1. satnews24@satkhiranews24.com : sat24admin :
সাতক্ষীরা ০৬:২১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০২ মে ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
কালিগঞ্জে উৎসবমুখর পরিবেশে মহান মে দিবস পালিত: শ্রমিক ঐক্যের বিকল্প নেই কালিগঞ্জের খাজাবাড়িয়ায় চলাচ‌লের রাস্তা নি‌য়ে বিরোধে কোদালের কোপে নারীসহ ৫ জন রক্তাক্ত জখম কালিগঞ্জে থানা সংস্কারের নামে নাজিমগঞ্জ বাজারে ‘চাঁদা’ আদায় : তোলপাড় কালিগঞ্জে সিন্ডিকেটের কবলে কৃষকের ৭৫ কোটি টাকা-রক্তচোষা অফিসার, সার ডিলার ও সুদে মহাজনের হালখাতার উল্লাস কালিগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু কালিগঞ্জে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ১৬৪৯ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার ও ২ কারবারি আটক কালিগঞ্জে বর্ণাঢ্য আয়োজনে আন্তঃপ্রাথমিক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন কালিগঞ্জে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুই কিশোর নিখোঁজ:  চরম উৎকণ্ঠায় পরিবার, থানায় পৃথক জিডি ফ‍্যাসিস্ট আমলের সব সার নিয়োগ ডিলার বাতিল নতুন সার ডিলার নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

কালিগঞ্জে এবার ‘পেট্রোল সিন্ডিকেট’: পাম্পে পাম্পে ‘তেল নেই’ নাটক, কালোবাজারে মিলছে চড়া দামে!

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৩৯:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬
  • ৭৫৪ বার পড়া হয়েছে

মোঃ ইশারাত আলী : 

সারের পর এবার সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে জ্বালানি তেল নিয়ে শুরু হয়েছে ভয়াবহ সিন্ডিকেট বাণিজ্য। ‘তেল নেই’-পাম্প মালিকদের এমন এক শব্দের অজুহাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার মোটরসাইকেল চালক, কৃষক ও পরিবহন শ্রমিক। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে তেল না মিললেও পাম্পের পেছনের দরজা দিয়ে ড্রামভর্তি পেট্রোল ও অকটেন চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের হাতে। লিটারপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা বাড়তি দিলে পাড়ার মুদি দোকানে মিলছে তেল, অথচ পাম্পে ঝুলছে ‘নো স্টক’ বোর্ড। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রশাসনের তদারকিহীনতা এবং সিন্ডিকেটের সাথে গোপন সমঝোতার কারণেই এই নৈরাজ্য চরমে পৌঁছেছে।

গত কয়েকদিন ধরে কালিগঞ্জের প্রধান প্রধান পাম্পগুলোতে তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন চালকরা।

মটর বাইক চালক সফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “সকাল থেকে তিনটা পাম্প ঘুরলাম, সবাই কয় তেল নাই। কিন্তু পাড়ার দোকানে ঠিকই ২৫০ টাকা লিটার বেচতিছে। গরিবের পকেট কাটার এই মগের মুল্লুক দেখার কি কেউ নেই?”

মোটরসাইকেল চালক নজরুল ইসলাম জানান, “জরুরি রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাব, কিন্তু পাম্পে তেল দিচ্ছে না। অথচ পাম্পের ভেতরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ড্রাম ভরতে দেখেছি।”

তিনি আরও বলেন দীর্ঘ লাইন ধরে দাড়িয়ে থেকে ১০০ অথবা ২০০ টাকার তেল পাওয়া যায়। তাতে খুব বেশী হলে ৪০ কিলোমিটার চলে। অন্যদিকে একটি মানুষ দৈনিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা জোনের দাম ক্ষতি করে। এভাবে চললে আমাদের সংসার লাঠে উঠবে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিপো থেকে তেল আসার পরপরই পাম্প কর্তৃপক্ষ সাধারণ গ্রাহকদের জন্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এরপর রাতের অন্ধকারে সেই তেল সরিয়ে নেওয়া হয় নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেট চক্রের গুদামে। খুচরা দোকানে বোতলজাত পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ডিজিটাল মিটারের বদলে মান্ধাতা আমলের বোতলে তেল মাপার ফলে পরিমাণেও কম পাচ্ছেন গ্রাহকরা।

