1. tusu0x1@gmail.com : :
  2. satnews24@satkhiranews24.com : নিজস্ব প্রতিবেদক :
সাতক্ষীরা ০৬:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
কালিগঞ্জে ঠেকরায় চলাচলের পথ কেটে মাটি পুকু‌রে ফেলার অভিযোগ। কালিগঞ্জ রোকেয়া মনসুর মহিলা কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শ.ম মমতাজুর রহমানের ইন্তেকাল কালিগঞ্জে নবাগত ওসির সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময় : মাদক-সন্ত্রাস ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা কালিগঞ্জের রেবতী সরকারের তাজা প্রাণ ঝরে গেল কোলকাতার অগ্নিকাণ্ডে কালিগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৎস্য ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম রফুর মৃত্যু কলকাতায় হোটেলে আগুনে দগ্ধ হয়ে কালিগঞ্জের সাবেক আওয়ামী নেতা আলিমুজ্জামানের মৃত্যু- রেবতী সরকারের ঠিকানা পাওয়া যায়নি জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে সাতক্ষীরা পৌরসভাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে কালিগঞ্জ ‘খরচ বাড়ে, ভাড়া কমে’-কালিগঞ্জে ডেকোরেটর ব্যবসায় টিকে থাকার লড়াই, ‘ঐক্যবদ্ধ না হলে ডেকোরেটর ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন’-হেদায়েতুল ইসলাম কালিগঞ্জে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেহের আলীর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন কালিগঞ্জে বিএনপি কার্যালয়ে ককটেল নিক্ষেপ: আহত ১, অবিস্ফোরিত দুটি বোমা উদ্ধার

গাবুরার মাটির বাঁধ: আমার ১০০ বার বেঁচে ওঠার গল্প -০১ ঘুরে দেখো বাংলাদেশ

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:১৩:৩৩ অপরাহ্ণ, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
  • ১৫২ বার পড়া হয়েছে

মোঃ ইশারাত আলী :

“গাবুরা”-নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুন্দরবনের কোলঘেঁষা, দুরন্ত নদীর ঢেউ আর জোয়ার-ভাটার সাথে অবিরাম লড়াই করে বেঁচে থাকা এক জনপদের প্রতিচ্ছবি। গত ১২ বছরে IOM Bangladesh-এর বিভিন্ন প্রজেক্টে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্তত ৬০ বার গাবুরায় গিয়েছি, ব্যক্তিগত বা অন্যান্য কাজে গিয়েছি আরও অন্তত ৪০ বার। সব মিলিয়ে ১০০ বারের এই আসা-যাওয়া-গাবুরার প্রতিটি মাটির বাঁধ, ভাঙা রাস্তা, আর লবণাক্ত পানির গন্ধ এখন আমার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। আমি বিশ্বাস করি, গাবুরা আমার সত্তার এক গভীর জায়গা দখল করে আছে।

প্রথম যখন এই জনপদে পা রেখেছিলাম, মনে হয়েছিল অন্য কোনো গ্রহে এসেছি-যেখানে প্রকৃতি কখনো অকৃপণ দাতা, আবার কখনো বড্ড নিষ্ঠুর। ঘূর্ণিঝড় আইলা হোক কিংবা আম্পান, এই জনপদের মানুষগুলো যেন মাটি ফুঁড়ে অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে বারবার জেগে ওঠে। এই বাঁধগুলো তাদের কাছে কেবল মাটির স্তূপ নয়, বরং হাজার হাজার মানুষের বেঁচে থাকার শেষ ভরসা, তাদের আশা আর সংগ্রামের দুর্গ। আজ তাই ঠিক করেছি, তাদের সেই অবর্ণনীয় কষ্ট আর স্বপ্নের গল্পগুলো আপনাদের সাথে ভাগ করে নেব।

