ঘাতকের বুলেট একটি রাজনৈতিক অধ্যায়কে চিরতরে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তা কেবল জন্ম দিয়েছিল এক রক্তস্নাত রাজনৈতিক উত্তরসূরির। সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন যেন এক কঠিন রাজনৈতিক ময়দান—যেখানে ক্ষমতার পালাবদল মানেই ইতিহাসের এক একটি শিহরণ জাগানিয়া পাতা।
২০০৩ থেকে ২০১১ এবং পরবর্তীতে ২০১৬ থেকে ২০১৮—মাটি ও মানুষের টানে কে. এম. মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক জীবন কৃষ্ণনগরের মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রাতে কৃষ্ণনগর বাজারের যুবলীগ কার্যালয়ের সামনের সেই বিভীষিকাময় রাত সব উল্টে দেয়। ঘাতকের নির্মম bullets-এ নিভে যায় মোশাররফের প্রাণ। এরপর ২০১৯ সালের উপনির্বাচনে লাঙল প্রতীক নিয়ে সেই শূন্য আসনে বিজয়ী হন তাঁর স্ত্রী আকলিমা খাতুন। আর সেই ধারাবাহিকতার চরম নাটকীয়তায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর কঠিন দেয়াল ভেঙে আজ কৃষ্ণনগরের মসনদে আসীন নিহত নেতার কন্যা—বর্তমান চেয়ারম্যান সাফিয়া পারভিন।
বাবার রক্তভেজা পথ বেয়ে রাজনীতিতে পা রাখা, প্রতিদ্বন্দীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ক্ষমতা ধরে রাখা এবং কৃষ্ণনগরের মাটি ও মানুষের প্রতিনিধি হয়ে ওঠার সেই রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার পেছনের গল্প নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজন।
আপনার পিতা নিহত হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা আপনার রাজনৈতিক জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছে? বাবার কোন শিক্ষা আপনি সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করেন?
সাফিয়া পারভিন: আমার রাজনৈতিক জীবনে আমার বাবার আদর্শ ও মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার গভীর প্রভাব রয়েছে। তিনি সবসময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং সাধারণ মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর কাছ থেকে আমি সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা পেয়েছি, তা হলো—রাজনীতি মানুষের সেবা করার একটি মাধ্যম, ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম নয়। আমি চেষ্টা করি সেই আদর্শকে সামনে রেখেই মানুষের পাশে থাকতে।
কৃষ্ণনগর ইউনিয়নে সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে আপনার ভূমিকার কথা স্থানীয়রা বলেন। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ক্ষেত্রে আপনি কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং তার দৃশ্যমান ফল কী?
সাফিয়া পারভিন: চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইউনিয়নে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষ যেন কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়া চলাফেরা ও মতপ্রকাশ করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে আমি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করেছি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে না পারে, সে বিষয়ে আমি সবসময় সতর্ক থেকেছি। তবে আইন প্রয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় আইন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার—আমি সেখানে সহযোগিতার ভূমিকা পালন করেছি।
ইয়ার আলী, বাহার আলীসহ অতীতে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা রয়েছে। তাঁদের প্রভাব কমাতে আপনার ভূমিকা কী ছিল এবং বর্তমানে পরিস্থিতি কতটা বদলেছে?
সাফিয়া পারভিন: কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমার অবস্থান ছিল—কেউ যদি আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তাহলে তাঁর পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আসতে হবে। আমি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করেছি। বর্তমানে পরিস্থিতি আগের তুলনায় কতটা পরিবর্তিত হয়েছে, সেটি জনগণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন। আমার চেষ্টা ছিল ইউনিয়নে ব্যক্তির প্রভাবের পরিবর্তে আইন ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
আপনার বিরুদ্ধে কেউ কেউ অভিযোগ করতে পারেন যে, সন্ত্রাস দমনের নামে আপনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন। এমন অভিযোগের জবাব কী?