অনুসন্ধানে জানাগেছে কালিগঞ্জের রতনপুর, ধলবাড়িয়া, সেকেন্দারনগর চৌমুহনী, পিরোজপুর, মহৎপুর, কুশলিয়া, পারুলগাছা, চৌমুহনী, কৃষ্ণনগর, বিষ্ণুপুর, বাঁশতলা, উজিরপুর, তারালী, নলতাসহ সর্বত্র  খুচরা তেল বিক্রেতা ইতিমধ্যে পেট্রোলপাম্প থেকে তেল নিয়ে নিজের এলাকায় মজুদ করেছে। তারা এখন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা দরে পেট্রোল বিক্রি করছে। সাথে ইউনিয়ন তেল ডিলার যারা ব্যারেলে করে তেল আনে তারা অধিকাংশ তেল মজুদ করে লুকিয়ে রেখেছে এমন অভিযোগ উঠেছে। আরও অভিযোগ উঠেছে, সারের মতো এই জ্বালানি সিন্ডিকেটেও জড়িয়ে আছে কিছু অসাধু কর্মকর্তা। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের খবর আগেই সিন্ডিকেট সদস্যদের কাছে পৌঁছে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাম্প কর্মচারী জানান, “ওপর মহলে মাসোহারা ঠিক থাকলে তেল না দিলেও কেউ কিছু বলতে পারে না। আমরা শুধু নির্দেশ পালন করি।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সারের সংকট নিয়ে যখন উপজেলা উত্তাল, তখন জ্বালানি তেলের এই নতুন সংকট সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।

উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ডাঃ শেখ শফিকুল ইসলাম বলেন, “কৃষক সেচের জন্য ডিজেল পাচ্ছে না, সাধারণ মানুষ পেট্রোল পাচ্ছে না। এই কৃত্রিম সংকটের পেছনে যারা আছে, তাদের চিহ্নিত করে এখনই ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।”

ইতিমেধ্যে কালিগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মঈনুল ইসলাম খান তেলের পাম্প গুলো ভিজিট করলেও কোন কাঙ্খিত সুফল বয়ে আনেনি। উল্টো যতদিন যাচ্ছে তত বেশী তেলের দাম বাড়ছে।

সাতক্ষীরা ৩ আসনের এমপি হাফেজ মুহাঃ রবিউল বাশার তেলের সংকট তৈরী না করে নায্যতার ভিত্তিতে বন্টন করার অনুরোধ করেছেন।

কালিগঞ্জের মানুষ এখন প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছে। পাম্পগুলোতে নিয়মিত তদারকি, সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই এবং মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই ‘তেল নাটক’ বন্ধ হবে না। সারের সিন্ডিকেটের পর তেলের এই জুলুম কি থামবে? নাকি সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করতেই সাধারণ মানুষের পকেট কাটা চলতে থাকবে?

ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

কালিগঞ্জে উৎসবমুখর পরিবেশে মহান মে দিবস পালিত: শ্রমিক ঐক্যের বিকল্প নেই

কালিগঞ্জে এবার ‘পেট্রোল সিন্ডিকেট’: পাম্পে পাম্পে ‘তেল নেই’ নাটক, কালোবাজারে মিলছে চড়া দামে!

আপডেট সময় : ০২:৩৯:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬

মোঃ ইশারাত আলী : 

সারের পর এবার সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে জ্বালানি তেল নিয়ে শুরু হয়েছে ভয়াবহ সিন্ডিকেট বাণিজ্য। ‘তেল নেই’-পাম্প মালিকদের এমন এক শব্দের অজুহাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার মোটরসাইকেল চালক, কৃষক ও পরিবহন শ্রমিক। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে তেল না মিললেও পাম্পের পেছনের দরজা দিয়ে ড্রামভর্তি পেট্রোল ও অকটেন চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের হাতে। লিটারপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা বাড়তি দিলে পাড়ার মুদি দোকানে মিলছে তেল, অথচ পাম্পে ঝুলছে ‘নো স্টক’ বোর্ড। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রশাসনের তদারকিহীনতা এবং সিন্ডিকেটের সাথে গোপন সমঝোতার কারণেই এই নৈরাজ্য চরমে পৌঁছেছে।

গত কয়েকদিন ধরে কালিগঞ্জের প্রধান প্রধান পাম্পগুলোতে তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন চালকরা।

মটর বাইক চালক সফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “সকাল থেকে তিনটা পাম্প ঘুরলাম, সবাই কয় তেল নাই। কিন্তু পাড়ার দোকানে ঠিকই ২৫০ টাকা লিটার বেচতিছে। গরিবের পকেট কাটার এই মগের মুল্লুক দেখার কি কেউ নেই?”

