ইশারাত আলী :
শিয়াল নেই, খাটাশ নেই। অথচ রাত নামলেই যেন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে গ্রামের একের পর এক সম্পদ। সকালে মাঠে ছাগল বেঁধে বাড়ি ফিরছেন কৃষক, বিকালে গিয়ে দেখছেন দড়ি আছে, ছাগল নেই। উঠানে হাঁস-মুরগি ছিল, সকালে খোঁজ মিলছে না। সাইকেল ছিল ঘরে, সেটিও উধাও। আবার মাঠে গিয়ে কৃষকের চোখে পড়ছে আরও বড় শূন্যতা—সেচের মোটর নেই, পড়ে আছে শুধু তারের অংশ।
কোথাও অভিযোগ, মোটরসাইকেলে করে ছাগল তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কোথাও চলন্ত ভ্যানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে রাজহাঁস। রাতের আঁধারে গাছ থেকে উধাও নারকেল-কলা, ক্ষেত থেকে কচু-ওল। যেন চোরের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না গ্রামের কিছুই।
প্রশ্ন হলো-এগুলো কি বিচ্ছিন্ন চুরি, নাকি কালিগঞ্জজুড়ে সক্রিয় কোনো সংঘবদ্ধ চোরচক্রের কাজ?
আর চুরি হওয়া ছাগল, সেচের মোটর, হাঁস-মুরগি কিংবা কৃষকের ফসলই বা যাচ্ছে কোথায়? চোর ধরা পড়ার আগেই কি চোরাই মাল পৌঁছে যাচ্ছে নির্দিষ্ট কোনো বাজারে?
কিন্তু এসব কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে সংঘবদ্ধ কোনো চক্র? স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, চোরের টার্গেটে এখন শুধু মূল্যবান সামগ্রী নয়, গ্রামের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সবকিছুই।
হাঁস-মুরগি, ছাগল, রাজহাঁস, নারকেল, কলা, কচু, ওল এবং কৃষকের সেচের মোটর, সাইকেল চুরির অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সেচের মোটর চুরি কৃষকের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি মোটর হারানো মানে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, জমির সেচব্যবস্থাও ব্যাহত হওয়া।
এখানেই অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন। চুরি হওয়া ছাগল বা গবাদিপশু কি স্থানীয় হাটে বিক্রি হচ্ছে? কৃষকের মোটর কি ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে যাচ্ছে? চুরি হওয়া হাঁস-মুরগি বা রাজহাঁসের ক্রেতা কারা? যদি একই ধরনের চুরি একাধিক ইউনিয়নে ঘটে থাকে, তাহলে ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
কৃষ্ণনগরের ডাঃ গোলাম মোস্তফা চুরির ঘটনায় স্থানীয়দের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন চোর চুরি করেই সাইকেলের মালিকের কাছে বিক্রি করছে। ক্ষেত থেকে কৃষকের ওল তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
শফিকুল ইসলাম বেজুয়া এলাকায় বিভিন্ন ধরনের চুরির অভিযোগের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন পর পর আমার ৭টি মোটর চুরি হয়ে গেছে। ২০০ গজ তার চুরি করে নিয়ে গেছে। আমি থানায় জিডি করেছি। কোন প্রতিকার পাইনি। সাংবাদিক আলমগীর হোসেনও হাঁস-মুরগি, ছাগল ও কৃষকের মোটরসহ বিভিন্ন মালামাল চুরির অভিযোগের কথা জানিয়েছেন।
তবে এসব বক্তব্য স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোগ। নির্দিষ্ট ঘটনায় কে বা কারা জড়িত, তা আইনগতভাবে প্রমাণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে শ্রীকলার আসাদুজ্জামান। কিছুদিন আগে তার একটি ছাগল মাঠে বেধে রেখে যায় ঘাস খাওয়ার জন্য পরে তিনি আর সে ছাগল খুজে পাননি।
চুরির অভিযোগের পাশাপাশি স্থানীয়দের একাংশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে প্রয়োজন থানার নথি। গত এক বছরে বিভিন্ন ইউনিয়নে চুরি নিয়ে কতটি জিডি ও মামলা হয়েছে, কতটি ঘটনায় আসামি শনাক্ত বা গ্রেপ্তার হয়েছে এবং চুরি যাওয়া মালামাল কতটুকু উদ্ধার হয়েছে, এসব তথ্য সামনে এলে পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
একই সঙ্গে চুরি হওয়া মোটর, গবাদিপশু ও অন্যান্য মালামাল উদ্ধারের স্থানগুলো বিশ্লেষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চোর ধরা পড়ার পাশাপাশি চোরাই মাল কোথায় গিয়ে উঠছে, সেটি শনাক্ত করা গেলে চুরির পুরো চেইন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
একাধিক ইউনিয়নের চুরির ঘটনায় কি একই ধরনের কৌশল দেখা যাচ্ছে? চুরি হওয়া কৃষি সরঞ্জাম ও গবাদিপশুর কোনো নির্দিষ্ট বাজারে যাওয়ার তথ্য আছে কি? আগের চুরি মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একই ধরনের একাধিক অভিযোগ রয়েছে কি? চোরাই মাল কেনাবেচার অভিযোগে কোনো ক্রেতা বা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি? গ্রাম পুলিশ, জনপ্রতিনিধি ও বিট পুলিশিংয়ের কাছে জমা পড়া অভিযোগের সঙ্গে থানার মামলার পরিসংখ্যানের মিল কতটা?
কালিগঞ্জের মানুষের অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা বের করতে হলে এখন প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান এবং সরকারি নথি যাচাই। কারণ একটি ছাগল চুরি হওয়ার ঘটনা হয়তো একটি পরিবারের ক্ষতি। কিন্তু একই ধরনের ঘটনা যদি উপজেলার একাধিক ইউনিয়নে নিয়মিত ঘটে, তাহলে বিষয়টি বৃহত্তর আইনশৃঙ্খলা ও চোরাই পণ্যের বাজারের প্রশ্নও সামনে আনে।
প্রতিনিধির নাম 