আমার গাবুরা সফরের অসংখ্য স্মৃতির মাঝে একটি ভোর আজও আমায় আচ্ছন্ন করে রাখে। প্রকল্পের কাজ শেষে খুব ভোরে এই মাটির বাঁধের ওপর দিয়ে হাঁটছিলাম। দিগন্তে তখন সূর্য উঠছে। দেখলাম, নারীরা কাঁখে কলসি নিয়ে পানির কুয়ার দিকে যাচ্ছে, পুরুষরা জাল কাঁধে নৌকা ভাসিয়ে নদীতে নামছে। তাদের মুখে কোনো অভিযোগের ছাপ নেই, আছে কেবল নতুন দিনের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। সেই মুহূর্তে মনে হলো, এই বৈরী পরিবেশেও জীবন কীভাবে তার নিজস্ব স্রোত খুঁজে নেয়! মাথার ওপরে সংগ্রামী মানুষ, নিচে নদীর বুকে জালের ছন্দ, আর ওপারে রহস্যময় সুন্দরবন-কী অপরূপ দৃশ্য! সেই মুহূর্তে মনের ভেতর যে উত্তেজনা ও শ্রদ্ধা অনুভব করেছিলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

IOM-এর ব্যানারে কাজ করার সময় আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোকে খুঁজে বের করা। নিজের চোখে দেখেছি, লবণাক্ত পানি কীভাবে ফসলি জমিগুলোকে গ্রাস করে তাদের জীবিকার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। বাঁধের ভাঙা অংশ মেরামত করার পাশাপাশি তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনা ছিল আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। আমি মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়েছি, প্রশ্ন করেছি, নিজের খাতায় নোট নিয়েছি। ছবি তুলেছি, ভিডিও করেছি-সবকিছুর আড়ালে ছিল তাদের বেঁচে থাকার আকুতি। তাদের ক্লান্ত চোখেও আমি কখনো পরাজয় দেখিনি। দীর্ঘশ্বাসের সাথে মিশে থাকা তাদের বেঁচে থাকার অদম্য সংগ্রাম আমাকে প্রতিনিয়ত নতুন করে শিখিয়েছে।

গাবুরার এই ১০০ বারের যাত্রা আমাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। আমি দেখেছি, মানুষ কীভাবে সামান্য কিছু নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারে, কীভাবে বিপদের দিনে একে অপরের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই মাটির বাঁধগুলো কেবল উপকূলকে রক্ষা করে না, বরং এটি মানুষের মধ্যে এক অদৃশ্য সংহতি তৈরি করে।

আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, মনে হয় এই অভিজ্ঞতাগুলো লিখে না রাখা হবে গাবুরার প্রতি চরম অকৃতজ্ঞতা। তাদের পানির সংকট, যাতায়াতের দুর্ভোগ, সঠিক সময়ে কাজের অভাব, চিকিৎসার দুষ্প্রাপ্যতা-প্রতি মুহূর্তে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর বাঁধ ভাঙার আশঙ্কায় যারা বেঁচে আছে, তাদের কথা বলা আমার দায়িত্ব। অনেকের সাথে কথা হয়েছে, অসংখ্য মানুষের জীবনকাহিনি আমার ডায়েরিতে বন্দী।

আজ শুধু শুরুটা করলাম। আগামীতে আপনাদের শোনাব সেইসব মানুষের জীবনের গল্প, যারা প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার সাথে যুদ্ধ করেও বাঁচার গান গায়। এই যাত্রায় আপনারা আমার পাশে থাকবেন, এই প্রত্যাশা রইল।

ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কালিগঞ্জে ঠেকরায় চলাচলের পথ কেটে মাটি পুকু‌রে ফেলার অভিযোগ।

গাবুরার মাটির বাঁধ: আমার ১০০ বার বেঁচে ওঠার গল্প -০১ ঘুরে দেখো বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ১১:১৩:৩৩ অপরাহ্ণ, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

মোঃ ইশারাত আলী :

“গাবুরা”-নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুন্দরবনের কোলঘেঁষা, দুরন্ত নদীর ঢেউ আর জোয়ার-ভাটার সাথে অবিরাম লড়াই করে বেঁচে থাকা এক জনপদের প্রতিচ্ছবি। গত ১২ বছরে IOM Bangladesh-এর বিভিন্ন প্রজেক্টে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্তত ৬০ বার গাবুরায় গিয়েছি, ব্যক্তিগত বা অন্যান্য কাজে গিয়েছি আরও অন্তত ৪০ বার। সব মিলিয়ে ১০০ বারের এই আসা-যাওয়া-গাবুরার প্রতিটি মাটির বাঁধ, ভাঙা রাস্তা, আর লবণাক্ত পানির গন্ধ এখন আমার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। আমি বিশ্বাস করি, গাবুরা আমার সত্তার এক গভীর জায়গা দখল করে আছে।

