সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে সাধারণ খেটে খাওয়া ও সরলপ্রাণ মানুষের কষ্টার্জিত কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে বিতর্কিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘বুশরা গ্রুপ’-এর বিরুদ্ধে। আমানতের মেয়াদ শেষ হলেও গ্রাহকদের টাকা ফেরত না দিয়ে নানা টালবাহানা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সর্বশেষ পর্যাপ্ত তহবিল ছাড়াই ব্যাংক চেক দিয়ে প্রতারণার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী গ্রাহকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। নিরুপায় হয়ে গ্রাহকরা এখন আদালতের দারস্থ হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
দীর্ঘদিন ধরে বুশরা গ্রুপের বিভিন্ন প্রকল্পে আমানত রেখেছিলেন স্থানীয় শত শত মানুষ। কিন্তু মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর গ্রাহকরা তাদের জমানো টাকা তুলতে গেলে শুরু হয় কালক্ষেপণ। বারবার অফিসে ঘুরেও টাকা না পেয়ে ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। গ্রাহকদের তীব্র চাপের মুখে একপর্যায়ে বুশরা গ্রুপের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইকবাল কবির পলাশসহ দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা পাওনা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যাংক চেক প্রদান করেন।
কিন্তু গ্রাহকরা সেই চেক নির্দিষ্ট ব্যাংকে জমা দিতে গেলে তা পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে ‘বাউন্স’ বা ডিজঅনার হয়। ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে ব্যর্থ হয়ে প্রতারিত গ্রাহকরা বুঝতে পারেন এটি ছিল মূলত একটি পরিকল্পিত ‘চেকের ফাঁদ’। চেক বাউন্সের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালতে চেক জালিয়াতির মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগীরা।
পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হওয়ায় এবং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সম্পদ গোপনে বিক্রি বা হস্তান্তরের পাঁয়তারা চালানো হচ্ছে অভিযোগ করে গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা (স্মারক নম্বর- ১০৪০, তারিখ: ২৭/০৮/২০২৬)। স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, বুশরা গ্রুপের বিভিন্ন সমবায় সমিতির নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে নানা ফন্দি আঁটা হচ্ছে। আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধ না করে কালিগঞ্জ শাখা অফিস সিলগালাসহ এর সম্পত্তি গোপনে বিক্রির চেষ্টা চলছে।
ভুক্তভোগী সিরাজুল ইসলাম আক্ষেপ করে জানান, “জীবনের সব সঞ্চয় বুশরা গ্রুপে রেখে আজ আমরা পথে বসেছি। টাকা চাইতে গেলে আমাদের ওপর চড়াও হওয়া হয় এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির হুমকি দেওয়া হয়। আদালতের চেক মামলার মাধ্যমে এই প্রতারক চক্রের আসল মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে।”
এমনকি এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে বা গণমাধ্যমের সামনে মুখ খুললে তাকে চরম মূল্য দিতে হয়। কিছুদিন আগে বুশরা গ্রুপ ও এম আর গ্রুপের দুর্নীতির চিত্র গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরায় কালিগঞ্জ অফিসের কর্মী ইউসুফকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। সত্য প্রকাশ করায় এভাবে কর্মী ছাঁটাই এবং গ্রাহকদের হুমকি দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে অনিয়ম ঢাকতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে।
বুশরা গ্রুপে টাকা আটকে থাকায় কালিগঞ্জের বহু পরিবার আজ চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে জমানো টাকা তুলতে না পেরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন আমানতকারীরা। সাধারণ মানুষের এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বুশরা গ্রুপের শীর্ষ কর্তারা নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ালেও প্রতিকার মিলছে না।
গ্রাহকদের দাবি, অবিলম্বে বুশরা গ্রুপের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব জব্ফ এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক করতে হবে, যাতে কেউ গোপনে সম্পত্তি বিক্রি করে পালিয়ে যেতে না পারে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া স্মারকলিপি দ্রুত আমলে নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপে যদি এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে কালিগঞ্জের সাধারণ আমানতকারীরা আরও বড় ধরনের আন্দোলনের ডাক দিতে বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের তরফ থেকে এই প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় এবং ভুক্তভোগীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ফিরে পান কি না।
মোঃ ইশারাত আলী 









