1. satnews24@satkhiranews24.com : sat24admin :
সাতক্ষীরা ০৭:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
কালিগঞ্জে সিন্ডিকেটের কবলে কৃষকের ৭৫ কোটি টাকা-রক্তচোষা অফিসার, সার ডিলার ও সুদে মহাজনের হালখাতার উল্লাস কালিগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু কালিগঞ্জে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ১৬৪৯ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার ও ২ কারবারি আটক কালিগঞ্জে বর্ণাঢ্য আয়োজনে আন্তঃপ্রাথমিক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন কালিগঞ্জে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুই কিশোর নিখোঁজ:  চরম উৎকণ্ঠায় পরিবার, থানায় পৃথক জিডি ফ‍্যাসিস্ট আমলের সব সার নিয়োগ ডিলার বাতিল নতুন সার ডিলার নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  কালিগঞ্জে গভীর রাতে মৎস্য ঘেরে বিষ প্রয়োগ; ২০-২৫ লাখ টাকার মাছ নিধন, এলাকায় চাঞ্চল্য কালিগঞ্জের পুলিনবাবুর হাটখোলায় টানা দ্বিতীয় দিন শান্তিপূর্ণভাবে ডিজেল বিক্রি কালিগঞ্জে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিন অতিবাহিত ১৪৭৩ পরীক্ষার্থীর মধ্যে অনুপস্থিত ১৩ জন

কালিগঞ্জে সিন্ডিকেটের কবলে কৃষকের ৭৫ কোটি টাকা-রক্তচোষা অফিসার, সার ডিলার ও সুদে মহাজনের হালখাতার উল্লাস

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:০৪:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
  • ৩৯ বার পড়া হয়েছে

মোঃ ইশারাত আলী :

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে ধান ক্ষেতের ফলন এখন কৃষকের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং এক ভয়ংকর মরণফাঁদ। মাঠের কৃষক যখন নিজের রক্ত জল করে তপ্ত রোদে পুড়ে দেশবাসীর অন্নের জোগান দিচ্ছেন, তখন পর্দার আড়ালে বসে সেই কৃষকের হাড় চিবিয়ে খাওয়ার উৎসবে মেতেছে একদল পিশাচ। অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে এক নারকীয় ‘প্রাতিষ্ঠানিক ডাকাতি’র চিত্র। সারের কৃত্রিম সংকটকে পুঁজি করে বিঘা প্রতি ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত কেড়ে নিয়ে প্রান্তিক চাষির পকেট থেকে ২৭ কোটি ১২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা খুবলে খেয়েছে সার ডিলার ও তাদের সহযোগীরা। এই লুটের নেশা এখানেই থামেনি। সরকারি দরকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেজি প্রতি প্রায় ১০ টাকা লোকসানে ধান বিক্রি করতে বাধ্য করে কৃষকের মুখ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে আরও ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।

সব মিলিয়ে কালিগঞ্জের প্রান্তিক কৃষি অর্থনীতি থেকে প্রায় ৭৫ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা গিলে খেয়েছে এক অশুভ ‘বিষাদ সিন্ডিকেট’। এই গণলুটপাটের নেপথ্য কারিগর হিসেবে অভিযোগের আঙুল খোদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসিম উদ্দীনের দিকে; যার প্রত্যক্ষ আশকারা ও রহস্যজনক ‘মৌনতাকে’ বর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে রক্তচোষা ডিলার ও সুদে মহাজনরা। যখন হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঋণের চাপে দিশেহারা কৃষক গলায় ফাঁস নেওয়ার কথা ভাবছেন, তখন তার সেই ঘামঝরা টাকায় রিসোর্টে মদ আর নারীর আসরে মেতে ওঠার নীল নকশা সাজাচ্ছে এই ‘সাদা কলারের’ অপরাধীরা। প্রশাসনের নাকের ডগায় চলা এই বীভৎস লুটতরাজ যেন এখন কালিগঞ্জের এক প্রকাশ্য ‘ওপেন সিক্রেট’-যেখানে আইন নির্বাক, আর মানবতা ডুকরে কাঁদছে।

