মোঃ ইশারাত আলী, কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) থেকে :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে বিশুদ্ধ পানির সংকট মেটানোর নামে গত তিন দশক ধরে চলছে এক বীভৎস ‘লুটপাটের নাটক’। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতাকে পুঁজি করে দেশি-বিদেশি এনজিও ও দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে শতকোটি টাকা। অথচ, উপকূলের অবহেলিত মানুষের তৃষ্ণা মেটানোর পরিবর্তে মাঠ পর্যায়ে গড়ে তোলা হয়েছে কেবল ‘ব্যর্থতার কবরস্থান’। গ্রামে গ্রামে স্থাপিত পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (PSF) ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং প্ল্যান্টগুলো আজ অযত্ন আর অবহেলায় মরিচা ধরা লোহার জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। এনজিওগুলোর তথাকথিত ‘সফল’ প্রজেক্ট রিপোর্টের আড়ালে লুকিয়ে আছে চরম বাস্তবতা-যেখানে তৃষ্ণার্ত মানুষকে এখনো চড়া দামে পানি কিনে খেতে হচ্ছে। উপকূলের এই জনপদ এখন এনজিওদের অশুভ বাণিজ্যের বলি। তিন দশকের এই পানি-বাণিজ্যের নেপথ্যের হোতা কারা এবং কেন সাধারণ মানুষের কপালে এক গ্লাস নিরাপদ পানি জুটল না—এখন সময় এসেছে সেই হিসাব বুঝে নেওয়ার। কালিগঞ্জের মানুষ আর প্রতিশ্রুতি নয়, বরং প্রতিটি প্রকল্পের স্বচ্ছ অডিট এবং জড়িতদের আইনি বিচার চায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, কালিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য পন্ড স্যান্ড ফিল্টার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক এবং ছোট ছোট পানি সরবরাহ প্রকল্প এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও মরিচা ধরা লোহার কাঠামো, কোথাও ভাঙা সিমেন্টের ট্যাংক, আবার কোথাও গরু বাঁধার খুঁটি কিংবা আবর্জনা ফেলার স্থানে পরিণত হয়েছে এক সময়ের বহুল প্রচারিত প্রকল্পগুলো।
স্থানীয়দের ভাষায়, প্রকল্প এসেছে, টাকা খরচ হয়েছে, ছবি তোলা হয়েছে, প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে; কিন্তু পানির সংকট আজও আগের মতোই রয়ে গেছে। এখন আমরা প্রতি লিটার পানি কিনে খাচ্ছি।
কালিগঞ্জে সুপেয় পানি সরবরাহের নামে গত এক দশকে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, কালিগঞ্জ ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় পানি, স্যানিটেশন ও ওয়াশ খাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে বিভিন্ন এনজিও। এর মধ্যে রয়েছে সুশীলন, উত্তরণ, অগ্রগতি, প্রেরণা, বারসিক, ব্রাক, কেয়ার, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন , এনজিএফ, কোডেক, এলইডিএআরএস (LEDARS), রিশিল্পী, ওয়াটারএইডসহ আরও অনেক সংস্থা উল্লেখ যোগ্যহারে কাজ করেছে।
কিন্তু এতসব প্রকল্পের পরও বাস্তব প্রশ্ন একটাই, তাহলে কেন কালিগঞ্জের মানুষ এখনও পানির জন্য সংগ্রাম করছে?
এমন প্রশ্নে এসব এনজিও শত শত প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। গ্রামে গ্রামে বসানো হয়েছে পন্ড স্যান্ড ফিল্টার, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং ট্যাংক এবং বিভিন্ন ধরনের পানি বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিয়ে কোনো কার্যকর পরিকল্পনা ছিল না।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, একটি পিএসএফ নির্মাণে এক থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে। কিন্তু নির্মাণ শেষে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল, কারিগরি সহায়তা কিংবা স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে না তোলায় অধিকাংশ ফিল্টার ৬ মাসের মধ্যেই অকেজো হয়ে পড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের বড় অংশের অর্থ ব্যয় হয়েছে কনসালট্যান্ট, যানবাহন, কর্মশালা, সেমিনার, প্রশিক্ষণ এবং বিদেশি প্রতিনিধি বা উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পরিদর্শন ব্যবস্থাপনায়। ফলে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছেছে বরাদ্দের সামান্য অংশ।
অধিকাংশ এনজিও প্রকল্প গ্রহণ করে দাতা সংস্থাগুলোর তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে। পন্ড স্যান্ড ফিল্টার বা রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংয়ের মতো প্রযুক্তিগুলো কাগজে-কলমে অত্যন্ত কার্যকর মনে হলেও বাস্তবে স্থানীয় পরিবেশ, লবণাক্ততা এবং দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।
প্রকল্প চলাকালে চটকদার প্রতিবেদন, ফটোসেশন এবং সফলতার গল্প প্রচার করা হলেও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই অনেক স্থাপনা কারিগরি ত্রুটিতে অচল হয়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং তদারকির অভাবে অনেক স্থাপনা হস্তান্তরের আগেই নষ্ট হতে শুরু করে। পরে রক্ষণাবেক্ষণের পুরো দায় চাপিয়ে দেওয়া হয় গ্রামবাসীর ওপর, যাদের সেই সক্ষমতা বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য কোনোটিই থাকে না।