সাফিয়া পারভিন: এ ধরনের অভিযোগ আমি গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। আমার অবস্থান পরিষ্কার—সন্ত্রাস দমনের নামে কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করা উচিত নয়। আমার বিরুদ্ধে যদি কারও এমন অভিযোগ থাকে, তাহলে তিনি সুনির্দিষ্ট ঘটনা ও প্রমাণসহ তা প্রকাশ করতে পারেন। আমি দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে তার জবাব দিতে প্রস্তুত। রাজনৈতিক মতের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার জায়গা থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া আমার নীতি নয়।
আপনার নেতৃত্বে ইউনিয়নের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আপনার নিজের মূল্যায়ন কী? এমন কোনো ব্যর্থতা আছে কি, যা আপনি এখন স্বীকার করেন?
সাফিয়া পারভিন: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শুধু একজন চেয়ারম্যানের হাতে থাকে না; এখানে প্রশাসন, পুলিশ এবং জনগণের সম্মিলিত ভূমিকা রয়েছে। আমার সময়ে যতটুকু দায়িত্ব ছিল, আমি তা পালন করার চেষ্টা করেছি। তবে আমি বলব না যে সবকিছু শতভাগ সফল হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আরও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া বা জনগণের অভিযোগ আরও কার্যকরভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন ছিল। ভবিষ্যতে এসব জায়গায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
চেয়ারম্যান হিসেবে আপনার মেয়াদে কৃষ্ণনগর ইউনিয়নে সবচেয়ে বড় তিনটি উন্নয়ন কী হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? এসব কাজের অর্থের উৎস ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে কী বলতে চান?
সাফিয়া পারভিন: আমার মেয়াদে উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যোগাযোগব্যবস্থা, মানুষের মৌলিক সেবা এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে। যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলোর অর্থ বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দ, ইউনিয়ন পরিষদের সংশ্লিষ্ট তহবিল এবং অন্যান্য বৈধ সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে এসেছে। প্রতিটি কাজ নিয়ম ও অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। আমি চাই জনগণ কাজগুলো নিজের চোখে দেখুক এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে হিসাব ও তথ্য যাচাই করুক।
জনগণের কাছে আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন কোনটি, আর সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা কোনটি? দ্বিতীয় মেয়াদে সুযোগ পেলে কোন কাজটি প্রথমে করতে চান?
সাফিয়া পারভিন: আমার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা এবং তাদের সমস্যাগুলো শোনার চেষ্টা করা। আমি মনে করি, একজন জনপ্রতিনিধির সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগণের আস্থা। তবে সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হয়নি—এটাই বাস্তবতা। বিশেষ করে যোগাযোগব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও তরুণদের জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে কাজ বাকি রয়েছে। দ্বিতীয়বার সুযোগ পেলে মানুষের সবচেয়ে জরুরি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নিতে চাই।
আপনার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ বা সরকারি সুযোগ–সুবিধা বণ্টনে পক্ষপাতের কোনো অভিযোগ থাকলে আপনি কীভাবে তার জবাব দেবেন?
সাফিয়া পারভিন: আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই—সরকারি সুযোগ-সুবিধা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এগুলো জনগণের অধিকার। আমার বিরুদ্ধে যদি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তাহলে আমি চাই সেটি প্রমাণসহ সামনে আসুক। আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তকে স্বাগত জানাব। ভুল হয়ে থাকলে সংশোধন করতে হবে, আর অভিযোগ মিথ্যে হলে তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার হওয়া উচিত।
ইউনিয়ন পরিষদের সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ হয়রানি বা অতিরিক্ত অর্থ দাবির শিকার হন কি না, এ বিষয়ে আপনার কাছে কী ধরনের অভিযোগ এসেছে? এ ধরনের অভিযোগ পেলে আপনি কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?