কালিগঞ্জ উপজেলায় এ বছর ৭,২৫৮ হেক্টর (প্রায় ৫৪,২৫৩ বিঘা) জমিতে ধানের ফলন হয়েছে। কিন্তু এই ফলনই কৃষকের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানাগেছে বিঘা প্রতি গড়ে ৫,০০০ টাকা অতিরিক্ত সার খরচ চাপিয়ে কৃষকের থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রায় ২৭ কোটি ১২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।

আবার ধানের সরকারি দর কেজি প্রতি ৩৬ টাকা হলেও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কৃষক বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন ২৫-২৬ টাকায়। এতে কৃষকের লোকসান হচ্ছে প্রায় ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। সারের বাড়তি খরচ ও ধানের কম দাম মিলিয়ে কালিগঞ্জের কৃষি অর্থনীতিতে প্রায় ৭৫ কোটি টাকার ভয়াবহ ধস নামানো হয়েছে।

উপজেলায় এ বছর ৭,২৫৮ হেক্টর (প্রায় ৫৪,২৫৩ বিঘা) জমিতে ধানের ফলন হয়েছে। বিঘাপ্রতি জমিতে গড়ে কমের উপর ২২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বিপরীতে ১ বিঘা জমিতে সর্বোচ্চ ২২ মন হিসেবে ৮৮০ কেজি ধান উৎপাদন হয়েছে। মোট চাষকৃত জমির হিসেব ধরলে উপজেলায় ৪ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ৬ শত ৪০ কেজি ধান ফলন হয়েছে। উৎপাদিত ধানের প্রতিকেজি সরকারী দাম ৩৬ টাকা হলে মোট দাম হয় ১শত ৭১ কোটি ৮৭ লক্ষ ৩৫ হাজার ৪০ টাকা।

আবার কৃষক সুদে মহাজানের সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে সরকারী দামের বিপরীতে (৬২ কেজি) ধান ১৫৫০ টাকায় বিক্রি করছে। সে হিসেবে মোট ধানের দাম ১ শত ২৩ কোটি ৩৬ লাখ ৬৯ হাজার ৮ শত ১৭ টাকা। সরকারী দামের সাথে বিক্রি দাম বাদ দিলে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ৬৫ হাজার ২শত ২২ টাকা ধান বিক্রি করে কম দোম পাচ্ছে কৃষক।

কৃষক সার সিন্ডিকেট থেকে থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ২৭ কোটি ১২ লাখ ৬৫ হাজার এবং সরকারী দামের বিপরীতে ধান কম দামে বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ৬৫ হাজার ২শত ২২ টাকা। সে হিসেবে মোট ৭৫ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার ২শত ২২ টাকা কৃষকের পকেট থেকে কৃষি অফিসার, সার ডিলার ও সুদে মহাজনের সিন্ডিকেট টাকা লুটপাট করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ।

বর্ষায় ভিজে রোদে পুড়ে ১৫০ দিনের ধান চাষে কৃষক এখন চোখে শর্ষের ফুল দেখছে। সার ডিলারে দোকানে বিঘাপ্রতি খরচের ১৫-২০ হাজার টাকা বাকী। ৮৮০ কেজি ধান ২৬ টাকা দরে বিক্রি করলে তার দাম হবে ২২ হাজার ৮শত ৮০ টাকা। যা বিক্রি করলে খরচের টাকা উঠবেনা। যে কারনে কৃষক এখন দিশেহারা হয়ে হায় হায় করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মথুরেশপুর ইউনিয়নের ফরিদ তরফদার বলেন, “বস্তায় ৪৫০ টাকা বেশি দিছি। রসিদ চাইলে ডিলার কয়-‘সার নিলে লন, না নিলে বিদেয় হন’।” ধলবাড়িয়া ইউনিয়নের আব্দুর রহিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলাই আর অফিসাররা এসি রুমে বসে সিন্ডিকেটের ভাগ নেন।” কুশুলিয়া ইউনিয়নের নজরুল ইসলাম জানান, ৩ বস্তা সার ক্রয় করতে গিয়ে তাকে ১৫০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে আবার এখন ধান বিক্রির সময় দাম কম পাচ্ছি।

