1. satkhiranews24@yahoo.com : নিজস্ব প্রতিবেদক :
সাতক্ষীরা ০৩:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
কালিগঞ্জে বিএনপির ঘরেই বিরোধ, সেই ফাঁকে জামায়াতের বাজীমাত: রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ, ভোটের মাঠে কার লাভ? নিজ বিদ্যাপীঠ পরিদর্শনে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফাতিমা তুজ জোহরা কালিগঞ্জে নবমীর শারদীয় উৎসবে মণ্ডপ পরিদর্শন করলেন বিএনপি নেতা রোকনুজ্জামান রোকন কালিগঞ্জে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও আর্থিক সহায়তা দিলেন বিএনপি নেতা ডা. শফিকুল ইসলাম বাবু কালিগঞ্জে দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণের শাড়ি বিতরণ করলেন এমপি রবিউল বাশার কালিগঞ্জের বিষ্ণুপুরে ৮ দুর্গামন্দিরে অনুদানের চেক বিতরণ করলেন ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম কালিগঞ্জে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে জেলার একমাত্র নারী চেয়ারম্যান সাফিয়া পারভীন মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার মিশনে সদ্য বিদায়ী প্রতিমন্ত্রী: দৃষ্টান্ত, দায়বদ্ধতা ও অসমাপ্ত লড়াই কা‌লিগ‌ঞ্জের কৃষ্ণনগরে তোহা বাজার রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন কালিগঞ্জে দুর্গাপূজায় বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার মুকুল : মণ্ডপ পরিদর্শন ও অর্থ সহায়তা

কালিগঞ্জে বিএনপির ঘরেই বিরোধ, সেই ফাঁকে জামায়াতের বাজীমাত: রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ, ভোটের মাঠে কার লাভ?

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:২৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
  • ৩৫ বার পড়া হয়েছে

মোঃ ইশারাত আলী :

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে বিএনপির রাজনৈতিক শক্তি কি প্রতিপক্ষের চাপে ক্ষয় হচ্ছে, নাকি নিজেদের সিদ্ধান্তেই দুর্বল হয়ে পড়ছে দলটি? জাতীয় নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়া নেতাদের বহিষ্কার, তাঁদের অনুসারীদের ক্ষোভ এবং তৃণমূলের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ এখন এই প্রশ্নকে সামনে এনেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে জামায়াতের এই তৎপরতা কতটা ভোটে রূপ নিচ্ছে, আর বিএনপির বহিষ্কৃত নেতাদের সমর্থকেরা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবেন, তার উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

রাজনীতির মাঠে শূন্যতা তৈরি হলে অন্য দল সেখানে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ পায়। কালিগঞ্জে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ সেই সুযোগ তৈরি করছে কি না, তা এখন স্থানীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এখানে শুধু দলীয় কোন্দলের হিসাব নয়, সামনে রয়েছে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন এবং ভোটারদের আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ।

১. বহিষ্কারের রাজনীতি: বিএনপির শক্তি কমছে, নাকি শৃঙ্খলা ফিরছে?

দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার পর বিএনপির সামনে যখন সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তখন কালিগঞ্জে দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জাতীয় নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিজয়ী হওয়া তিন নেতাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত এবং তাঁদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা তৃণমূলের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেছে।

স্থানীয়ভাবে প্রায় সাড়ে চারশ নেতাকর্মী বহিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত বলে আলোচনা রয়েছে। তবে এই সংখ্যা, বহিষ্কারের আনুষ্ঠানিক তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থান যাচাই করা জরুরি। কারণ বহিষ্কারের সংখ্যা যত বড়ই হোক, রাজনৈতিক প্রভাব নির্ধারিত হয় তাঁদের ভোটার যোগাযোগ, স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনে সক্রিয় থাকার সক্ষমতা দিয়ে।

বিএনপির দৃষ্টিতে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শৃঙ্খলা রক্ষার অংশ হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শৃঙ্খলা রক্ষার এই প্রক্রিয়ায় দল কি এমন নেতাদেরও হারাচ্ছে, যাঁদের স্থানীয় পর্যায়ে নিজস্ব ভোট ও কর্মীভিত্তি রয়েছে?

