সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে ঠেকরা রহিমপুর মাছের ঘের মালিক সঞ্জীব সরকার (৩০)-এর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে গোটা এলাকায় শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মাছের ঘেরের পাশে উদ্ধার হওয়া তার মরদেহে মাথা, কপাল ও চোখে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যাওয়ায় ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কি না, তা নিয়ে জনমনে গভীর প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), থানা পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।
বুধবার (১ জুলাই) সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সুরতহাল প্রতিবেদনের প্রাথমিক তথ্যে মাথায় গুরুতর আঘাতের আলামত পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় থাকলেও, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে সন্দেহজনক মৃত্যু হিসেবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিহতের ব্যক্তিগত বিরোধ, মাছের ঘেরের মালিকানা নিয়ে পূর্বের বিবাদ, ঘটনার সময়কার সঞ্জীবের অবস্থান, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড ও ডেটা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, তাদের কাকা ও ভাইপো তাপস সরকার, আনন্দ সরকার ও শাওন সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সঞ্জীব সরকারের বিরোধ চলছিল। তাদের স্পষ্ট দাবি, ওই পারিবারিক ও ব্যবসায়িক বিরোধের জেরেই এ নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন।
নিহতের বাবা গোপাল সরকার জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি ও ছেলে সঞ্জীব মাছের ঘেরে যান। কিছুক্ষণ পর তিনি বাড়ি ফিরে এলেও সঞ্জীব ঘেরেই অবস্থান করেন। গভীর রাত পর্যন্ত বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে স্থানীয়রা ঘেরের পাশে তার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পরিবারকে খবর দেন।
এদিকে, অভিযুক্তরা সীমান্তবর্তী এলাকা ব্যবহার করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারে বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, কালিগঞ্জের সীমান্তবর্তী অবস্থানের সুযোগ নিয়ে অতীতেও বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে আত্মগোপন করেছে। তাই তারা দ্রুত গ্রেপ্তার, সীমান্তে বিশেষ নজরদারি এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তদন্তকারী সংস্থার একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ঘটনার পর থেকেই সম্ভাব্য সব স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তদন্তে কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানো হবে না। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং সংগৃহীত আলামতের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে সঞ্জীবের পরিবারে নেমে এসেছে অবর্ণনীয় শোকের ছায়া। তার স্ত্রী এবং মাত্র ৬ মাস বয়সী দুধের শিশু কন্যার আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। ছোট্ট শিশুটি জানে না তার বাবা আর নেই, কিন্তু মায়ের কান্নায় সেও বিচলিত হয়ে পড়ছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা। সঞ্জীবের স্ত্রী ও পরিবার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
এখন তদন্তের অগ্রগতি, ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল এবং ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে পুরো এলাকা। স্থানীয়রাও দাবি জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
সোলায়মান মামুন, হারুন অর রশিদ 








