কালিগঞ্জের সাধারণ মানুষের চোখে ইরান যুদ্ধ: বিশ্ব রাজনীতি বনাম পকেটের টান

মোঃ ইশারাত আলী :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার উত্তর পার চৌরাস্তার মোড়। প্রতিদিনের মতো চায়ের দোকানে জটলা, কিন্তু আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু গতানুগতিক রাজনীতি নয়। টিভির পর্দায় হরমুজ প্রণালীর দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা তেলের ট্যাংকার আর ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ কেশম দ্বীপের খবর দেখে মোড়ের ভ্যানচালক করিম চাচার কপালে চিন্তার ভাঁজ। তার কাছে হোয়াইট হাউসের ট্রাম্প আর তেহরানের লারিজানির লড়াইটা কেবল দূরদেশের যুদ্ধ নয়; বরং তার পরের দিনের চালের দামের লড়াই।
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের আঁচ সরাসরি এসে লেগেছে কালিগঞ্জের বাজারে। গত এক সপ্তাহে তেল পাওয়ার লড়াই এবং দাম বাড়ার অজুহাতে নিত্যপণ্যের বাজারে যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার দশা।
কালিগঞ্জের কাঁচাবাজার করতে আসা স্কুল শিক্ষক আল আমিন হোসেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ইরান আর আমেরিকার যুদ্ধ কি না কি জানি না, কিন্তু গত দুই দিনে ট্রাক ভাড়া বাড়ার কথা বলে কাঁচা মালের দাম ৫-১০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্ব রাজনীতি আমরা বুঝি না, আমরা বুঝি পকেটের টান।”
কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর অঞ্চলের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি ও মৎস্য ঘের। যুদ্ধের প্রভাবে ডিজেলের দাম বাড়লে বা সরবরাহ কমলে গভীর সংকটে পড়বে বোরো চাষীরা। কালিগঞ্জে গত এক সপ্তাহ ধরে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল নেওয়ার দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। ২০০ টাকার তেল নিতে ৬-৮ ঘন্টা দেরী করতে হচ্ছে। আবার পাম্পে তেল না পেয়ে অনেক কৃষক ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে।
স্থানীয় এক ঘের ব্যবসায়ী জানান, তেলের সংকটে জেনারেটর চালানো দুষ্কর হয়ে পড়ছে, যার ফলে মাছের অক্সিজেনের অভাব দেখা দিতে পারে। যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে কেবল পরিবহন নয়, গোটা উৎপাদন ব্যবস্থাই থমকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে যুদ্ধের ডামাডোলের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী কালিগঞ্জের গ্রামগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরির পাঁয়তারা করছে। “তেল পাওয়া যাবে না” কিংবা “সারের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাবে” এমন গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে বাড়তি মুনাফা লুটে নিচ্ছে কেউ কেউ। সম্প্রতি কালিগঞ্জে জ্বালানি ও সারের গুদামে প্রশাসনের তদারকি বাড়লেও অসাধু চক্র এখনো সক্রিয়। তারা ঠিকই পিছনের দরজা দিয়ে নিজের সুবিধা আদায় করে বেরিয়ে যাচ্ছে।
চায়ের দোকানে বসে থাকা এক তরুণ বিদ্রূপ করে বললেন, “আমেরিকা মারছে ইরানে, আর সেটার ঘা এসে লাগছে আমাদের পকেটে। মনে হচ্ছে মিসাইলগুলো তেহরানে নয়, সরাসরি আমাদের কালিগঞ্জের বাজারে এসে পড়ছে!” এই রসিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর হাহাকার।
বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর আধিপত্যের লড়াই হয়তো হাজার মাইল দূরে, কিন্তু এর একেকটি গোলা সরাসরি আঘাত করছে মধ্যবিত্তের ডাইনিং টেবিলে। কালিগঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছে আন্তর্জাতিক কূটনীতির চেয়েও আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে-আগামীকাল তেলের দাম আর কতটা বাড়বে? বিশ্ব শান্তির চেয়েও আজ তাদের কাছে জরুরি হয়ে পড়েছে নিজের পকেটের নিরাপত্তা।
