বহিষ্কৃত নেতাদের একজন নাম প্রকাশ করেননি তার বক্তব্য, তাঁদের অনুসারীদের অবস্থান এবং উপজেলা বিএনপির ব্যাখ্যা পাশাপাশি না রাখলে এই বিরোধের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। কারণ এক পক্ষের কাছে এটি দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্ন, অন্য পক্ষের কাছে রাজনৈতিক অবমূল্যায়ন ও নেতৃত্বের সংকট।

২. জামায়াতের অগ্রগতি: মাঠের উপস্থিতি কি ভোটে রূপ নিচ্ছে?

বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীকে কালিগঞ্জে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দাবি। সামাজিক কার্যক্রম, কর্মী যোগাযোগ এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ দলটির রাজনৈতিক উপস্থিতি বাড়াতে পারে।

তবে সংগঠনের দৃশ্যমানতা আর নির্বাচনী সমর্থন এক বিষয় নয়। জামায়াতের জনসংযোগ কতটা বিস্তৃত হয়েছে, নতুন ভোটার বা নিরপেক্ষ ভোটারদের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কতটা বেড়েছে, কিংবা বিএনপির বিরোধে ক্ষুব্ধ ভোটারদের কতজন তাদের দিকে ঝুঁকছেন, তা নির্ধারণে মাঠপর্যায়ের তথ্য প্রয়োজন।

কালিগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়নে জামায়াতের কর্মসূচি, জনসম্পৃক্ততা, স্থানীয় নেতৃত্বের বক্তব্য এবং ভোটারদের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে এই অগ্রগতির প্রকৃত মাত্রা বোঝা সম্ভব হবে। শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দুর্বলতা দেখে জামায়াতের জয় নিশ্চিত ধরে নেওয়া যেমন ভুল, তেমনি দলটির সাংগঠনিক তৎপরতাকে উপেক্ষা করাও বাস্তবতাকে খাটো করে দেখা।

৩. আওয়ামী লীগের ভোট: নীরবতা কি রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা?

কালিগঞ্জের ভোটের হিসাব করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সমর্থক ও ভোটারদের অবস্থানও বিবেচনায় নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে দলটির প্রকাশ্য সাংগঠনিক কার্যক্রম সীমিত বা অনুপস্থিত থাকলেও, অতীতের নির্বাচনে তাদের সমর্থন পাওয়া ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দ একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনা রয়েছে, আওয়ামী লীগের কিছু ভোটার ও নেতাকর্মী বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থন দিতে পারেন, আবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্য দল বা প্রার্থীর প্রতিও ঝুঁকতে পারেন। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে নিশ্চিত ভোট স্থানান্তর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এখানে অনুসন্ধানের প্রশ্ন হলো, গত নির্বাচনে কোন ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থীরা কত ভোট পেয়েছিলেন, তাঁদের সমর্থনের উৎস কী ছিল এবং সেই ভোটারদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান কী? নির্বাচনী ফলাফল, স্থানীয় ভোটারদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণার তথ্য মিলিয়ে দেখলে ভোটের মেরুকরণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যাবে।

জামায়াত আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে কি না, সেটিও দলীয় কর্মসূচি ও নেতাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন ভোটার গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অবস্থানকে এককভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। তাঁদের নিরাপত্তা, সামাজিক অধিকার ও রাজনৈতিক পছন্দের প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট মানুষের নিজস্ব বক্তব্যই গুরুত্বপূর্ণ।

৪. অতীতের ত্যাগ, বর্তমানের নেতৃত্ব: বিএনপির সংকট কোথায়?

কালিগঞ্জে বিএনপির সাংগঠনিক ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৮০ সালে জালালতলা খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সফর থেকে শুরু করে এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকা দলটির ইতিহাসের অংশ।

বিভিন্ন সময়ে সরদার ইসাক আলী, মাস্টার আব্দুর রহমান, অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন আহমেদ, সরদার আমজাদ হোসেন, শাহাদাৎ হোসেন, শেখ আব্দুস সাত্তারসহ স্থানীয় নেতারা সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন বলে দলীয় ইতিহাস ও স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে শেখ এবাদুল ইসলাম ও ড. শফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন নেতৃত্ব দলটির কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

তবে অতীতের নেতৃত্বের ইতিহাস বর্তমান সাংগঠনিক সংকটের উত্তর নয়। বরং সেই ইতিহাসের আলোকে প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে থাকা নেতাকর্মীদের বর্তমান দলে কতটা মূল্যায়ন করা হচ্ছে?

