1. satkhiranews24@yahoo.com : নিজস্ব প্রতিবেদক :
সাতক্ষীরা ০১:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
শিক্ষক দিবসে প্রশ্ন—শিক্ষককে কতটা শিক্ষক থাকতে দিচ্ছি? খতিয়ানের মারপ্যাঁচ ও গ্রামীণ রাজনীতির শিকার: কালিগঞ্জের ভূমি বিরোধ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নেপথ্য চিত্র কালিগঞ্জে প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে ছাত্রীর বাল্যবিয়েতে ৩২ সহপাঠী! প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পণ্ড, শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে বিষ্ণুপুর ইউনিয়নে জনসেবায় এক অতন্দ্র প্রহরীর নাম: মোঃ মারুফ বিল্লাহ সাধারণ পুলে বৃত্তি পেল গুনজা দত্ত, আরিজপুরে বইছে আনন্দের হাওয়া কালিগঞ্জে মন্দিরের দেয়ালে বাঁশ লাগাকে কেন্দ্র করে বাদানুবাদ ও থানায় অভিযোগ উদ্বোধকের অপেক্ষার অবসান, চাঁচাইয়ে শুরু হলো বৃক্ষমেলা ধলবাড়িয়ায় চেয়ারম্যান প্রচারণায় জিএম ফজলুল হক: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতি – উন্নয়নের নানা পরিকল্পনা মানবতার টানে ২৪ বছর ধরে নিবেদিতপ্রাণ: মৌতলা ইউনিয়নের মানুষের সুখ-দুঃখের কাণ্ডারি শেখ জাহাঙ্গীর আলম তবুও আশার আলোয় ভাসছে চাঁচাই বৃক্ষমেলা! নার্শারী মালিকরা ক্ষতির মুখে! ঝুলে আছে ফিতা কাটা উদ্বোধন

শিক্ষক দিবসে প্রশ্ন—শিক্ষককে কতটা শিক্ষক থাকতে দিচ্ছি?

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৩৬:৫২ অপরাহ্ণ, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫১ বার পড়া হয়েছে

মোঃ আফজাল হোসেন:


একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না, তিনি একটি প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। অথচ সেই শিক্ষকের কাঁধেই এখন জমছে নানা ধরনের চাপ—শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত কর্মভার, প্রশাসনিক দায়িত্ব, প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও পেশাগত মর্যাদার প্রশ্ন।
আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৯৪ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছর শিক্ষকতার মর্যাদা ও পেশাগত অবস্থান নিয়ে ১৯৬৬ সালে গৃহীত আন্তর্জাতিক সুপারিশের ৬০ বছর পূর্তি হচ্ছে। এবারের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্যের মূল বক্তব্য হলো—শিক্ষকতার পেশাগত মর্যাদা রক্ষা, উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকদের ভূমিকা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশেও শিক্ষক দিবস জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে। ২০২৩ সালে সরকার ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৫ সালে জাতীয়ভাবে ১২ জন শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এক দিনের সম্মাননা কি শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের সংকটের সমাধান করতে পারে?

শিক্ষাব্যবস্থার বড় দুর্বলতা শিক্ষক সংকট। চলতি বছর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। সহকারী শিক্ষকেরও রয়েছে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি।
মাধ্যমিক পর্যায়েও চিত্র খুব একটা ভিন্ন নয়। শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের অনেক পদ খালি থাকায় কর্মরতদের ওপর বাড়ছে চাপ।
একজন শিক্ষককে যখন একাধিক বিষয়ের ক্লাস নিতে হয়, অতিরিক্ত ক্লাস সামলাতে হয় এবং একই সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়, তখন পাঠদানের প্রস্তুতির সময় কমে যায়। শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সমস্যা বোঝা বা দুর্বল শিক্ষার্থীর প্রতি বাড়তি নজর দেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়।
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের মাহবুব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু ক্লাস নেওয়া নয়। পাঠদানের পাশাপাশি নানা প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে হয়। এতে শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও ব্যক্তিগত সময় কমে যাচ্ছে।
কক্সবাজারের একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিক্ষক সংকটের কারণে একজন শিক্ষককে সপ্তাহে ২৮ থেকে ৩০টি পর্যন্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে। এ ধরনের চাপ শুধু শিক্ষকের কর্মজীবনকে কঠিন করে না, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মানেও প্রভাব ফেলে।

