মোঃ ইশারাত আলী :
জীবন মানে তো বেঁচে থাকার লড়াই, একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই আর শেষ বয়সে সন্তানদের নিয়ে দুবেলা ডাল-ভাত খেয়ে শান্তিতে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। কিন্তু মানুষের এই সহজ সরল স্বপ্নগুলোকে যখন কেউ পুঁজি করে এক মায়াজাল বুনে, আর তিল তিল করে জমানো সেই স্বপ্নগুলোকে এক নিমেষে তছনছ করে দেয়-তখন তাকে আর যা-ই হোক, অপরাধ কেবল বলা চলে না; তা হলো মানবতা ও জীবনের ওপর এক নিষ্ঠুর প্রবঞ্চনা। গত দুই বছর ধরে সাতক্ষীরার মাটি ও মানুষের বুক চিরে এমনই এক নির্মম প্রতারণার রাজত্ব চালিয়ে আসছে বিতর্কিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘বুশরা গ্রুপ’। সমবায় সমিতির চটকদার সাইনবোর্ড আর অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের শত শত কোটি টাকা লোপাট করে এই চক্রটি আজ গড়ে তুলেছে বিত্তবৈভবের পাহাড়। আর সেই পাহাড়ের ইটগুলো গাঁথা হয়েছে হাজারো হতদরিদ্র মানুষের চোখের জলে, না খেয়ে থাকা দিনগুলোতে আর তাদের তপ্ত দীর্ঘশ্বাসে।
আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় সাতক্ষীরার বুশরা হাসপাতালসংলগ্ন প্রধান কার্যালয়ে যখন অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ আমানতকারী হানা দেন, তখন বেরিয়ে আসে সেই রুদ্ধদ্বার অন্ধকার জগতের লোমহর্ষক সব চিত্র। চরম উত্তেজনার মুখে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পেছনের দরজা দিয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যান প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন। কিন্তু যারা সাধারণ মানুষের ঘাম ঝরানো রক্ত চুষে নিজেদের ভাগ্য বদলেছেন, সেই ম্যানেজারদের পালানোর পথ ছিল না। জনতার রোষানলে পড়ে একে একে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন মো. ইয়াসিন, আবু জাফর, আসাদুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, হাসানানুজ্জামান রাজু এবং রফিকুল ইসলামের মতো দুর্নীতিবাজ শাখা ব্যবস্থাপকগণ। সাধারণ মানুষের সেই ক্ষোভ আর কান্নার রোল আজ আকাশছোঁয়া।
সাতক্ষীরার অলিগলিতে এখন শুধু একটাই আলোচনা-কীভাবে তিল তিল করে জমানো সারা জীবনের সম্বল এক রাতে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। বুশরা গ্রুপের খপ্পরে পড়ে আজ নিঃস্ব হয়ে গেছেন শত শত সাধারণ মানুষ। কেউ নিজের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে জমি কেনার টাকা রেখেছিলেন এখানে, কেউ প্রবাসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে জমানো কষ্টের এক একটি টাকা তুলে দিয়েছিলেন এই প্রতারকদের হাতে। মেয়েকে পাত্রস্থ করবেন, এমন বিয়ের জমানো টাকাও রেহাই পায়নি এই লোভী চক্রের হাত থেকে।
আজকের সেই অবরুদ্ধ কার্যালয়ের সামনে দাঁড়ালে কান্নার যে রোল ভেসে আসে, তা পাথরকেও গলিয়ে দিতে পারে। বৃদ্ধ বয়সে বার্ধক্যের ওষুধ কেনার টাকা যাদের নেই, তারা আজ দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। গত দুই বছর ধরে দিনের পর দিন অফিসে এসে ঘুরেছেন আমানতকারীরা। কিন্তু প্রতিবারই তাদের কপালে জুটেছে মিথ্যা আশ্বাস, ভুয়া টালবাহানা আর ধমক। অথচ এই মানুষগুলোর মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে বুশরা গ্রুপের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম, এমডি ইকবাল কবির পলাশ এবং পরিচালক মামুনরা গড়ে তুলেছেন বিলাসের মিনার।