এ সবের নেপথ্যের নাটের গুরু কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষি অফিসার, বিএডিসির ও বিসিআইসির ২৪ সার ডিলার, এর পাশাপাশি কৃষ্ণনগরের ৯, বিষ্ণুপুরের ৮, চাম্পাফুলের ৭, দক্ষিণশ্রীপুরের ৪, কুশলিয়ার ৮, নলতার ৯, তারালীর ৫, ভাড়াশিমলার ৯, মথুরেশপুরের ৯, ধলবাড়িয়ার ৮, রতনপুরের ৯, মৌতলার ৮ সহ মোট ৮৫ জন ওয়ার্ড ভিত্তিক সাব ডিলার। সব মিলিয়ে যার মোট সংখ্যা ১০৯ এবং এর সাথে ২০০ অধিক খুচরা পার্টির একটি নেটওয়ার্ক কৃষকদের চুষে খেয়েছে।

কৃষকদের তীব্র অভিযোগ কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে না আসার কারনে আমরা সারের সরকারী দাম জানতে পারিনি। ধানের রোগ বালাই ঠিকমতো নিধন করতে পারিনি। লোনা মাটি ও লোনা পানির কবলে পড়লে তার কি প্রতিকার করবো জানতে পারিনি। আমরা সরকারী ভাবে ধানের দাম প্রতি কেজি কত টাকা তাও জানতে পারিনি। কৃষকরা কৃষি অফিসারদের মাঠ পর্যায় অনুপস্থিতিকে একটি ‘পরিকল্পিত অপরাধ’ হিসেবে দেখছেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই কর্মকর্তার অপসারণ চেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন পরিষদের মিটিংয়ে বারবার সারের বাড়তি দাম নিয়ে বলেছি, কিন্তু কৃষি অফিসার আমাদের গুরুত্বই দেন না। তিনি ডিলারদের সাথে গোপন বৈঠক করেন অথচ কৃষকদের কথা শোনেন না। এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার খুঁটির জোর কোথায়, তা তদন্ত করা দরকার।

উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ডাঃ শফিকুল ইসলাম বলেন কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। সারের বাড়তি দামের বিষয়ে আমি ডিলারের সাথে কথা বলেছি, সার ডিলার, কৃষি অফিসার ও কৃষকের কথার মিল নেই। এসব দেখার দায়িত্ব কৃষি অফিসারের, কিন্তু তিনি নির্লিপ্ত।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসীম উদ্দীন অত্যন্ত রুক্ষ মেজাজে সাংবাদিকদের বলেন, “বাজারে কোনো সংকট নেই। কৃষকরা অতিরঞ্জিত কথা বলছে। বদলির ভয় আমাকে দেখিয়ে লাভ নেই, ওপর মহলে আমার হাত অনেক লম্বা।” ২০২২ সাল থেকে একই কর্মস্থলে অবস্থান করে সাবেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় তিনি এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ। সেটিও তিনি তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দেন।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোঃ সাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তোর দেননি। তবে তিনি বলেন কৃষকরা সরকারী দামে সার কিনছে ও ধান বিক্রি করছে। কোন সমস্যা নেই।

কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষকদের প্রশ্ন ডিলারদের জবানবন্দি থাকার পরও কেন এই ‘গডফাদার’ কর্মকর্তাকে এখনো সপদে বহাল রাখা হয়েছে? ওপর মহলে লম্বা হাত”-এমন দম্ভোক্তি করার সাহস এই কর্মকর্তা কোথায় পান? কৃষকের পকেট থেকে লুটে নেওয়া কোটি কোটি টাকা কি রাষ্ট্র উদ্ধার করবে, নাকি অসাধু সার ডিলার, কৃষি কর্মকর্তা ও সুদে মহাজনের পকেটেই থাকবে? বিচার বিভাগীয় তদন্ত হবে? নাকি দুদোক তদন্ত করবে?

