কালিগঞ্জ প্রচণ্ড শীত জেঁকে বসেছে, খেজুরের রস, গুড় পিঠা ঘিরে

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলায় জেঁকে বসেছে প্রচণ্ড শীত। ঘন কুয়াশা আর হাড় কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যেই শুরু হয়েছে খেজুরের রস সংগ্রহের মৌসুম। শীত এলেই এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি ও লোকজ সংস্কৃতিতে প্রাণ ফেরে খেজুরের রস, গুড় ও পিঠাকে ঘিরে।
উপজেলার নলতা, ভাড়াশিমলা, কুশলিয়া, বিষ্ণুপুর, দক্ষিণশ্রীপুর, মৌতলা, কৃষ্ণনগর, মথুরেশপুর, ধলবাড়িয়া, তারালী, চাম্পাফুল ও রতনপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে ভোরের আগেই গাছিরা খেজুরগাছে উঠে হাঁড়ি নামান। রাতভর গাছে ঝরতে থাকা কাঁচা রসে ভরে ওঠে মাটির কলসি। সূর্য ওঠার আগেই সেই রস সংগ্রহ করে শুরু হয় গুড় তৈরির কাজ।
স্থানীয় গাছি রবিউল ইসলাম জানান, শীত যত বেশি হয়, রস তত মিষ্টি হয়। তবে কুয়াশা বেশি থাকলে কাজ করতে কষ্ট হয়। এই কয়েক মাসের আয়েই অনেক গাছির সারা বছরের সংসার খরচ চলে।
সংগৃহীত কাঁচা রস গ্রামের বাড়ির উঠোন কিংবা খোলা মাঠে বড় কড়াইয়ে জ্বাল দেওয়া হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দেওয়ার পর রস ঘন হয়ে তৈরি হয় ঝরঝরে ও পাটালি গুড়। কালিগঞ্জের খাঁটি গুড়ের চাহিদা প্রতিবছরই বাড়ছে। স্থানীয় বাজার ছাড়াও এই গুড় যাচ্ছে সাতক্ষীরা সদর, তালা, আশাশুনি ও খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায়।
কালিগঞ্জ বাজারে গুড় ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম বলেন, “এই সময়ে গুড়ই আমাদের প্রধান পণ্য। ভালো মানের গুড় পাইকাররা আগেই বুকিং দিয়ে নিয়ে যায়।”
শীতের এই মৌসুমে গ্রামগুলোতে পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায়। ভাপা পিঠা, চিতই, পুলি, দুধ চিতইসহ নানা ধরনের পিঠায় ব্যবহার হচ্ছে খেজুরের গুড়। অনেক নারী গৃহস্থালির পাশাপাশি পিঠা বানিয়ে স্থানীয় বাজার ও রাস্তার ধারে বিক্রি করছেন, যা তাদের বাড়তি আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
কালিগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় কয়েক হাজার খেজুরগাছ রয়েছে, যেগুলো থেকে শীতকালীন সময়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রস ও গুড় উৎপাদিত হয়। এ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বহু পরিবার জড়িত।
তবে ঐতিহ্যবাহী এই পেশা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। গাছির সংখ্যা কমে যাওয়া, তরুণদের অনাগ্রহ এবং সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে আধুনিক সুবিধার অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবুও শীত এলেই কালিগঞ্জে খেজুরের রস ও গুড়কে ঘিরে যে কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়, তা এখনও গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করেই কালিগঞ্জের মানুষ খেজুরের রস, পিঠা ও গুড়ের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। কুয়াশামাখা ভোরে গাছিদের ব্যস্ততা আর সন্ধ্যায় পিঠার আড্ডা মিলিয়ে শীতকাল এখানে শুধু ঋতু নয়, এক জীবন্ত সংস্কৃতি।