বাস্তবে শিক্ষকের কাজ এখন আর শুধু ক্লাস নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ফলাফল তৈরি, তথ্য সংরক্ষণ, বিভিন্ন প্রতিবেদন তৈরি, সভা, পরীক্ষা, সহশিক্ষা কার্যক্রম—নানা দায়িত্ব সামলাতে হয় তাঁকে।
প্রযুক্তির বিস্তারে নতুন দায়িত্বও যুক্ত হয়েছে। ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ তৈরি, অনলাইন ব্যবস্থা ব্যবহার, তথ্য যাচাই—এসব এখন শিক্ষকের দক্ষতার অংশ। পরিবর্তনটি প্রয়োজনীয়, কিন্তু এর সঙ্গে প্রয়োজন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সহায়ক অবকাঠামো।
প্রশিক্ষণ ছাড়া প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক সময় শিক্ষকের ওপর নতুন চাপ তৈরি করে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা চালুর পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সময়, প্রশিক্ষণ ও উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে।
বেতন-মর্যাদার প্রশ্ন
শিক্ষকের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নও পুরোনো। চলতি বছর সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেতন ধীরে ধীরে বাড়ানো এবং পেশাগত মর্যাদা উন্নয়নের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত আয় না থাকায় অনেক শিক্ষককে বাড়তি কাজ বা কৃষিকাজের মতো বিকল্প আয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়।
শিক্ষকের বেতন তাই শুধু চাকরির পারিশ্রমিক নয়, এটি শিক্ষার মানের সঙ্গেও সম্পর্কিত। একজন শিক্ষক যদি জীবিকার চাপ সামলাতে পাঠদানের বাইরের কাজে সময় দিতে বাধ্য হন, তাহলে তার প্রভাব পড়বে শ্রেণিকক্ষেও।
শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ানিনী ফরেস্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, শিক্ষকের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত না করে শুধু শিক্ষার মান বাড়ানোর প্রত্যাশা করা কঠিন। একজন শিক্ষককে স্বস্তিতে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে।

আজকের শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বেড়ে উঠছে। তাদের শেখার ধরনও বদলেছে। ফলে শিক্ষককেও নিয়মিত নতুন জ্ঞান ও পদ্ধতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হচ্ছে।
এ কারণে প্রশিক্ষণকে শুধু সনদ পাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু হতে হবে শ্রেণিকক্ষের বাস্তব প্রয়োজনভিত্তিক। প্রশিক্ষণের পর শিক্ষক কী শিখলেন এবং তার প্রয়োগে শিক্ষার্থীরা কতটা উপকৃত হলো—সেটিও মূল্যায়নের আওতায় আসা দরকার।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থাও শিক্ষকের ঘাটতির পাশাপাশি প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতিকে বড় বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে দেখছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক অপরিহার্য।

সব সংকটের পরও বাংলাদেশের শিক্ষকরা অসংখ্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করছেন। প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষক থেকে শহরের বিদ্যালয়ের শিক্ষক—অনেকে সীমিত সুযোগের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে কাজ করছেন।
কেউ নিজের উদ্যোগে ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ তৈরি করছেন, কেউ দরিদ্র শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়াচ্ছেন, কেউ ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনছেন। বিজ্ঞান, বিতর্ক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও শিক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও শিক্ষক-নেতৃত্বাধীন উদ্ভাবনী উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় ভাষায় পাঠদান, খেলাভিত্তিক শিক্ষা, সহকর্মীদের পারস্পরিক শেখা এবং গ্রামীণ শিক্ষায় নতুন পদ্ধতির মতো উদ্যোগ এখন গুরুত্ব পাচ্ছে।

অর্থাৎ শিক্ষককে শুধু নির্দেশ বাস্তবায়নকারী হিসেবে দেখার সময় শেষ। শিক্ষার পরিবর্তনে তাঁকে অংশীদার করতে হবে।
শিক্ষানীতি তৈরি হয়, পাঠ্যক্রম বদলায়, মূল্যায়ন পদ্ধতি পাল্টায়। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের বাস্তব পরীক্ষা হয় শ্রেণিকক্ষে। আর শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা সবচেয়ে ভালো জানেন শিক্ষক।

বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি, সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক গাজী মিজানুর রহমান বলেন, শিক্ষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। কারণ শিক্ষানীতির বাস্তব প্রয়োগ কোথায় কীভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, সেটি সবচেয়ে ভালো বোঝেন শ্রেণিকক্ষে থাকা শিক্ষকরা।
শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কারে শিক্ষকদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া তাই জরুরি। তাঁদের অভিজ্ঞতা ছাড়া ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার অনেক সময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না।