২০০৯ সালের পর থেকে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও পুলিশি হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্যাতন, হয়রানি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় জড়ানোর অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে মামলা, আদালতের নথি, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বিএনপিতে অতীতে অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বর্তমান ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে কারও অতীত রাজনৈতিক পরিচয়কে একমাত্র ভিত্তি করে তাঁকে সুযোগসন্ধানী বলা যায় না। দলীয় পদ, দায়িত্ব, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করেই এই বিতর্কের মূল্যায়ন করা উচিত।

বিএনপির জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো, অতীতের ত্যাগের স্বীকৃতি এবং বর্তমান নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। এই ভারসাম্য না থাকলে দলীয় বিভাজন আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

৫. বৃক্ষমেলার মঞ্চে বিএনপির বিরোধের দৃশ্যমানতা

কালিগঞ্জের চাঁচাই বৃক্ষমেলাকে ঘিরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধের একটি দৃশ্য সামনে আসে। ১ অক্টোবর বিকেল ৫টায় চাঁচাই ফুটবল মাঠে বৃক্ষমেলার উদ্বোধন করার কথা ছিল সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মুহা. রবিউল বাশারের। তবে সময়ের স্বল্পতার কারণে তিনি উদ্বোধন করেননি।

পরে ৩ অক্টোবর সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী আলাউদ্দীন উদ্বোধন করতে গেলে তাঁর সঙ্গে উপজেলা বিএনপির নেতাদের উপস্থিতি দেখা যায়নি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, কাজী আলাউদ্দীন কি দলীয় নেতৃত্বের সমর্থন হারাচ্ছেন?

অন্যদিকে, ইঞ্জিনিয়ার আইয়ুব হোসেন মুকুল ও কৃষক দলের আহ্বায়ক রোকনুজ্জামানের সঙ্গে উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক শেখ এবাদুল ইসলাম এবং শেখ নুরুজ্জামানদের বিরোধের ঘটনাও স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ওই বিরোধের সময় লাঠি হাতে মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক মহলে আরও আলোচনা রয়েছে, বিরোধের আগে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে এসব নেতাকে একসঙ্গে দেখা গেছে। এখন তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে কি না, তা দলীয় সিদ্ধান্ত, নেতৃত্বের বিরোধ এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

এবার পুজোয় কালিগঞ্জে বিএনপি নেতাদের বিরোধ কি আরও প্রকাশ পেলো?

হ্যাঁ, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে বিএনপি নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিরোধ আরও স্পষ্ট ও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

শারদীয় দুর্গোৎসবে সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে মণ্ডপ পরিদর্শন বা শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকলেও, কালিগঞ্জে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র:

আলাদা ও বিচ্ছিন্ন মণ্ডপ পরিদর্শন: উপজেলা বিএনপির শীর্ষ ও প্রভাবশালী নেতারা একমঞ্চে না গিয়ে আলাদা আলাদা দল ও বলয় নিয়ে পূজামণ্ডপগুলোতে যান। বহিষ্কৃত ও কোন্দলে জড়িয়ে পড়া নেতাদের আলাদা বলয় এবং বর্তমান উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকাশ্যে ধরা পড়ে।

প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা: স্থানীয় পূজা মণ্ডপগুলোতে গিয়ে অনুদান প্রদান এবং নিজেদের সমর্থক পরিবেষ্টিত হয়ে নিজস্ব অবস্থান জাহির করার প্রতিযোগিতা চলেছে, যা দলীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার বদলে কোন্দলকে আরও বেশি খোলামেলা করেছে।

তৃণমূলের স্পষ্ট বিভক্তি: মণ্ডপ পরিদর্শনের সময় এক গ্রুপের নেতাদের উপস্থিতি থাকলে বিরোধী গ্রুপের অনুসারীদের অনুপস্থিত থাকতে দেখা গেছে, যা সাধারণ সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটার ও স্থানীয়দের চোখে বিএনপির অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনকেই নতুন করে ফুটিয়ে তুলেছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, উৎসবের আমেজকে কাজে লাগিয়ে যেখানে কোন্দল মেটানোর সুযোগ ছিল, সেখানে পৃথক শো-ডাউন ও বিরোধের কারণে কালিগঞ্জ বিএনপির এই গৃহদাহ সাধারণ মানুষের সামনে আরও বেশি স্পষ্ট হয়েছে।

৬. সার ডিলারশিপ ও বাশতলা বাজারে লুটপাট ঘিরে নতুন কোন রাজনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্র?