সাফিয়া পারভিন: জনগণের কাছ থেকে এ ধরনের কোনো অভিযোগ এলে আমি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছি। ইউনিয়ন পরিষদের কোনো সেবা নিতে গিয়ে কেউ যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন বা নির্ধারিত ফি-এর বাইরে অর্থ দিতে বাধ্য না হন, সেটি নিশ্চিত করা জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার দায়িত্ব। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
একজন নারী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছ থেকে কোনো বিশেষ বাধার মুখোমুখি হয়েছেন কি? হয়ে থাকলে কীভাবে মোকাবিলা করেছেন?
সাফিয়া পারভিন: নারী জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে গিয়ে কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়—এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। তবে আমি মনে করি, যোগ্যতা ও কাজের মাধ্যমে সেই বাধাগুলো অতিক্রম করতে হয়। আমি ব্যক্তিগত বিরোধকে গুরুত্ব না দিয়ে দায়িত্বের জায়গা থেকে কাজ করার চেষ্টা করেছি। মানুষের সমর্থন ও প্রশাসনের সহযোগিতা আমাকে অনেক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সাহায্য করেছে।
আগামী নির্বাচনে আবারও প্রার্থী হওয়ার আপনার প্রধান কারণ কী? ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, নাকি অসমাপ্ত উন্নয়নকাজ শেষ করার লক্ষ্য?
সাফিয়া পারভিন: আমার কাছে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের নয়। আমি মনে করি, যে কাজগুলো শুরু করেছি তার কিছু এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার ফলে তাদের অনেক প্রত্যাশা ও সমস্যার বিষয়ে আমি সরাসরি জানি। তাই সুযোগ পেলে অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করা এবং নতুন প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাই আমার প্রধান লক্ষ্য।
আপনার জনপ্রিয়তার পক্ষে স্থানীয়ভাবে নানা দাবি রয়েছে। আপনি কী মনে করেন, জনগণ আপনাকে কেন আবার ভোট দিতে চাইতে পারে?
সাফিয়া পারভিন: এটা জনগণের সিদ্ধান্ত। আমি নিজে আমার জনপ্রিয়তার কোনো দাবি করতে চাই না। মানুষ আমার কাজ, আচরণ এবং তাদের পাশে থাকার বিষয়গুলো মূল্যায়ন করবেন। আমি যদি তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করে থাকি, তাহলে তারা সেটির মূল্যায়ন করবেন। আর কোথাও ব্যর্থ হয়ে থাকলে সেটিও জনগণের রায়েই প্রকাশ পাবে।
আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রধান অভিযোগগুলো কী এবং সেসব অভিযোগের মধ্যে কোনগুলোকে আপনি রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করেন?
সাফিয়া পারভিন: রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ থাকা স্বাভাবিক। কেউ আমার কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কেউ সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা করেছেন—এসব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। তবে কোনো অভিযোগকে শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিতে চাই না। অভিযোগ সত্য হলে সংশোধন করতে হবে, আর অসত্য হলে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে তার জবাব দিতে হবে। আমার কাছে ব্যক্তিগত আক্রমণের চেয়ে তথ্য ও প্রমাণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিপক্ষ যদি আপনার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলে, আপনি কি দলিল–প্রমাণসহ জনসমক্ষে তার জবাব দিতে প্রস্তুত?
সাফিয়া পারভিন: অবশ্যই। আমার বিরুদ্ধে যদি সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকে, আমি চাই সেটি প্রকাশ্যে আনা হোক। আমিও সংশ্লিষ্ট নথি, সরকারি কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে তার জবাব দিতে প্রস্তুত। জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনগণের কাছে জবাবদিহি করা আমার দায়িত্ব। তবে একইভাবে আমি চাই, অভিযোগও যেন প্রমাণের ভিত্তিতে করা হয়।
নির্বাচনে আপনার পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাস কতটা ভূমিকা রাখবে বলে আপনি মনে করেন? আপনি কি পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে নিজের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে আলাদা করে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন?
