নিজস্ব প্রতিবেদক, কালিগঞ্জ :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার বারদহা বাজার এলাকার কিশোর রাফাত হোসেন (১৭) মৃত্যুর প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও রহস্যের জট কাটেনি। গত ১৩ জুন একটি মুরগির ফার্মে রাফাতের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর থেকেই পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তবে এখন পর্যন্ত তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ, উদ্বেগ ও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
শনিবার সকালে বারদহা বাজারে বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে শত শত নারী-পুরুষ মানববন্ধনে অংশ নেন। বক্তারা অভিযোগ করেন, একাধিকবার প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও তদন্তে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে নিহতের পরিবারে হতাশা বাড়ছে এবং জনমনে তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নিহতের বাবা শফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ঘটনার দিন ফার্মে কর্মরত অবস্থায় রাফাতকে হত্যা করে পরে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়। তিনি বলেন, ঘটনার বিভিন্ন অসঙ্গতির বিষয়ে পুলিশকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
মানববন্ধনে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা মাছুম বিল্লাহসহ অন্য বক্তারা অভিযোগ করেন, ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করেও তারা কার্যকর বিচারিক অগ্রগতির কোনো প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছেন না। তাদের ভাষ্য, তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
নিহতের মা শাহানারা খাতুন অভিযোগ করেন, ফার্ম মালিকের ছেলে অলিদ হোসেনের বিরুদ্ধে অতীতেও নির্যাতন ও হয়রানির অভিযোগ ছিল। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে রুহুল কুদ্দুস গাজী বলেন, একটি সন্দেহজনক মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
ঘটনার পর থেকে স্থানীয়দের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ঘটনার দিন মুরগির ফার্মে ঠিক কী ঘটেছিল? যদি শরীরে আঘাতের চিহ্ন বা অন্য কোনো সন্দেহজনক আলামত থেকে থাকে, তবে সেগুলোর ফরেনসিক মূল্যায়নের ফলাফল কী? ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদনে কী উল্লেখ রয়েছে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত কতদূর এগিয়েছে? ঘটনাস্থলের আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মোবাইল ফোনের তথ্য বা সিসিটিভি ফুটেজ (যদি থাকে) সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে কি? তদন্তে বিলম্বের কারণ কী এবং এ বিষয়ে তদন্তকারী সংস্থার ব্যাখ্যা কী? এসব প্রশ্নের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ঘটনার রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
ফৌজদারি তদন্তে শরীরে আঘাতের চিহ্ন, মৃত্যুর ধরন, ফাঁসের প্রকৃতি, ঘটনাস্থলের আলামত, ডিএনএ, আঙুলের ছাপ এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি ময়নাতদন্ত বা অন্যান্য আলামতে হত্যার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাহলে তা গভীরভাবে তদন্ত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। একইভাবে, যদি আত্মহত্যার প্রমাণ পাওয়া যায়, সেটিও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। কারণ প্রমাণভিত্তিক তদন্তই সত্য উদঘাটনের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।
রাফাতের পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে কোনো পরিবার যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়। তারা দাবি করেন, আইনের চোখে সব নাগরিক সমান এবং হত্যার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
স্থানীয়দের দাবি, তদন্ত যেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত সম্পন্ন হয়। প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে, আর যদি অভিযোগের সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা না থাকে, তবে তাকেও তদন্তের মাধ্যমে দায়মুক্ত করতে হবে। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত অপরাধী বিচারের মুখোমুখি হবে, অন্যদিকে নির্দোষ ব্যক্তিও অযথা হয়রানির শিকার হবে না।
রাফাতের পরিবারের চোখে এখনও ন্যায়বিচারের অপেক্ষা। আর এলাকাবাসীর প্রশ্ন একটাই, তদন্তের অগ্রগতি কবে দৃশ্যমান হবে? সত্য উদঘাটনে প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, নাকি এই মৃত্যুর রহস্য আরও দীর্ঘ সময় অমীমাংসিত থেকে যাবে, সেটিই এখন সবার প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু।
প্রতিনিধির নাম 















