মোঃ ইশারাত আলী :
মরুভূমির তীব্র দাবদাহে তপ্ত ঘাম ঝরিয়ে কিংবা ভিনদেশের নানা প্রতিকূলতা সয়ে যে মানুষগুলো দেশের অর্থনীতি সচল রাখছেন, সেই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের রক্ত-জল করা কষ্টের টাকায় আজ চলছে একদল প্রতারকের বিলাসিতা। দুবাই, কাতার, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা সৌদি আরবের মরুভূমি থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তিল তিল করে জমানো সারা জীবনের সম্বল আজ এক নিমিষেই শূন্য। ‘বুশরা গ্রুপ’-এর তৈরি করা এক সুনিপুণ ও অভিনব প্রতারণার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন হাজার হাজার প্রবাসী। শুধু দেশের ভেতরের সাধারণ গ্রাহকদের আমানত লুটে ক্ষান্ত হয়নি এই চক্র; সুচতুর কায়দায় ভুল বুঝিয়ে ও লোভনীয় স্বপ্নের জাল বুনে প্রবাসীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে তাঁদের পথে বসিয়েছে তারা।
হাতে জমা থাকা ব্যাংকের মানি রিসিট আর চোখের কোণে জমে থাকা বুকফাটা কান্নার জল আজ ওই প্রবাসীদের একমাত্র সম্বল। পকেটে থাকা মানি রিসিটগুলো যেন প্রতারণার একেকটি জীবন্ত দলিল, যা দিকে দিকে সাক্ষ্য দিচ্ছে এক নির্মম অর্থনৈতিক হত্যাকাণ্ডের। নিঃস্ব এই মানুষগুলোর একটাই আক্ষেপ— “টাকাগুলো তো কেবল কাগজ বা সংখ্যা ছিল না, ওগুলো ছিল আমাদের প্রবাসের একেকটি নিঃশ্বাস আর পরিবারের মুখে হাসি ফুটানোর শেষ আশ্রয়!”
অনুসন্ধানে প্রবাসীদের সাথে কথা বলে ও মানি রিসিটসহ বিভিন্ন ডকুমেন্ট বিশ্লেষণ করে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মরত হাজার হাজার প্রবাসী বুশরা গ্রুপের লোভনীয় ও চটকদার অফার বা বিভিন্ন স্কিমের ফাঁদে পা দেন। কেউ প্রবাসের ১০ বছরের জমানো শেষ সম্বল তুলে দিয়েছেন, কেউ বা আবার লোন করে বা ধারকর্জ করে বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু গ্রুপটির চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইকবাল কবির পলাশ ভুয়া প্রতিশ্রুতি ও প্রলোভনের মাধ্যমে সেই সমস্ত প্রবাসীর তিল তিল করে জমানো কোটি কোটি টাকা একে একে আত্মসাৎ করে লাপাত্তা হয়ে গেছেন।
দুবাই প্রবাসী এক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করে জানান, “দিনের পর দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তিল তিল করে জমানো টাকাগুলো এক নিমিষেই শেষ হয়ে যাবে, তা কোনো দিন কল্পনাও করিনি। বুশরা গ্রুপের লোকজন এমনভাবে বিশ্বাস অর্জন করেছিল যে আমরা আমাদের সর্বস্ব তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম।”
মালয়েশিয়া প্রবাসী আরেক ভুক্তভোগীর পকেটে এখনো সযত্নে ভাঁজ করা রয়েছে বুশরা গ্রুপের সেই মানি রিসিটগুলো, যেগুলো আজ তাদের প্রতারণার জীবন্ত দলিল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, দেশে থাকা পরিবারের ভরসা রাখতে গিয়ে আজ তিনি নিজেই পরবাসীর মাটিতে সম্পূর্ণ সহায়সম্বলহীন।
প্রতারণার এই জালে প্রবাসীদের ফাঁসাতে ব্যবহার করা হয়েছিল নিজস্ব লোকবল। সৌদি আরবের রিয়াদ বা বিভিন্ন প্রদেশে কর্মরত সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জের এক রেমিট্যান্স যোদ্ধা বুকফাটা কান্নায় বলেন, “পরিবারকে না জানিয়ে ম্যানেজার মোফাজ্জেলের মাধ্যমে বুশরা গ্রুপে টাকা ইনভেস্ট করেছিলাম, ভেবেছিলাম দেশে ফিরে একটা ছোট ব্যবসা করব। এখন দেশে ফেরার মুখটুকুও বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ স্ত্রী-সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার সব টাকা বুশরা গ্রুপ মেরে দিয়েছে। শুধু তাই না, বুশরা গ্রুপ আমাদের স্বপ্নগুলোকে খুন করেছে।”
দূর পরবাসে বসে দেশের খবরের কাগজ কিংবা অনলাইন পোর্টালগুলোতে যখন এই প্রতারণার খবর সামনে আসে, তখন অনেক প্রবাসীর রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। দিনের বেলা কঠোর পরিশ্রম আর রাতে দুশ্চিন্তায় অনেকেরই স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। মানি রিসিটগুলো এখন তাদের কাছে অধিকার আদায়ের শেষ প্রতীক হলেও, বিচার পাওয়ার দীর্ঘসূত্রিতায় তারা আরও বেশি ভেঙে পড়েছেন। কাতারে কর্মরত আরেক রেমিট্যান্স যোদ্ধা আক্ষেপ করে বলেন, “পরিবারকে না জানিয়ে তলে তলে টাকাগুলো ইনভেস্ট করেছিলাম, এখন আমার স্ত্রী–সন্তান নিয়ে দেশে ফেরার সব পথ বন্ধ।“
হাজার হাজার প্রবাসীর স্বপ্ন ও ত্যাগের এই বিশাল অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছে প্রবাস অঙ্গনেও। যাঁরা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রতিনিয়ত প্রবাসের মাটিতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, সেই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এমন করুণ পরিণতি সমাজ ও রাষ্ট্রের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
ভুক্তভোগী প্রবাসীরা ও তাঁদের পরিবারবর্গ সরকারের উচ্চপর্যায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ এবং অবিলম্বে বুশরা গ্রুপের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম, এমডি ইকবাল কবির পলাশ ও ম্যানেজার মোফাজ্জেলসহ এই চক্রের সাথে জড়িত সকল প্রতারকদের আইনের আওতায় এনে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। একই সাথে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ উদ্ধারে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা। এই ভয়াবহ প্রতারণার জাল কতদূর বিস্তৃত এবং এর পেছনে কারা জড়িত—তার একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
প্রতিনিধির নাম 