মোটরসাইকেল চালক নজরুল ইসলাম জানান, “জরুরি রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাব, কিন্তু পাম্পে তেল দিচ্ছে না। অথচ পাম্পের ভেতরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ড্রাম ভরতে দেখেছি।”

তিনি আরও বলেন দীর্ঘ লাইন ধরে দাড়িয়ে থেকে ১০০ অথবা ২০০ টাকার তেল পাওয়া যায়। তাতে খুব বেশী হলে ৪০ কিলোমিটার চলে। অন্যদিকে একটি মানুষ দৈনিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা জোনের দাম ক্ষতি করে। এভাবে চললে আমাদের সংসার লাঠে উঠবে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিপো থেকে তেল আসার পরপরই পাম্প কর্তৃপক্ষ সাধারণ গ্রাহকদের জন্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এরপর রাতের অন্ধকারে সেই তেল সরিয়ে নেওয়া হয় নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেট চক্রের গুদামে। খুচরা দোকানে বোতলজাত পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ডিজিটাল মিটারের বদলে মান্ধাতা আমলের বোতলে তেল মাপার ফলে পরিমাণেও কম পাচ্ছেন গ্রাহকরা।

অনুসন্ধানে জানাগেছে কালিগঞ্জের রতনপুর, ধলবাড়িয়া, সেকেন্দারনগর চৌমুহনী, পিরোজপুর, মহৎপুর, কুশলিয়া, পারুলগাছা, চৌমুহনী, কৃষ্ণনগর, বিষ্ণুপুর, বাঁশতলা, উজিরপুর, তারালী, নলতাসহ সর্বত্র  খুচরা তেল বিক্রেতা ইতিমধ্যে পেট্রোলপাম্প থেকে তেল নিয়ে নিজের এলাকায় মজুদ করেছে। তারা এখন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা দরে পেট্রোল বিক্রি করছে। সাথে ইউনিয়ন তেল ডিলার যারা ব্যারেলে করে তেল আনে তারা অধিকাংশ তেল মজুদ করে লুকিয়ে রেখেছে এমন অভিযোগ উঠেছে। আরও অভিযোগ উঠেছে, সারের মতো এই জ্বালানি সিন্ডিকেটেও জড়িয়ে আছে কিছু অসাধু কর্মকর্তা। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের খবর আগেই সিন্ডিকেট সদস্যদের কাছে পৌঁছে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাম্প কর্মচারী জানান, “ওপর মহলে মাসোহারা ঠিক থাকলে তেল না দিলেও কেউ কিছু বলতে পারে না। আমরা শুধু নির্দেশ পালন করি।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সারের সংকট নিয়ে যখন উপজেলা উত্তাল, তখন জ্বালানি তেলের এই নতুন সংকট সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।

উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ডাঃ শেখ শফিকুল ইসলাম বলেন, “কৃষক সেচের জন্য ডিজেল পাচ্ছে না, সাধারণ মানুষ পেট্রোল পাচ্ছে না। এই কৃত্রিম সংকটের পেছনে যারা আছে, তাদের চিহ্নিত করে এখনই ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।”

ইতিমেধ্যে কালিগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মঈনুল ইসলাম খান তেলের পাম্প গুলো ভিজিট করলেও কোন কাঙ্খিত সুফল বয়ে আনেনি। উল্টো যতদিন যাচ্ছে তত বেশী তেলের দাম বাড়ছে।

সাতক্ষীরা ৩ আসনের এমপি হাফেজ মুহাঃ রবিউল বাশার তেলের সংকট তৈরী না করে নায্যতার ভিত্তিতে বন্টন করার অনুরোধ করেছেন।

কালিগঞ্জের মানুষ এখন প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছে। পাম্পগুলোতে নিয়মিত তদারকি, সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই এবং মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই ‘তেল নাটক’ বন্ধ হবে না। সারের সিন্ডিকেটের পর তেলের এই জুলুম কি থামবে? নাকি সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করতেই সাধারণ মানুষের পকেট কাটা চলতে থাকবে?