শিক্ষক দিবসে ফুল, ক্রেস্ট, শুভেচ্ছা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট—এসব অবশ্যই ভালো লাগার। কিন্তু একজন শিক্ষকের প্রকৃত মর্যাদা নিশ্চিত হয় তাঁর কর্মপরিবেশ, ন্যায্য বেতন, পেশাগত স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের সুযোগে।
তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করা। কমাতে হবে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ। নিশ্চিত করতে হবে সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি প্রয়োজন পেশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন ও সামাজিক মর্যাদা।
সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষককে কেবল একজন কর্মচারী হিসেবে নয়, একজন পেশাজীবী ও পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
কারণ বিদ্যালয়ের ভবন আধুনিক হতে পারে, প্রযুক্তি উন্নত হতে পারে, পাঠ্যবই বদলাতে পারে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের সামনে একজন দক্ষ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানসিকভাবে স্বস্তিতে থাকা শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস তাই শুধু অভিনন্দন জানানোর দিন নয়। এটি আত্মজিজ্ঞাসারও দিন—আমরা যে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চাই, তাদের গড়ে তোলার দায়িত্ব যাঁদের হাতে দিচ্ছি, তাঁদের জন্য আমরা কেমন পরিবেশ তৈরি করেছি?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের শিক্ষার মান।
লেখক: শিক্ষক ও গনমাধ্যমকর্মী।

ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষক দিবসে প্রশ্ন—শিক্ষককে কতটা শিক্ষক থাকতে দিচ্ছি?

শিক্ষক দিবসে প্রশ্ন—শিক্ষককে কতটা শিক্ষক থাকতে দিচ্ছি?

আপডেট সময় : ১১:৩৬:৫২ অপরাহ্ণ, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

মোঃ আফজাল হোসেন:


একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না, তিনি একটি প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। অথচ সেই শিক্ষকের কাঁধেই এখন জমছে নানা ধরনের চাপ—শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত কর্মভার, প্রশাসনিক দায়িত্ব, প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও পেশাগত মর্যাদার প্রশ্ন।
আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৯৪ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছর শিক্ষকতার মর্যাদা ও পেশাগত অবস্থান নিয়ে ১৯৬৬ সালে গৃহীত আন্তর্জাতিক সুপারিশের ৬০ বছর পূর্তি হচ্ছে। এবারের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্যের মূল বক্তব্য হলো—শিক্ষকতার পেশাগত মর্যাদা রক্ষা, উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকদের ভূমিকা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশেও শিক্ষক দিবস জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে। ২০২৩ সালে সরকার ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৫ সালে জাতীয়ভাবে ১২ জন শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এক দিনের সম্মাননা কি শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের সংকটের সমাধান করতে পারে?

শিক্ষাব্যবস্থার বড় দুর্বলতা শিক্ষক সংকট। চলতি বছর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। সহকারী শিক্ষকেরও রয়েছে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি।
মাধ্যমিক পর্যায়েও চিত্র খুব একটা ভিন্ন নয়। শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের অনেক পদ খালি থাকায় কর্মরতদের ওপর বাড়ছে চাপ।
একজন শিক্ষককে যখন একাধিক বিষয়ের ক্লাস নিতে হয়, অতিরিক্ত ক্লাস সামলাতে হয় এবং একই সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়, তখন পাঠদানের প্রস্তুতির সময় কমে যায়। শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সমস্যা বোঝা বা দুর্বল শিক্ষার্থীর প্রতি বাড়তি নজর দেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়।
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের মাহবুব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু ক্লাস নেওয়া নয়। পাঠদানের পাশাপাশি নানা প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে হয়। এতে শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও ব্যক্তিগত সময় কমে যাচ্ছে।
কক্সবাজারের একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিক্ষক সংকটের কারণে একজন শিক্ষককে সপ্তাহে ২৮ থেকে ৩০টি পর্যন্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে। এ ধরনের চাপ শুধু শিক্ষকের কর্মজীবনকে কঠিন করে না, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মানেও প্রভাব ফেলে।

বাস্তবে শিক্ষকের কাজ এখন আর শুধু ক্লাস নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ফলাফল তৈরি, তথ্য সংরক্ষণ, বিভিন্ন প্রতিবেদন তৈরি, সভা, পরীক্ষা, সহশিক্ষা কার্যক্রম—নানা দায়িত্ব সামলাতে হয় তাঁকে।
প্রযুক্তির বিস্তারে নতুন দায়িত্বও যুক্ত হয়েছে। ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ তৈরি, অনলাইন ব্যবস্থা ব্যবহার, তথ্য যাচাই—এসব এখন শিক্ষকের দক্ষতার অংশ। পরিবর্তনটি প্রয়োজনীয়, কিন্তু এর সঙ্গে প্রয়োজন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সহায়ক অবকাঠামো।
প্রশিক্ষণ ছাড়া প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক সময় শিক্ষকের ওপর নতুন চাপ তৈরি করে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা চালুর পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সময়, প্রশিক্ষণ ও উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে।
বেতন-মর্যাদার প্রশ্ন
শিক্ষকের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নও পুরোনো। চলতি বছর সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেতন ধীরে ধীরে বাড়ানো এবং পেশাগত মর্যাদা উন্নয়নের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত আয় না থাকায় অনেক শিক্ষককে বাড়তি কাজ বা কৃষিকাজের মতো বিকল্প আয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়।
শিক্ষকের বেতন তাই শুধু চাকরির পারিশ্রমিক নয়, এটি শিক্ষার মানের সঙ্গেও সম্পর্কিত। একজন শিক্ষক যদি জীবিকার চাপ সামলাতে পাঠদানের বাইরের কাজে সময় দিতে বাধ্য হন, তাহলে তার প্রভাব পড়বে শ্রেণিকক্ষেও।
শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ানিনী ফরেস্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, শিক্ষকের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত না করে শুধু শিক্ষার মান বাড়ানোর প্রত্যাশা করা কঠিন। একজন শিক্ষককে স্বস্তিতে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে।