সাফিয়া পারভিন: পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাস একজন মানুষের জন্য একটি পরিচয় তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘদিন জনগণের সঙ্গে কাজ করে সেই পরিচয় ধরে রাখা সম্ভব নয় যদি নিজের কাজের গ্রহণযোগ্যতা না থাকে। আমি মনে করি, আমার পরিবারের ইতিহাসের প্রতি মানুষের সম্মান থাকতে পারে, কিন্তু আমার মূল্যায়ন হওয়া উচিত আমার নিজের কাজ, আচরণ ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে। শেষ পর্যন্ত জনগণ ব্যক্তির কাজকেই মূল্যায়ন করবেন।
কৃষ্ণনগরের তরুণ ভোটারদের জন্য আপনার বিশেষ পরিকল্পনা কী? কর্মসংস্থান, মাদক, শিক্ষা ও খেলাধুলা নিয়ে আপনার বাস্তব পরিকল্পনা কী?
সাফিয়া পারভিন: তরুণদের জন্য আমার মূল লক্ষ্য হবে তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। কারিগরি ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ এবং বিভিন্ন সরকারি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সঙ্গে তরুণদের যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে চাই। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি মাঠ ও খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
নারী ভোটার ও নারীদের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়াতে আপনার পরিকল্পনা কী?
সাফিয়া পারভিন: নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা শুধু নারীদের বিষয় নয়, এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা থাকবে। পাশাপাশি নারী ও কিশোরীদের নিরাপত্তাবিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইউনিয়নের উন্নয়নে নারীদের মতামত ও অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে চাই।
আগামী নির্বাচনে যদি ফল আপনার প্রত্যাশার বিপরীত হয়, আপনি কি জনগণের রায় মেনে নিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করবেন?
সাফিয়া পারভিন: অবশ্যই। নির্বাচন হচ্ছে জনগণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। জনগণ যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটি সম্মান করা প্রত্যেক প্রার্থীর দায়িত্ব। আমি নির্বাচনে জয়ী হলে যেমন সবার চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করতে চাই, তেমনি ফলাফল আমার প্রত্যাশার বিপরীত হলেও জনগণের রায়কে সম্মান করব এবং ইউনিয়নের স্বার্থে প্রয়োজন হলে প্রতিপক্ষসহ সবার সঙ্গে কাজ করব।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভয়ভীতি বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলে আপনি কি অবস্থান নেবেন? আপনার কর্মী–সমর্থকদের জন্য কী নির্দেশনা থাকবে?
সাফিয়া পারভিন: নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সহিংসতা, ভয়ভীতি বা ভোটারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা আমি সমর্থন করি না। আমার কর্মী-সমর্থকদের পরিষ্কার নির্দেশনা থাকবে—কেউ যেন আইন নিজের হাতে না নেয়, কোনো ভোটারকে ভয়ভীতি না দেখায় এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাতে না জড়ায়। কোনো অভিযোগ থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। আমি চাই নির্বাচন হোক শান্তিপূর্ণ, অবাধ এবং জনগণের অংশগ্রহণে।
সবশেষে, কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের ভোটারদের কাছে আপনার সরাসরি প্রশ্ন কী এবং পুনর্নির্বাচিত হলে আগামী পাঁচ বছরে আপনি তাঁদের সামনে কোন তিনটি নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি লিখিতভাবে দিতে প্রস্তুত?
সাফিয়া পারভিন: আমি কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের মানুষের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই—আপনারা গত মেয়াদে আমার কাজকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন এবং আগামী দিনে ইউনিয়নের জন্য কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চান? পুনর্নির্বাচিত হলে আমি মূলত এই তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি:
১. মাদকমুক্ত ও সম্পূর্ণ সন্ত্রাসমুক্ত নিরাপদ কৃষ্ণনগর গড়ে তোলা।
২. তরুণ সমাজের জন্য কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগ, আধুনিক শিক্ষা এবং খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করা।
৩. ইউনিয়নের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় নাগরিক সেবা পৌঁছে দিয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালনা করা।
স্বাক্ষাতকার গ্রহণে : মোঃ ইশারাত আলী

প্রতিনিধির নাম 