কালিগঞ্জের প্রান্তিক কৃষকের চোখের জল আর মাঠের ঘাম নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলছে, তাদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সময়। অসাধু কর্মকর্তা ওয়াসিম উদ্দীনকে অপসারণ এবং ডিলার সিন্ডিকেট ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন থামবে না। প্রশাসন কি কৃষকের পাশে দাঁড়াবে, নাকি দুর্নীতির এই বিশাল পাহাড়কে আড়াল করবে? কালিগঞ্জের মানুষ এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।

ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কালিগঞ্জে সিন্ডিকেটের কবলে কৃষকের ৭৫ কোটি টাকা-রক্তচোষা অফিসার, সার ডিলার ও সুদে মহাজনের হালখাতার উল্লাস

কালিগঞ্জে সিন্ডিকেটের কবলে কৃষকের ৭৫ কোটি টাকা-রক্তচোষা অফিসার, সার ডিলার ও সুদে মহাজনের হালখাতার উল্লাস

আপডেট সময় : ০৫:০৪:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

মোঃ ইশারাত আলী :

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে ধান ক্ষেতের ফলন এখন কৃষকের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং এক ভয়ংকর মরণফাঁদ। মাঠের কৃষক যখন নিজের রক্ত জল করে তপ্ত রোদে পুড়ে দেশবাসীর অন্নের জোগান দিচ্ছেন, তখন পর্দার আড়ালে বসে সেই কৃষকের হাড় চিবিয়ে খাওয়ার উৎসবে মেতেছে একদল পিশাচ। অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে এক নারকীয় ‘প্রাতিষ্ঠানিক ডাকাতি’র চিত্র। সারের কৃত্রিম সংকটকে পুঁজি করে বিঘা প্রতি ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত কেড়ে নিয়ে প্রান্তিক চাষির পকেট থেকে ২৭ কোটি ১২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা খুবলে খেয়েছে সার ডিলার ও তাদের সহযোগীরা। এই লুটের নেশা এখানেই থামেনি। সরকারি দরকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেজি প্রতি প্রায় ১০ টাকা লোকসানে ধান বিক্রি করতে বাধ্য করে কৃষকের মুখ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে আরও ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।

সব মিলিয়ে কালিগঞ্জের প্রান্তিক কৃষি অর্থনীতি থেকে প্রায় ৭৫ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা গিলে খেয়েছে এক অশুভ ‘বিষাদ সিন্ডিকেট’। এই গণলুটপাটের নেপথ্য কারিগর হিসেবে অভিযোগের আঙুল খোদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসিম উদ্দীনের দিকে; যার প্রত্যক্ষ আশকারা ও রহস্যজনক ‘মৌনতাকে’ বর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে রক্তচোষা ডিলার ও সুদে মহাজনরা। যখন হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঋণের চাপে দিশেহারা কৃষক গলায় ফাঁস নেওয়ার কথা ভাবছেন, তখন তার সেই ঘামঝরা টাকায় রিসোর্টে মদ আর নারীর আসরে মেতে ওঠার নীল নকশা সাজাচ্ছে এই ‘সাদা কলারের’ অপরাধীরা। প্রশাসনের নাকের ডগায় চলা এই বীভৎস লুটতরাজ যেন এখন কালিগঞ্জের এক প্রকাশ্য ‘ওপেন সিক্রেট’-যেখানে আইন নির্বাক, আর মানবতা ডুকরে কাঁদছে।

কালিগঞ্জ উপজেলায় এ বছর ৭,২৫৮ হেক্টর (প্রায় ৫৪,২৫৩ বিঘা) জমিতে ধানের ফলন হয়েছে। কিন্তু এই ফলনই কৃষকের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানাগেছে বিঘা প্রতি গড়ে ৫,০০০ টাকা অতিরিক্ত সার খরচ চাপিয়ে কৃষকের থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রায় ২৭ কোটি ১২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।

