
মোঃ ইশারাত আলী :
অন্য চিকিৎসকের নাম ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধন নম্বর চুরি করে রাজধানী ঢাকার নামী প্রতিষ্ঠানের একাধিক ভুয়া উচ্চতর ডিগ্রীধারী সেজে । অবশেষে প্রশাসনের এক আকস্মিক অভিযানে ধুলিসাৎ হয়েছে তার সেই ‘খুনে চিকিৎসা’র পৈশাচিক জালিয়াতির সাম্রাজ্য। এই ভুয়া চিকিৎসকের ভুল ও উচ্চমাত্রার ওষুধের বিষক্রিয়ায় তীব্র কিডনি বিকলতা (Acute Kidney Injury) নিয়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে এসেছেন এক যুবক।
সোমবার (১৫ জুন, ২০২৬) দুপুরে কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা বাজারে ‘মানবস্বপ্ন হেলথ কেয়ার সেন্টার’ নামের এক তথাকথিত চেম্বারে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ। অভিযানকালে জালিয়াতির সমস্ত অভিযোগ হাতেনাতে প্রমাণিত হওয়ায় অভিযুক্ত ভুয়া চিকিৎসক মোঃ ইয়াসিন আলী ওরফে পলাশকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাইনুল ইসলাম। অভিযানে তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ ডালিয়া আক্তার সাথী।
লিখিত অভিযোগ ও মেডিকেল নথি পর্যালোচনা করে জানা যায়, দণ্ডিত ইয়াসিন আলী পলাশ মূলত একজন ডিপ্লোমা (DMF) ধারী। কিন্তু আইন অনুযায়ী ন্যূনতম এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রী ছাড়া নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবী ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও সে নলতা বাজারে চেম্বার খুলে নিজেকে ঢাকার পিজি হাসপাতাল থেকে সরাসরি আগত “নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ চিকিৎসক” হিসেবে জাহির করে আসছিল।
তার প্রেসক্রিপশন প্যাডে ব্যবহার করা হতো— এমবিবিএস (ঢাকা), বিসিএস (স্বাস্থ্য), পিজিটি (শিশু রোগ ও শিশু স্বাস্থ্য), এমডি (শিশু রিউম্যাটোলজি) রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি হাসপাতাল)-এর মতো সব চোখ ধাঁধানো ভুয়া ডিগ্রী। শুধু তাই নয়, সে প্যাডে বুক ফুলিয়ে যে বিএমডিসি নিবন্ধন নম্বরটি (ডি-১৩১৯৮) ব্যবহার করছিল, সেটি মূলত ডাঃ এ জেড এম ফখরুল ইসলাম নামের দেশের একজন প্রকৃত ও বৈধ এমবিবিএস চিকিৎসকের।
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাটকেখালি গ্রামের মতি সরদারের ছেলে তন্ময় সরদার (৩০) তীব্র পেটে ব্যথা নিয়ে ৩০০ টাকা ভিজিট দিয়ে এই কসাইয়ের চেম্বারে যান। DMF ধারী হয়েও ইয়াসিন আলী পলাশ রোগীকে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে না পাঠিয়ে নিজেই একগাদা উচ্চমাত্রার এলোপ্যাথিক ওষুধ লিখে দেয়। সে রোগীকে উচ্চমাত্রার এনএসএআইডি (NSAID) ব্যথানাশক ‘ন্যাপ্রসিন প্লাস ৩৭৫ মি.গ্রা.’ সহ বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও ক্ষতিকর ড্রিপ প্রেসক্রাইব করে।
এই ভুল ও অপচিকিৎসার মাত্র ২ দিনের মাথায় তন্ময়ের শরীর, মুখমণ্ডল এবং হাত-পা মারাত্মকভাবে ফুলে যায় এবং পেটের ব্যথা তীব্রতর হতে থাকে। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় গত ১১ এপ্রিল তাকে দ্রুত সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগে ভর্তি করা হয় (রেজিঃ নং- আর ০১৯৩৩০)। সেখানে ইউরোলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডাঃ এস এম রমিজ আহমেদের অধীনে চিকিৎসাধীন থাকার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে যে, ভুয়া ডাক্তারের দেওয়া উচ্চমাত্রার ওই ব্যথানাশক ওষুধের বিষক্রিয়াতেই তন্ময়ের তীব্র কিডনি বিকলতা (Acute Kidney Injury) এবং স্ক্রোটাল সোয়েলিং (Scrotal Swelling) হয়েছে। হাসপাতালে টানা ১৮ দিন (১১ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল) জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে নিবিড় চিকিৎসার পর অলৌকিকভাবে প্রাণ ফিরে পান ওই যুবক।
সুস্থ হয়ে ভুয়া চিকিৎসার জালিয়াতি ধরতে তন্ময় মে মাসে নলতা বাজারের সেই চেম্বারে গেলে নিজের অপরাধ স্বীকার করা তো দূরের কথা, ভুয়া ডাক্তার ইয়াসিন আলী পলাশ এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গরা ক্ষিপ্ত হয়ে ভুক্তভোগী রোগীকে বেদম লাঞ্ছিত করে এবং চেম্বার থেকে বের করে দিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। নিরুপায় হয়ে তন্ময় সরদার সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফিশিয়াল ছাড়পত্র ও প্রেসক্রিপশনসহ কালিগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। যার প্রেক্ষিতে সোমবার এই কুখ্যাত প্রতারককে হাতেনাতে ধরে সাজা শোনান ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এদিকে প্রশাসনের এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপকে এলাকাবাসী সাধুবাদ জানালেও সাজা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের দাবি— যে প্রতারক চিকিৎসক সেজে দীর্ঘদিন ধরে শত শত মানুষের জীবন বিপন্ন করছে, অন্য চিকিৎসকের নিবন্ধন চুরি করছে এবং যার কারণে একজন যুবকের কিডনি নষ্ট হলো, তাকে মাত্র ৬ মাসের সাজা দেওয়া মোটেও পর্যাপ্ত নয়। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন-২০১০ এর ২৮ ও ২৯ ধারা অনুযায়ী চিকিৎসায় জালিয়াতি ও প্রতারণার সর্বোচ্চ শাস্তি ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর জোর দাবি, এই লাইসেন্সবিহীন ভুয়া কসাইখানা “মানবস্বপ্ন হেলথ কেয়ার সেন্টার” যেন চিরতরে সিলগালা করা হয় এবং এই ভুয়া ডাক্তারের বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
প্রতিনিধির নাম 
















