন কেবল একটি নাম নন; তিনি কালিগঞ্জের রাজনীতিতে এক ত্যাগের প্রতীক। ব্যবসা হারিয়েছেন, মামলা মাথায় নিয়েছেন, সর্বস্বান্ত হয়েছেন-তবুও নিজের বিশ্বাসের জায়গা থেকে একচুলও সরে দাঁড়াননি। দুই ভাই ও চার বোনের সংসার সামলানোর পাশাপাশি তৃণমূলের রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে তার এই আত্মত্যাগ আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য এক অনন্য শিক্ষা।
নিজের লড়াই সম্পর্কে বলতে গিয়ে শেখ আলমঙ্গীর হোসেন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র রাজনীতি করতে গিয়ে হারিয়েছি মা ও ছোট বোনের স্বামীকে, বিলীন হয়েছে আমার শেষ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটিও। তবুও দলীয় আদর্শ ও মৌতলাবাসীর ভালোবাসা থেকে একচুলও পিছিয়ে যাইনি।”আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১২ নম্বর মৌতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে তিনি বিএনপির দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। এই লড়াকু নেতার পথচলা মসৃণ না হলেও, তার অদম্য মনোবল ও সততা প্রমাণ করে যে, সুবিধাবাদীরা সাময়িক সুবিধা পেলেও শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের পাতায় নাম লেখায় ত্যাগী ও প্রকৃত দেশপ্রেমিকরাই। শেখ আলমঙ্গীর হোসেনের এই গল্প তাই কেবল একজন ব্যক্তির নয়, বরং বাংলাদেশের তৃণমূল রাজনীতির এক জীবন্ত দলিল
প্রতিনিধির নাম 

