আবার ধানের সরকারি দর কেজি প্রতি ৩৬ টাকা হলেও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কৃষক বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন ২৫-২৬ টাকায়। এতে কৃষকের লোকসান হচ্ছে প্রায় ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। সারের বাড়তি খরচ ও ধানের কম দাম মিলিয়ে কালিগঞ্জের কৃষি অর্থনীতিতে প্রায় ৭৫ কোটি টাকার ভয়াবহ ধস নামানো হয়েছে।

উপজেলায় এ বছর ৭,২৫৮ হেক্টর (প্রায় ৫৪,২৫৩ বিঘা) জমিতে ধানের ফলন হয়েছে। বিঘাপ্রতি জমিতে গড়ে কমের উপর ২২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বিপরীতে ১ বিঘা জমিতে সর্বোচ্চ ২২ মন হিসেবে ৮৮০ কেজি ধান উৎপাদন হয়েছে। মোট চাষকৃত জমির হিসেব ধরলে উপজেলায় ৪ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ৬ শত ৪০ কেজি ধান ফলন হয়েছে। উৎপাদিত ধানের প্রতিকেজি সরকারী দাম ৩৬ টাকা হলে মোট দাম হয় ১শত ৭১ কোটি ৮৭ লক্ষ ৩৫ হাজার ৪০ টাকা।

আবার কৃষক সুদে মহাজানের সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে সরকারী দামের বিপরীতে (৬২ কেজি) ধান ১৫৫০ টাকায় বিক্রি করছে। সে হিসেবে মোট ধানের দাম ১ শত ২৩ কোটি ৩৬ লাখ ৬৯ হাজার ৮ শত ১৭ টাকা। সরকারী দামের সাথে বিক্রি দাম বাদ দিলে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ৬৫ হাজার ২শত ২২ টাকা ধান বিক্রি করে কম দোম পাচ্ছে কৃষক।

কৃষক সার সিন্ডিকেট থেকে থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ২৭ কোটি ১২ লাখ ৬৫ হাজার এবং সরকারী দামের বিপরীতে ধান কম দামে বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ৬৫ হাজার ২শত ২২ টাকা। সে হিসেবে মোট ৭৫ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার ২শত ২২ টাকা কৃষকের পকেট থেকে কৃষি অফিসার, সার ডিলার ও সুদে মহাজনের সিন্ডিকেট টাকা লুটপাট করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ।

বর্ষায় ভিজে রোদে পুড়ে ১৫০ দিনের ধান চাষে কৃষক এখন চোখে শর্ষের ফুল দেখছে। সার ডিলারে দোকানে বিঘাপ্রতি খরচের ১৫-২০ হাজার টাকা বাকী। ৮৮০ কেজি ধান ২৬ টাকা দরে বিক্রি করলে তার দাম হবে ২২ হাজার ৮শত ৮০ টাকা। যা বিক্রি করলে খরচের টাকা উঠবেনা। যে কারনে কৃষক এখন দিশেহারা হয়ে হায় হায় করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মথুরেশপুর ইউনিয়নের ফরিদ তরফদার বলেন, “বস্তায় ৪৫০ টাকা বেশি দিছি। রসিদ চাইলে ডিলার কয়-‘সার নিলে লন, না নিলে বিদেয় হন’।” ধলবাড়িয়া ইউনিয়নের আব্দুর রহিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলাই আর অফিসাররা এসি রুমে বসে সিন্ডিকেটের ভাগ নেন।” কুশুলিয়া ইউনিয়নের নজরুল ইসলাম জানান, ৩ বস্তা সার ক্রয় করতে গিয়ে তাকে ১৫০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে আবার এখন ধান বিক্রির সময় দাম কম পাচ্ছি।