কালিগঞ্জের রাজনীতিতে সার ডিলারশিপ নিয়ে আলোচনা এবং বাশতলা বাজারে লুটপাটের অভিযোগ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে দাবি করা হচ্ছে, সার ডিলারশিপ না পাওয়া নিয়ে অসন্তোষ এবং বাশতলা বাজারের ঘটনার পর বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে দোকান মালিকের মামলা রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

৭. ভোটের আগে বিএনপির সামনে তিনটি কঠিন প্রশ্ন

কালিগঞ্জে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তিনটি প্রশ্ন সামনে রাখা প্রয়োজন।

প্রথমত, বহিষ্কৃত নেতাদের সঙ্গে বিরোধের সমাধানে দল কি আলোচনার পথ খোলা রাখছে, নাকি সাংগঠনিক শাস্তিই শেষ সিদ্ধান্ত হয়ে থাকছে?

দ্বিতীয়ত, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ ও অসন্তোষ নিরসনে উপজেলা নেতৃত্ব কী পদক্ষেপ নিয়েছে? বহিষ্কার, পুনর্বহাল কিংবা নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ?

তৃতীয়ত, জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাব্য ভোট মেরুকরণের মোকাবিলায় বিএনপির নিজস্ব কর্মসূচি কী? শুধু প্রতিপক্ষের দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে নির্বাচনী শক্তি ধরে রাখা সম্ভব নয়।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দলীয় বক্তব্যের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের তথ্য ও নির্বাচনী বাস্তবতার মধ্যেই খুঁজতে হবে।

উপসংহার: কালিগঞ্জের রাজনীতি কি ব্যক্তি-দ্বন্দ্বে আটকে থাকবে?

কালিগঞ্জের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধু বিএনপি ও জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তির তুলনায় নির্ধারিত হবে না। ভোটারদের আস্থা, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানে দলগুলোর ভূমিকা বড় হয়ে উঠবে।

বিএনপি যদি অভ্যন্তরীণ বিরোধের সমাধান করতে না পারে, তবে দলটির সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা ভোটে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে ভোটারদের বাস্তব সমর্থন এবং নির্বাচনী পরিস্থিতির ওপর।

রাজনীতির মাঠে শেষ কথা বলে ভোটার। দলীয় পদ, অতীতের ত্যাগ কিংবা বর্তমান সাংগঠনিক উপস্থিতি, কোনোটিই ভোটারের আস্থার বিকল্প নয়। কালিগঞ্জে সেই আস্থা অর্জনের লড়াই এখন দলগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কালিগঞ্জে বিএনপির ঘরেই বিরোধ, সেই ফাঁকে জামায়াতের বাজীমাত: রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ, ভোটের মাঠে কার লাভ?

কালিগঞ্জে বিএনপির ঘরেই বিরোধ, সেই ফাঁকে জামায়াতের বাজীমাত: রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ, ভোটের মাঠে কার লাভ?

আপডেট সময় : ১২:২৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

মোঃ ইশারাত আলী :

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে বিএনপির রাজনৈতিক শক্তি কি প্রতিপক্ষের চাপে ক্ষয় হচ্ছে, নাকি নিজেদের সিদ্ধান্তেই দুর্বল হয়ে পড়ছে দলটি? জাতীয় নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়া নেতাদের বহিষ্কার, তাঁদের অনুসারীদের ক্ষোভ এবং তৃণমূলের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ এখন এই প্রশ্নকে সামনে এনেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে জামায়াতের এই তৎপরতা কতটা ভোটে রূপ নিচ্ছে, আর বিএনপির বহিষ্কৃত নেতাদের সমর্থকেরা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবেন, তার উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

রাজনীতির মাঠে শূন্যতা তৈরি হলে অন্য দল সেখানে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ পায়। কালিগঞ্জে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ সেই সুযোগ তৈরি করছে কি না, তা এখন স্থানীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এখানে শুধু দলীয় কোন্দলের হিসাব নয়, সামনে রয়েছে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন এবং ভোটারদের আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ।

১. বহিষ্কারের রাজনীতি: বিএনপির শক্তি কমছে, নাকি শৃঙ্খলা ফিরছে?

দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার পর বিএনপির সামনে যখন সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তখন কালিগঞ্জে দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জাতীয় নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিজয়ী হওয়া তিন নেতাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত এবং তাঁদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা তৃণমূলের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেছে।

স্থানীয়ভাবে প্রায় সাড়ে চারশ নেতাকর্মী বহিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত বলে আলোচনা রয়েছে। তবে এই সংখ্যা, বহিষ্কারের আনুষ্ঠানিক তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থান যাচাই করা জরুরি। কারণ বহিষ্কারের সংখ্যা যত বড়ই হোক, রাজনৈতিক প্রভাব নির্ধারিত হয় তাঁদের ভোটার যোগাযোগ, স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনে সক্রিয় থাকার সক্ষমতা দিয়ে।

বিএনপির দৃষ্টিতে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শৃঙ্খলা রক্ষার অংশ হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শৃঙ্খলা রক্ষার এই প্রক্রিয়ায় দল কি এমন নেতাদেরও হারাচ্ছে, যাঁদের স্থানীয় পর্যায়ে নিজস্ব ভোট ও কর্মীভিত্তি রয়েছে?

বহিষ্কৃত নেতাদের একজন নাম প্রকাশ করেননি তার বক্তব্য, তাঁদের অনুসারীদের অবস্থান এবং উপজেলা বিএনপির ব্যাখ্যা পাশাপাশি না রাখলে এই বিরোধের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। কারণ এক পক্ষের কাছে এটি দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্ন, অন্য পক্ষের কাছে রাজনৈতিক অবমূল্যায়ন ও নেতৃত্বের সংকট।

২. জামায়াতের অগ্রগতি: মাঠের উপস্থিতি কি ভোটে রূপ নিচ্ছে?

বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীকে কালিগঞ্জে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দাবি। সামাজিক কার্যক্রম, কর্মী যোগাযোগ এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ দলটির রাজনৈতিক উপস্থিতি বাড়াতে পারে।

তবে সংগঠনের দৃশ্যমানতা আর নির্বাচনী সমর্থন এক বিষয় নয়। জামায়াতের জনসংযোগ কতটা বিস্তৃত হয়েছে, নতুন ভোটার বা নিরপেক্ষ ভোটারদের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কতটা বেড়েছে, কিংবা বিএনপির বিরোধে ক্ষুব্ধ ভোটারদের কতজন তাদের দিকে ঝুঁকছেন, তা নির্ধারণে মাঠপর্যায়ের তথ্য প্রয়োজন।

কালিগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়নে জামায়াতের কর্মসূচি, জনসম্পৃক্ততা, স্থানীয় নেতৃত্বের বক্তব্য এবং ভোটারদের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে এই অগ্রগতির প্রকৃত মাত্রা বোঝা সম্ভব হবে। শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দুর্বলতা দেখে জামায়াতের জয় নিশ্চিত ধরে নেওয়া যেমন ভুল, তেমনি দলটির সাংগঠনিক তৎপরতাকে উপেক্ষা করাও বাস্তবতাকে খাটো করে দেখা।

৩. আওয়ামী লীগের ভোট: নীরবতা কি রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা?

কালিগঞ্জের ভোটের হিসাব করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সমর্থক ও ভোটারদের অবস্থানও বিবেচনায় নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে দলটির প্রকাশ্য সাংগঠনিক কার্যক্রম সীমিত বা অনুপস্থিত থাকলেও, অতীতের নির্বাচনে তাদের সমর্থন পাওয়া ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দ একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনা রয়েছে, আওয়ামী লীগের কিছু ভোটার ও নেতাকর্মী বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থন দিতে পারেন, আবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্য দল বা প্রার্থীর প্রতিও ঝুঁকতে পারেন। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে নিশ্চিত ভোট স্থানান্তর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এখানে অনুসন্ধানের প্রশ্ন হলো, গত নির্বাচনে কোন ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থীরা কত ভোট পেয়েছিলেন, তাঁদের সমর্থনের উৎস কী ছিল এবং সেই ভোটারদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান কী? নির্বাচনী ফলাফল, স্থানীয় ভোটারদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণার তথ্য মিলিয়ে দেখলে ভোটের মেরুকরণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যাবে।

জামায়াত আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে কি না, সেটিও দলীয় কর্মসূচি ও নেতাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন ভোটার গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অবস্থানকে এককভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। তাঁদের নিরাপত্তা, সামাজিক অধিকার ও রাজনৈতিক পছন্দের প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট মানুষের নিজস্ব বক্তব্যই গুরুত্বপূর্ণ।

৪. অতীতের ত্যাগ, বর্তমানের নেতৃত্ব: বিএনপির সংকট কোথায়?

