মোঃ ইশারাত আলী :
দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে তৃণমূলের অর্থনীতি ও গ্রামীণ জনপদেও। এর একটি বড় উদাহরণ দেখা যাচ্ছে স্থানীয় পর্যায়ে সার ডিলারশিপ বন্টন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে। সম্প্রতি সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার সার বিতরণ ও ডিলারশিপের নতুন চিত্রকে কেন্দ্র করে যে সমীকরণ সামনে এসেছে, তা আমাদের জাতীয় রাজনীতির একটি পুরোনো ও পরিচিত রূপকেই মনে করিয়ে দেয়। ‘একতরফা বিএনপি ডিলারশিপ নিয়েছে, পুরানো সার ডিলার আওয়ামী লীগ আঙুল চোষা শুরু করেছে, আর জামায়াত একটিও ডিলারশিপ পায়নি’-এই জনৈক বর্ণনা বা চিত্রটি কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের নয়, বরং ক্ষমতার পালাবদলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে আধিপত্য হস্তান্তরের এক নির্মম বাস্তবতাই তুলে ধরে।
দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সার ডিলারশিপ ও কৃষি উপকরণের বাজার মূলত আওয়ামীলীগের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে ছিল। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সময়ে দলীয় আনুগত্য ও স্বজনপ্রীতির ভিত্তিতে লাইসেন্স দেওয়ায় প্রকৃত ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছেন। এর ফলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, সিন্ডিকেট আর কালোবাজারি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। কৃষকদের জিম্মি করে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির মাধ্যমে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ফুলেফেঁপে উঠেছে।কেউ কেউ ইন্ডিয়াতে বাড়ী করেছেন। গাড়ী কিনেছেন।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কালিগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে ডিলারশিপের হাতবদল ঘটছে। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা রাজনৈতিক দল বা তাদের সমর্থকরা এখন ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা পুরনো ডিলাররা আজ কোণঠাসা। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই পরিবর্তন কি আদৌ কোনো ইতিবাচক সংস্কার আনছে, নাকি কেবল পুরোনো চাল ভাতে বাড়ার মতো নতুন ব্যানার আর নতুন মুখের সিন্ডিকেট তৈরি হচ্ছে? সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক সমীকরণের এই মারপ্যাচে জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোর ডিলারশিপের বাইরে ছিটকে পড়া বা কোনো অংশীদারিত্ব না পাওয়া মাঠের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।
তবে এসবের বাইরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ কৃষক সমাজ। কৃষকের কাছে সার কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দলীয় পরিচয়ের বিষয় নয়; তাদের কাছে সার হলো ফসল উৎপাদনের জীবনরেখা। অতীতে দেখা গেছে, যখনই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়, ডিলারশিপের হাতবদল নিয়ে দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতায় শেষ পর্যন্ত প্রান্তিক কৃষকদেরই চড়া মূল্য দিতে হয়। নতুন ডিলাররা লাইসেন্স পাওয়ার পর পুরোনো সিন্ডিকেটের পথ ধরেই হাঁটবে কি না, তা নিয়ে কৃষকদের মনে গভীর সংশয় রয়ে গেছে।
আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, কৃষি অর্থনীতির মতো একটি সংবেদনশীল খাতকে কোনো দলের বা মহলের দলীয় পুনর্বাসনের হাতিয়ার বানানো উচিত নয়। সারের মতো অতিপ্রয়োজনীয় উপাদানটির বিতরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং স্বচ্ছ হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রকৃত ও সৎ ব্যবসায়ীদের মেধার ভিত্তিতে ডিলারশিপ প্রদান এবং নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে সার কেলেঙ্কারির দুষ্টচক্র থেকে কখনোই বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না।
প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব হবে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা, যাতে সার নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি বা দলীয়করণ না হয়। কৃষকের ঘামে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ডিলারশিপের এই দলীয় দৌরাত্ম্য বন্ধ করতেই হবে। বদল শুধু রাজনৈতিক ব্যানার বা মুখের না হয়ে, সেবার মানসিকতা ও শৃঙ্খলার পরিবর্তন ঘটুক-এটাই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
প্রতিনিধির নাম 