এ সবের নেপথ্যের নাটের গুরু কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষি অফিসার, বিএডিসির ও বিসিআইসির ২৪ সার ডিলার, এর পাশাপাশি কৃষ্ণনগরের ৯, বিষ্ণুপুরের ৮, চাম্পাফুলের ৭, দক্ষিণশ্রীপুরের ৪, কুশলিয়ার ৮, নলতার ৯, তারালীর ৫, ভাড়াশিমলার ৯, মথুরেশপুরের ৯, ধলবাড়িয়ার ৮, রতনপুরের ৯, মৌতলার ৮ সহ মোট ৮৫ জন ওয়ার্ড ভিত্তিক সাব ডিলার। সব মিলিয়ে যার মোট সংখ্যা ১০৯ এবং এর সাথে ২০০ অধিক খুচরা পার্টির একটি নেটওয়ার্ক কৃষকদের চুষে খেয়েছে।

কৃষকদের তীব্র অভিযোগ কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে না আসার কারনে আমরা সারের সরকারী দাম জানতে পারিনি। ধানের রোগ বালাই ঠিকমতো নিধন করতে পারিনি। লোনা মাটি ও লোনা পানির কবলে পড়লে তার কি প্রতিকার করবো জানতে পারিনি। আমরা সরকারী ভাবে ধানের দাম প্রতি কেজি কত টাকা তাও জানতে পারিনি। কৃষকরা কৃষি অফিসারদের মাঠ পর্যায় অনুপস্থিতিকে একটি ‘পরিকল্পিত অপরাধ’ হিসেবে দেখছেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই কর্মকর্তার অপসারণ চেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন পরিষদের মিটিংয়ে বারবার সারের বাড়তি দাম নিয়ে বলেছি, কিন্তু কৃষি অফিসার আমাদের গুরুত্বই দেন না। তিনি ডিলারদের সাথে গোপন বৈঠক করেন অথচ কৃষকদের কথা শোনেন না। এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার খুঁটির জোর কোথায়, তা তদন্ত করা দরকার।

উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ডাঃ শফিকুল ইসলাম বলেন কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। সারের বাড়তি দামের বিষয়ে আমি ডিলারের সাথে কথা বলেছি, সার ডিলার, কৃষি অফিসার ও কৃষকের কথার মিল নেই। এসব দেখার দায়িত্ব কৃষি অফিসারের, কিন্তু তিনি নির্লিপ্ত।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসীম উদ্দীন অত্যন্ত রুক্ষ মেজাজে সাংবাদিকদের বলেন, “বাজারে কোনো সংকট নেই। কৃষকরা অতিরঞ্জিত কথা বলছে। বদলির ভয় আমাকে দেখিয়ে লাভ নেই, ওপর মহলে আমার হাত অনেক লম্বা।” ২০২২ সাল থেকে একই কর্মস্থলে অবস্থান করে সাবেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় তিনি এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ। সেটিও তিনি তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দেন।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোঃ সাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তোর দেননি। তবে তিনি বলেন কৃষকরা সরকারী দামে সার কিনছে ও ধান বিক্রি করছে। কোন সমস্যা নেই।

কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষকদের প্রশ্ন ডিলারদের জবানবন্দি থাকার পরও কেন এই ‘গডফাদার’ কর্মকর্তাকে এখনো সপদে বহাল রাখা হয়েছে? ওপর মহলে লম্বা হাত”-এমন দম্ভোক্তি করার সাহস এই কর্মকর্তা কোথায় পান? কৃষকের পকেট থেকে লুটে নেওয়া কোটি কোটি টাকা কি রাষ্ট্র উদ্ধার করবে, নাকি অসাধু সার ডিলার, কৃষি কর্মকর্তা ও সুদে মহাজনের পকেটেই থাকবে? বিচার বিভাগীয় তদন্ত হবে? নাকি দুদোক তদন্ত করবে?

কালিগঞ্জের প্রান্তিক কৃষকের চোখের জল আর মাঠের ঘাম নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলছে, তাদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সময়। অসাধু কর্মকর্তা ওয়াসিম উদ্দীনকে অপসারণ এবং ডিলার সিন্ডিকেট ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন থামবে না। প্রশাসন কি কৃষকের পাশে দাঁড়াবে, নাকি দুর্নীতির এই বিশাল পাহাড়কে আড়াল করবে? কালিগঞ্জের মানুষ এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।