
মোঃ ইশারাত আলী :
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে গত কয়েক মাস ধরে চলা এক বিভীষিকাময় অধ্যায়ের অবসান ঘটল। শুক্রবার (২৭ মার্চ) সন্ধ্যায় যৌথ বাহিনীর এক ঝটিকা অভিযানে ধরা পড়ল কুখ্যাত ডাকাত সর্দার ও সন্ত্রাসী ইয়ার আলী (৩৫)। তার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ৯ এমএম পিস্তল, ওয়াকিটকি এবং মাদক কেবল তার অপরাধের গভীরতা নয়, বরং একটি সুসংগঠিত অপরাধী চক্রের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।
ইয়ার আলী কেবল একজন সাধারণ ডাকাত ছিল না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সে এলাকায় একটি ‘প্যারালাল ইন্টেলিজেন্স’ বা নিজস্ব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। তার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি ওয়াকিটকি সেট প্রমাণ করে যে, সে এবং তার বাহিনী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি নজরদারি করত। বিশেষ করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইয়ার আলী ও তার সহযোগী বাহার আলী অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইয়ার আলীর মূল লক্ষ্য ছিল সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বসতবাড়ি। ডাকাতির আড়ালে সে সাম্প্রদায়িক আতঙ্ক ছড়িয়ে এলাকায় নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছিল। কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বেশ কিছু পরিবার তার বাহিনীর ভয়ে দীর্ঘ দিন ধরে আতঙ্কে রাত কাটিয়েছে।
কালিগঞ্জ সার্কেল অফিসারের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে গোয়েন্দা তথ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়েছে। জানা গেছে, ইয়ার আলী কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের শংকরপুর গ্রামের আলমগীরের বাড়িতে আত্মগোপন করেছিল। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটের দিকে যৌথ বাহিনী বাড়িটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। পালানোর সুযোগ না পেয়ে অবশেষে অস্ত্র ও মাদকসহ হাতেনাতে ধরা পড়ে ইয়ার আলী। তবে তার অন্যতম সহযোগী বাহার আলী অন্ধকারে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ইয়ার আলীর কাছ থেকে ০১টি বিদেশি ৯ এমএম পিস্তল (যা সাধারণত পেশাদার খুনি বা বড় ডাকাত দল ব্যবহার করে) ০৪ রাউন্ড তাজা গুলি (যা দিয়ে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল) ০২টি ওয়াকিটকি (নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের রক্ষা করতো) বিপুল পরিমাণ ইয়াবা (যা থেকে বোঝা যায় সে এলাকায় মাদক সিন্ডিকেটেরও মূল হোতা) উদ্ধার করা হয়েছে।
ইয়ার আলীর গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে কালিগঞ্জ ও কৃষ্ণনগর এলাকায় মিষ্টি বিতরণের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, “ইয়ার আলীর ভয়ে আমরা মুখ খুলতে পারতাম না। আজ মনে হচ্ছে এলাকায় সত্যিকারের আইন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, এই গ্রেফতারের ফলে কেবল একটি ডাকাত দল নির্মূল হয়নি, বরং সাধারণ মানুষের মাঝে বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে হারানো নিরাপত্তা বোধ ফিরে আসবে।
এব্যাপারে কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাফিয়া পারভিন বলেন ইয়ার আলী গ্রেপ্তারের ফলে জনমনে প্রশান্তি তৈরী হয়েছে। এলাকার মানুষ খুশি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে।
কালিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ও বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গির আলম বলেন, কুখ্যাত ডাকাত ইয়ার আলী গ্রেফতার হওয়ায় এলাকার মানুষ নিরাপত্তা ফিরে পেয়েছে তবে আবার বাহার আলী পালিয়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছে। তিনি আরও বলেন তারা বার বার গ্রেফতার হয় এবং ২মাস পর সিস্টেম করে বের হয়ে এসে পুনরায় স্বরূপে ফিরে আসে। এটা দুঃখজনক।
ইয়ার আলীর গ্রেফতার একটি বড় সাফল্য হলেও, তার সহযোগী বাহার আলীর পালিয়ে থাকা এখনো উদ্বেগের কারণ। এছাড়া, ইয়ার আলীর এই অত্যাধুনিক অস্ত্রের উৎস কোথায় এবং কার ছত্রছায়ায় সে এই ত্রাসের রাজত্ব গড়ে তুলেছিল-তা নিয়ে আরও গভীর তদন্ত প্রয়োজন। বাহার আলীকে ধরতে সাঁড়াশি অভিযানের মাধ্যমে গ্রেফতার করা অস্ত্রের উৎসের সন্ধানে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এখন এলাকাবাসীর দাবী।
প্রতিনিধির নাম 
