কালিগঞ্জে বিএনপির সাংগঠনিক ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৮০ সালে জালালতলা খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সফর থেকে শুরু করে এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকা দলটির ইতিহাসের অংশ।

বিভিন্ন সময়ে সরদার ইসাক আলী, মাস্টার আব্দুর রহমান, অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন আহমেদ, সরদার আমজাদ হোসেন, শাহাদাৎ হোসেন, শেখ আব্দুস সাত্তারসহ স্থানীয় নেতারা সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন বলে দলীয় ইতিহাস ও স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে শেখ এবাদুল ইসলাম ও ড. শফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন নেতৃত্ব দলটির কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

তবে অতীতের নেতৃত্বের ইতিহাস বর্তমান সাংগঠনিক সংকটের উত্তর নয়। বরং সেই ইতিহাসের আলোকে প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে থাকা নেতাকর্মীদের বর্তমান দলে কতটা মূল্যায়ন করা হচ্ছে?

২০০৯ সালের পর থেকে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও পুলিশি হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্যাতন, হয়রানি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় জড়ানোর অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে মামলা, আদালতের নথি, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বিএনপিতে অতীতে অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বর্তমান ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে কারও অতীত রাজনৈতিক পরিচয়কে একমাত্র ভিত্তি করে তাঁকে সুযোগসন্ধানী বলা যায় না। দলীয় পদ, দায়িত্ব, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করেই এই বিতর্কের মূল্যায়ন করা উচিত।

বিএনপির জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো, অতীতের ত্যাগের স্বীকৃতি এবং বর্তমান নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। এই ভারসাম্য না থাকলে দলীয় বিভাজন আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

৫. বৃক্ষমেলার মঞ্চে বিএনপির বিরোধের দৃশ্যমানতা

কালিগঞ্জের চাঁচাই বৃক্ষমেলাকে ঘিরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধের একটি দৃশ্য সামনে আসে। ১ অক্টোবর বিকেল ৫টায় চাঁচাই ফুটবল মাঠে বৃক্ষমেলার উদ্বোধন করার কথা ছিল সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মুহা. রবিউল বাশারের। তবে সময়ের স্বল্পতার কারণে তিনি উদ্বোধন করেননি।

পরে ৩ অক্টোবর সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী আলাউদ্দীন উদ্বোধন করতে গেলে তাঁর সঙ্গে উপজেলা বিএনপির নেতাদের উপস্থিতি দেখা যায়নি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, কাজী আলাউদ্দীন কি দলীয় নেতৃত্বের সমর্থন হারাচ্ছেন?

অন্যদিকে, ইঞ্জিনিয়ার আইয়ুব হোসেন মুকুল ও কৃষক দলের আহ্বায়ক রোকনুজ্জামানের সঙ্গে উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক শেখ এবাদুল ইসলাম এবং শেখ নুরুজ্জামানদের বিরোধের ঘটনাও স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ওই বিরোধের সময় লাঠি হাতে মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক মহলে আরও আলোচনা রয়েছে, বিরোধের আগে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে এসব নেতাকে একসঙ্গে দেখা গেছে। এখন তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে কি না, তা দলীয় সিদ্ধান্ত, নেতৃত্বের বিরোধ এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

এবার পুজোয় কালিগঞ্জে বিএনপি নেতাদের বিরোধ কি আরও প্রকাশ পেলো?

