মোঃ ইশারাত আলী :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে বন্ধ রয়েছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবনে থমকে আছে গান, নৃত্য, নাটক ও আবৃত্তির চর্চা। একসময় শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি এখন কার্যত অচল। অথচ একাডেমির নামে সরকারি বরাদ্দ, বিল-ভাউচার ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে রয়েছে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ। দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম না থাকলেও অর্থের ব্যবহার, পরিচালনা কমিটির ভূমিকা এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পদ কোথায় রয়েছে, তার স্পষ্ট হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি তাঁদের।
সম্প্রতি ভবন সংস্কার, সাংস্কৃতিক শিক্ষা চালু এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি নতুন করে সামনে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানিয়া আক্তারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কি হয়েছে? কি আছে? কি করা যায়? আমি দেখবো।’ সংশ্লিষ্ট ফাইল পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্যে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালুর অপেক্ষায় থাকা সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি, কালিগঞ্জ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে প্রায় ২৪ বছর ধরে নিয়মিত সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেই। এই দীর্ঘ সময়ে নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের গান, নাচ, নাটক কিংবা আবৃত্তি শেখার জন্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
একসময় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি এখন কেবল নামেই টিকে আছে। প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত অনুষ্ঠানের অভাবে স্থানীয় শিল্পী, সংগীতশিল্পী, নাট্যকর্মী ও আবৃত্তিকারদের চর্চার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে কালিগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাবেক সংগীত শিক্ষক পলাশ মজুমদার বলেন, কালিগঞ্জে একসময় অনেক শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাদের সেই চর্চা ধরে রাখার সুযোগ হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি সচল থাকলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি হতো।
একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের বাচ্চারা পিছিয়ে গেছে। গত ২৪ বছর এখানে সাংস্কৃতিক চর্চা নেই। একাডেমি শুধু নামেই আছে, বাস্তবে মৃত।’
তাঁর মতে, সাংস্কৃতিক শিক্ষা শুধু বিনোদনের বিষয় নয়। এটি শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘদিন ধরে এই সুযোগ বন্ধ থাকায় কালিগঞ্জের সাংস্কৃতিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির ভবনটি দীর্ঘদিনের অবহেলায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে, দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। জানালা-দরজার অনেক অংশ নেই। ভেতরের পরিবেশ স্যাঁতস্যাঁতে, অন্ধকার ও দুর্গন্ধযুক্ত।

বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা জমে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি এখন মল-মূত্র ত্যাগের স্থানেও পরিণত হয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ আর অবশিষ্ট নেই।
উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভবনটি আরও ২০ বছর আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে পরিত্যক্ত ঘোষণার সুনির্দিষ্ট সময়, বর্তমান অবস্থা এবং সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় রবিউল ইসলাম বলেন, ‘জায়গাটা এখন ভুতুড়ে পরিত্যক্ত বাড়ির মতো দেখায়। প্রশাসন তৎপর হলে শিশুদের সাংস্কৃতিক চর্চা এভাবে বন্ধ থাকত না।’ কালিগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো এলাকার সাংস্কৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তাঁদের মতে, কালিগঞ্জে সংগীত, নাটক, আবৃত্তি ও নৃত্যের সঙ্গে যুক্ত অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তি রয়েছেন। কিন্তু নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মহড়া ও অনুষ্ঠানের সুযোগ না থাকায় নতুন শিল্পী তৈরি হচ্ছে না। পাশাপাশি যারা আগে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই চর্চা থেকে দূরে সরে গেছেন।
দেশবরেণ্য ব্যান্ডশিল্পী ও কালিগঞ্জের কৃতিসন্তান সোহাগ, যিনি ৬৪টি অ্যালবামে সংগীতশিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সচল না থাকলে স্থানীয় প্রতিভা বিকাশের সুযোগ কমে যায়। দ্রুত ভবন নির্মাণ বা সংস্কারের পাশাপাশি সংগীত ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ চালু করা জরুরি।
দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পাশাপাশি সরকারি বরাদ্দ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা। তাঁদের দাবি, জেলা শিল্পকলা একাডেমি থেকে উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সময় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেই অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে তাঁরা স্পষ্ট ধারণা পাননি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকা অবস্থায় কী ধরনের কর্মসূচির জন্য অর্থ ব্যয় হয়েছে, কোন খাতে বরাদ্দ এসেছে এবং কীভাবে তা ব্যবহার করা হয়েছে, এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সংগীতশিল্পী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘যা বরাদ্দ আছে, তা আমরা চোখে দেখি না। সব পকেট কমিটির পকেটে।’ স্থানীয় শিল্পীদের অভিযোগ, প্রকৃত সংস্কৃতিকর্মীদের সম্পৃক্ত না করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ না থাকলেও বিল-ভাউচার তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সময়ের বরাদ্দপত্র, অনুমোদিত কর্মসূচি, বিল-ভাউচার, ব্যাংক হিসাব ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
একাডেমির নামে পাঁচটি হারমোনিয়ামসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র থাকার কথা উল্লেখ করে সংস্কৃতিকর্মীরা সেগুলোর বর্তমান অবস্থান জানতে চেয়েছেন। তাঁদের প্রশ্ন, হারমোনিয়াম, তবলা, খঞ্জনি ও অন্যান্য সরঞ্জাম কোথায় রয়েছে, কার কাছে আছে এবং সেগুলো বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য কি না? এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বাদ্যযন্ত্রগুলোর অস্তিত্ব, ক্রয়, সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের তথ্য যাচাই করা হলে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের অভিযোগ, ২০১০ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক আহম্মেদের সময় থেকে শিল্পকলা একাডেমির পরিচালনা ও কমিটি গঠন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় থেকে প্রকৃত সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে এবং পরিচালনায় একটি গোষ্ঠীর প্রভাব তৈরি হয়।
কেউ কেউ এই ব্যবস্থাকে ‘পকেট কমিটি’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের নামে কার্যক্রম ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা চললেও প্রকৃত শিল্পীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ কিংবা অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান সভাপতি তানিয়া আক্তারের সময়ে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, সভা, আর্থিক হিসাব ও পরিচালনা কমিটির অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস দেন।

ইউএনও বলেন, ‘কি হয়েছে? কি আছে? কি করা যায়? আমি ফাইল দেখবো, এর পরে জানাবো।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান অবস্থা ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে ভবন সংস্কার, নতুন কমিটি গঠন, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালু কিংবা আর্থিক হিসাব প্রকাশের বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি।
জেলা কালচারাল অফিসার ফাইজা হোসেন অন্বেষা জানান, উপজেলা পর্যায়ের শিল্পকলা একাডেমিগুলোর কমিটি বর্তমানে বাতিল রয়েছে। নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, নতুন নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে কোনো কমিটি গঠন করা হবে না।
এ কারণে কালিগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমির পরিচালনা কমিটি পুনর্গঠন এবং কার্যক্রম চালুর বিষয়টি আপাতত নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে। অচলাবস্থা নিরসনে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন নাগরিকরা উপজেলা প্রশাসন এবং সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
তাঁদের দাবিগুলো হলো- ১. জরাজীর্ণ ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত সংস্কার অথবা নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। ২. কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর পরিচালনা কমিটি গঠন করতে হবে। ৩. প্রতিষ্ঠানের নামে আসা সরকারি বরাদ্দ, বিল-ভাউচার, সম্পদ ও আর্থিক হিসাব যাচাই করে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করতে হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। ৪. গান, নাটক, আবৃত্তি, নৃত্য ও সংগীত প্রশিক্ষণসহ নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মসূচি চালু করতে হবে এবং প্রকৃত শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের সম্পৃক্ত করতে হবে।
কালিগঞ্জ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি শুধু একটি ভবন নয়, এটি স্থানীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নতুন প্রজন্মের প্রতিভা বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অবকাঠামো, সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও পরিচালন ব্যবস্থায় যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিনিধির নাম 