একটি প্রতিষ্ঠানের সর্বেসর্বা কর্তাদের পাশাপাশি এই লুটপাটের মহোৎসবে সমানভাবে উল্লাস করেছেন মাঠপর্যায়ের শাখা ম্যানেজাররা। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক লোমহর্ষক চিত্র। যে মানুষগুলো একসময় সাধারণ সাইকেল চালিয়ে কিংবা নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থায় চলাফেরা করতেন, আজ তারাই শত শত কোটি টাকার মালিক! গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ করে ম্যানেজার ইয়াসিন, আবু জাফর, আসাদুল, কামরুজ্জামান, রাজু ও রফিকুল ইসলামরা এলাকায় গড়ে তুলেছেন একের পর এক আলিশান অট্টালিকা।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এসব যেন কোনো রাজপ্রাসাদ। কিন্তু এই আলিশান বাড়ির প্রতিটি ইট, প্রতিটি রড আর সুরকির নিচে লুকিয়ে আছে শত শত হতদরিদ্র মানুষের না পাওয়ার বেদনা, না খেতে পেয়ে শুকিয়ে যাওয়া শিশুর মুখ আর মায়েদের দীর্ঘশ্বাস। সাধারণ মানুষের রক্ত নিংড়ে নেওয়া টাকায় কেনা হয়েছে দামি গাড়ি, বেনামে কেনা হয়েছে শত শত বিঘা জমি। ম্যানেজারদের এই বেপরোয়া বিলাসবহুল জীবনযাপন যেন সরাসরি মুখের ওপর বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে খেটে খাওয়া মানুষগুলোর অসহায়ত্বের প্রতি। গরিবের কষ্টের রক্ত আর চোখের জলের সিঁড়ি বেয়ে তারা আজ ক্ষমতার শিখরে আসীন।
দিনের পর দিন প্রতারণার শিকার হয়ে এবং কোনো উপায় না পেয়ে ভুক্তভোগী কালিগঞ্জের আমানতকারীরা সম্প্রতি জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। স্মারকলিপিতে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে বুশরা গ্রুপের এই চক্রটি সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে আসছে। চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম, এমডি ইকবাল কবির পলাশ এবং ভাউচার মামুনের নেতৃত্বে চলা এই সিন্ডিকেটের সমস্ত অবৈধ সম্পদ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অবিলম্বে জব্দ করার দাবি জানানো হয়েছে সেখানে। পাশাপাশি ম্যানেজারদের আলিশান বাড়িগুলোর পেছনের রহস্য উন্মোচন করে লুটপাট করা প্রতিটি টাকা উদ্ধার করে আমানতকারীদের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়ার জোরালো দাবি জানানো হয়।
কিন্তু প্রশাসনের হস্তক্ষপে বা স্মারকলিপির পরও যখন এই চক্রের টনক নড়েনি, তখন আর সহ্য করতে পারেননি ভুক্তভোগীরা। আজ দুপুরে যখন তারা অফিসে হানা দেন, তখন সেই চাপা ক্ষোভ লাভা হয়ে ফেটে পড়ে। সাধারণ মানুষের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যে কোনো সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে, তা আজ মাঠের পরিস্থিতি দেখেই অনুমান করা যায়।
আজ সাতক্ষীরার এই বুশরা গ্রুপের অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষের মুখেই একটি মাত্র প্রশ্ন-আমাদের এই সর্বনাশের দায় কে নেবে? যাদের জীবনের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তারা আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন? বার্ধক্যের লাঠি হারিয়ে যারা আজ রাস্তায় বসেছেন, তাদের চোখের জল কি মুছে দেওয়ার কেউ নেই?
সমবায় সমিতির সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে যারা সাধারণ মানুষের সাথে এই নির্মম তামাশা করেছে, আইন তাদের ছাড় দেওয়া মানে অপরাধকে আরও প্রশ্রয় দেওয়া। অবিলম্বে পলাতক চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম ও এমডি ইকবাল কবির পলাশ পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন সহ শাখা ম্যানেজারদের গ্রেফতার করতে হবে। একই সাথে অবরুদ্ধ ম্যানেজারদের অবৈধভাবে গড়ে তোলা সমস্ত আলিশান বাড়ি ও সম্পদ ক্রোক করে সাধারণ আমানতকারীদের রক্ত-ঘাম ঝরানো অর্থ বুঝিয়ে দিতে হবে। অন্যথায়, সর্বস্ব হারানো এই মানুষগুলোর দীর্ঘশ্বাসের আগুন একদিন জ্বালিয়ে দেবে এই প্রতারকদের সব সুখের প্রাসাদ। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ে এখনই সময় রুখে দাঁড়ানোর।
প্রতিনিধির নাম 