আজকের শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বেড়ে উঠছে। তাদের শেখার ধরনও বদলেছে। ফলে শিক্ষককেও নিয়মিত নতুন জ্ঞান ও পদ্ধতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হচ্ছে।
এ কারণে প্রশিক্ষণকে শুধু সনদ পাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু হতে হবে শ্রেণিকক্ষের বাস্তব প্রয়োজনভিত্তিক। প্রশিক্ষণের পর শিক্ষক কী শিখলেন এবং তার প্রয়োগে শিক্ষার্থীরা কতটা উপকৃত হলো—সেটিও মূল্যায়নের আওতায় আসা দরকার।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থাও শিক্ষকের ঘাটতির পাশাপাশি প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতিকে বড় বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে দেখছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক অপরিহার্য।

সব সংকটের পরও বাংলাদেশের শিক্ষকরা অসংখ্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করছেন। প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষক থেকে শহরের বিদ্যালয়ের শিক্ষক—অনেকে সীমিত সুযোগের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে কাজ করছেন।
কেউ নিজের উদ্যোগে ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ তৈরি করছেন, কেউ দরিদ্র শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়াচ্ছেন, কেউ ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনছেন। বিজ্ঞান, বিতর্ক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও শিক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও শিক্ষক-নেতৃত্বাধীন উদ্ভাবনী উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় ভাষায় পাঠদান, খেলাভিত্তিক শিক্ষা, সহকর্মীদের পারস্পরিক শেখা এবং গ্রামীণ শিক্ষায় নতুন পদ্ধতির মতো উদ্যোগ এখন গুরুত্ব পাচ্ছে।

অর্থাৎ শিক্ষককে শুধু নির্দেশ বাস্তবায়নকারী হিসেবে দেখার সময় শেষ। শিক্ষার পরিবর্তনে তাঁকে অংশীদার করতে হবে।
শিক্ষানীতি তৈরি হয়, পাঠ্যক্রম বদলায়, মূল্যায়ন পদ্ধতি পাল্টায়। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের বাস্তব পরীক্ষা হয় শ্রেণিকক্ষে। আর শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা সবচেয়ে ভালো জানেন শিক্ষক।

বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি, সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক গাজী মিজানুর রহমান বলেন, শিক্ষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। কারণ শিক্ষানীতির বাস্তব প্রয়োগ কোথায় কীভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, সেটি সবচেয়ে ভালো বোঝেন শ্রেণিকক্ষে থাকা শিক্ষকরা।
শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কারে শিক্ষকদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া তাই জরুরি। তাঁদের অভিজ্ঞতা ছাড়া ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার অনেক সময় প্রত্যাশিত ফল দেয় না।

শিক্ষক দিবসে ফুল, ক্রেস্ট, শুভেচ্ছা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট—এসব অবশ্যই ভালো লাগার। কিন্তু একজন শিক্ষকের প্রকৃত মর্যাদা নিশ্চিত হয় তাঁর কর্মপরিবেশ, ন্যায্য বেতন, পেশাগত স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের সুযোগে।
তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করা। কমাতে হবে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ। নিশ্চিত করতে হবে সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি প্রয়োজন পেশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন ও সামাজিক মর্যাদা।
সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষককে কেবল একজন কর্মচারী হিসেবে নয়, একজন পেশাজীবী ও পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
কারণ বিদ্যালয়ের ভবন আধুনিক হতে পারে, প্রযুক্তি উন্নত হতে পারে, পাঠ্যবই বদলাতে পারে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের সামনে একজন দক্ষ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানসিকভাবে স্বস্তিতে থাকা শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস তাই শুধু অভিনন্দন জানানোর দিন নয়। এটি আত্মজিজ্ঞাসারও দিন—আমরা যে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চাই, তাদের গড়ে তোলার দায়িত্ব যাঁদের হাতে দিচ্ছি, তাঁদের জন্য আমরা কেমন পরিবেশ তৈরি করেছি?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের শিক্ষার মান।
লেখক: শিক্ষক ও গনমাধ্যমকর্মী।