হ্যাঁ, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে বিএনপি নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিরোধ আরও স্পষ্ট ও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

শারদীয় দুর্গোৎসবে সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে মণ্ডপ পরিদর্শন বা শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকলেও, কালিগঞ্জে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র:

আলাদা ও বিচ্ছিন্ন মণ্ডপ পরিদর্শন: উপজেলা বিএনপির শীর্ষ ও প্রভাবশালী নেতারা একমঞ্চে না গিয়ে আলাদা আলাদা দল ও বলয় নিয়ে পূজামণ্ডপগুলোতে যান। বহিষ্কৃত ও কোন্দলে জড়িয়ে পড়া নেতাদের আলাদা বলয় এবং বর্তমান উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকাশ্যে ধরা পড়ে।

প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা: স্থানীয় পূজা মণ্ডপগুলোতে গিয়ে অনুদান প্রদান এবং নিজেদের সমর্থক পরিবেষ্টিত হয়ে নিজস্ব অবস্থান জাহির করার প্রতিযোগিতা চলেছে, যা দলীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার বদলে কোন্দলকে আরও বেশি খোলামেলা করেছে।

তৃণমূলের স্পষ্ট বিভক্তি: মণ্ডপ পরিদর্শনের সময় এক গ্রুপের নেতাদের উপস্থিতি থাকলে বিরোধী গ্রুপের অনুসারীদের অনুপস্থিত থাকতে দেখা গেছে, যা সাধারণ সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটার ও স্থানীয়দের চোখে বিএনপির অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনকেই নতুন করে ফুটিয়ে তুলেছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, উৎসবের আমেজকে কাজে লাগিয়ে যেখানে কোন্দল মেটানোর সুযোগ ছিল, সেখানে পৃথক শো-ডাউন ও বিরোধের কারণে কালিগঞ্জ বিএনপির এই গৃহদাহ সাধারণ মানুষের সামনে আরও বেশি স্পষ্ট হয়েছে।

৬. সার ডিলারশিপ ও বাশতলা বাজারে লুটপাট ঘিরে নতুন কোন রাজনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্র?

কালিগঞ্জের রাজনীতিতে সার ডিলারশিপ নিয়ে আলোচনা এবং বাশতলা বাজারে লুটপাটের অভিযোগ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে দাবি করা হচ্ছে, সার ডিলারশিপ না পাওয়া নিয়ে অসন্তোষ এবং বাশতলা বাজারের ঘটনার পর বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে দোকান মালিকের মামলা রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

৭. ভোটের আগে বিএনপির সামনে তিনটি কঠিন প্রশ্ন

কালিগঞ্জে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তিনটি প্রশ্ন সামনে রাখা প্রয়োজন।

প্রথমত, বহিষ্কৃত নেতাদের সঙ্গে বিরোধের সমাধানে দল কি আলোচনার পথ খোলা রাখছে, নাকি সাংগঠনিক শাস্তিই শেষ সিদ্ধান্ত হয়ে থাকছে?

দ্বিতীয়ত, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ ও অসন্তোষ নিরসনে উপজেলা নেতৃত্ব কী পদক্ষেপ নিয়েছে? বহিষ্কার, পুনর্বহাল কিংবা নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ?

তৃতীয়ত, জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাব্য ভোট মেরুকরণের মোকাবিলায় বিএনপির নিজস্ব কর্মসূচি কী? শুধু প্রতিপক্ষের দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে নির্বাচনী শক্তি ধরে রাখা সম্ভব নয়।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দলীয় বক্তব্যের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের তথ্য ও নির্বাচনী বাস্তবতার মধ্যেই খুঁজতে হবে।

উপসংহার: কালিগঞ্জের রাজনীতি কি ব্যক্তি-দ্বন্দ্বে আটকে থাকবে?

কালিগঞ্জের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধু বিএনপি ও জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তির তুলনায় নির্ধারিত হবে না। ভোটারদের আস্থা, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানে দলগুলোর ভূমিকা বড় হয়ে উঠবে।

বিএনপি যদি অভ্যন্তরীণ বিরোধের সমাধান করতে না পারে, তবে দলটির সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা ভোটে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে ভোটারদের বাস্তব সমর্থন এবং নির্বাচনী পরিস্থিতির ওপর।

রাজনীতির মাঠে শেষ কথা বলে ভোটার। দলীয় পদ, অতীতের ত্যাগ কিংবা বর্তমান সাংগঠনিক উপস্থিতি, কোনোটিই ভোটারের আস্থার বিকল্প নয়। কালিগঞ্জে সেই আস্থা অর্জনের লড়াই এখন দলগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।