প্রথম যখন এই জনপদে পা রেখেছিলাম, মনে হয়েছিল অন্য কোনো গ্রহে এসেছি-যেখানে প্রকৃতি কখনো অকৃপণ দাতা, আবার কখনো বড্ড নিষ্ঠুর। ঘূর্ণিঝড় আইলা হোক কিংবা আম্পান, এই জনপদের মানুষগুলো যেন মাটি ফুঁড়ে অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে বারবার জেগে ওঠে। এই বাঁধগুলো তাদের কাছে কেবল মাটির স্তূপ নয়, বরং হাজার হাজার মানুষের বেঁচে থাকার শেষ ভরসা, তাদের আশা আর সংগ্রামের দুর্গ। আজ তাই ঠিক করেছি, তাদের সেই অবর্ণনীয় কষ্ট আর স্বপ্নের গল্পগুলো আপনাদের সাথে ভাগ করে নেব।

আমার গাবুরা সফরের অসংখ্য স্মৃতির মাঝে একটি ভোর আজও আমায় আচ্ছন্ন করে রাখে। প্রকল্পের কাজ শেষে খুব ভোরে এই মাটির বাঁধের ওপর দিয়ে হাঁটছিলাম। দিগন্তে তখন সূর্য উঠছে। দেখলাম, নারীরা কাঁখে কলসি নিয়ে পানির কুয়ার দিকে যাচ্ছে, পুরুষরা জাল কাঁধে নৌকা ভাসিয়ে নদীতে নামছে। তাদের মুখে কোনো অভিযোগের ছাপ নেই, আছে কেবল নতুন দিনের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। সেই মুহূর্তে মনে হলো, এই বৈরী পরিবেশেও জীবন কীভাবে তার নিজস্ব স্রোত খুঁজে নেয়! মাথার ওপরে সংগ্রামী মানুষ, নিচে নদীর বুকে জালের ছন্দ, আর ওপারে রহস্যময় সুন্দরবন-কী অপরূপ দৃশ্য! সেই মুহূর্তে মনের ভেতর যে উত্তেজনা ও শ্রদ্ধা অনুভব করেছিলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

IOM-এর ব্যানারে কাজ করার সময় আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোকে খুঁজে বের করা। নিজের চোখে দেখেছি, লবণাক্ত পানি কীভাবে ফসলি জমিগুলোকে গ্রাস করে তাদের জীবিকার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। বাঁধের ভাঙা অংশ মেরামত করার পাশাপাশি তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনা ছিল আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। আমি মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়েছি, প্রশ্ন করেছি, নিজের খাতায় নোট নিয়েছি। ছবি তুলেছি, ভিডিও করেছি-সবকিছুর আড়ালে ছিল তাদের বেঁচে থাকার আকুতি। তাদের ক্লান্ত চোখেও আমি কখনো পরাজয় দেখিনি। দীর্ঘশ্বাসের সাথে মিশে থাকা তাদের বেঁচে থাকার অদম্য সংগ্রাম আমাকে প্রতিনিয়ত নতুন করে শিখিয়েছে।

গাবুরার এই ১০০ বারের যাত্রা আমাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। আমি দেখেছি, মানুষ কীভাবে সামান্য কিছু নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারে, কীভাবে বিপদের দিনে একে অপরের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই মাটির বাঁধগুলো কেবল উপকূলকে রক্ষা করে না, বরং এটি মানুষের মধ্যে এক অদৃশ্য সংহতি তৈরি করে।

আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, মনে হয় এই অভিজ্ঞতাগুলো লিখে না রাখা হবে গাবুরার প্রতি চরম অকৃতজ্ঞতা। তাদের পানির সংকট, যাতায়াতের দুর্ভোগ, সঠিক সময়ে কাজের অভাব, চিকিৎসার দুষ্প্রাপ্যতা-প্রতি মুহূর্তে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর বাঁধ ভাঙার আশঙ্কায় যারা বেঁচে আছে, তাদের কথা বলা আমার দায়িত্ব। অনেকের সাথে কথা হয়েছে, অসংখ্য মানুষের জীবনকাহিনি আমার ডায়েরিতে বন্দী।

আজ শুধু শুরুটা করলাম। আগামীতে আপনাদের শোনাব সেইসব মানুষের জীবনের গল্প, যারা প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার সাথে যুদ্ধ করেও বাঁচার গান গায়। এই যাত্রায় আপনারা আমার পাশে থাকবেন, এই প্রত্যাশা রইল।