পানির সংকট শুধু জীবনযাত্রার কষ্টই বাড়াচ্ছে না, এর ভয়াবহ স্বাস্থ্যগত প্রভাবও পড়ছে উপকূলীয় মানুষের ওপর।
স্থানীয় স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি চর্মরোগ, কিডনি জটিলতা, গর্ভকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং গর্ভপাতের আশঙ্কাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অনেক পরিবার এখনও রান্না, গোসল এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনের জন্য লোনা পানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের সোতা গ্রামের লাকি (৫০) বলেন, “এনজিওর লোকরা যখন আসে, বলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কল বসায়, ছবি তোলে। কিন্তু মাস ঘুরতেই সেই কল দিয়ে আর পানি পড়ে না। এখন সেই ট্যাংকের ওপর আমরা খড় শুকাই।”
দক্ষিণ শ্রীপুরের মরিয়ম বিবি জানান, “এক কলস পানির জন্য প্রতিদিন প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটতে হয়। না হলে টাকা দিয়ে পানি কিনে খেতে হয়। লোনা পানিতে গোসল করে সারা গায়ে ঘা হয়ে গেছে।”
ভাড়াশিমলার ফাতেমা খাতুন বলেন, “নোনা পানি খেয়ে আমার শরীর ফুলে গিয়েছিল। ডাক্তার বলেছে এটা বিষের মতো ক্ষতি করছে। চিকিৎসা করতে অনেক টাকা গেছে, তারপরও নোনা পানিতেই গোসল করতে হয়।”
শ্রীকলা গ্রামের রায়হান হোসেনের ভাষায়, “এনজিওর লোকজন গাড়ি হাঁকিয়ে আসে, আমাদের সঙ্গে সেলফি তোলে, ছবি নেয়। পরে আমরা শুধু মরিচা ধরা ফিল্টারই দেখি।”
মৎস্যজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, “চিংড়ি চাষের লোনা পানি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে কত প্রকল্প হলো। অথচ এখন টিউবওয়েলেও লোনা পানি ওঠে। আমাদের ভাগ্যে মিষ্টি পানি না জুটলেও অনেকের বাড়ি-গাড়ি হয়েছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের পানির সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামোগত সমাধানের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তবে বারবার স্বল্পমেয়াদী ও বিচ্ছিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে এমন প্রযুক্তি সরবরাহ করা হয়েছে, যা স্থানীয় পানির স্তর, লবণাক্ততার ধরন কিংবা পরিবেশগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম অল্প সময়ের মধ্যেই পরিত্যক্ত হয়ে গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘমেয়াদী সমাধান যেমন বৃহৎ পানি শোধনাগার, টেকসই বাঁধ বা কেন্দ্রীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে ছোট ছোট প্রকল্পের মাধ্যমে সমস্যাকে সাময়িকভাবে ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় মিশন মহিলা উন্নয়ন সংস্থার কো-অর্ডিনেটর শেখ আব্দুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমরা প্রকল্প শেষ করে স্থানীয় কমিটির কাছে হস্তান্তর করি। তারা যদি রক্ষণাবেক্ষণ করতে না পারে, তাহলে আমাদের কিছু করার থাকে না। আমাদের বাজেটও সীমিত থাকে।”
তবে স্থানীয়দের দাবি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং দুর্বল বাস্তবায়নের কারণেই অনেক প্রকল্প শুরু থেকেই টেকসই হয়নি।
কালিগঞ্জ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী জুয়েল হোসেন বলেন, “এনজিওগুলো অনেক সময় আমাদের না জানিয়েই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। আমাদের সঙ্গে তাদের সমন্বয় খুবই সীমিত। ইউএনও অফিস থেকে অনাপত্তি পত্র নিয়ে তারা কাজ করে। কালিগঞ্জে কতগুলো অকেজো ফিল্টার রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য আমার কাছে নেই।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন সাহা বলেন, “আপনি স্পেসেফিক ভাবে বলেন। এব্যাপারে এনজিওগুলোর সাথে কথা বলতে হবে। আপনি লোকেশনের ছবি সহ আমার আমাকে দেন আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
স্থানীয়দের দাবী, এখন আর সাময়িক প্রকল্প নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই উদ্যোগ। প্রতিটি ইউনিয়নে আধুনিক রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট স্থাপন, কেন্দ্রীয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
একই সঙ্গে এনজিও প্রকল্পগুলোর অর্থ ব্যয়ের ওপর কঠোর অডিট ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
প্রকল্পের সাইনবোর্ড মুছে গেছে, রিপোর্টের পাতা পুরোনো হয়েছে, ফটোসেশনের হাসি হারিয়ে গেছে। কিন্তু রয়ে গেছে উপকূলের মানুষের দীর্ঘশ্বাস। তাদের একটাই প্রশ্ন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি এক গ্লাস নিরাপদ মিষ্টি পানির নিশ্চয়তা না মেলে, তবে সেই উন্নয়নের হিসাব কোথায়?
রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বিশুদ্ধ পানির অধিকার কোনো দয়া বা অনুদান নয়, এটি মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার অপেক্ষাতেই আজও তাকিয়ে আছে কালিগঞ্জের তৃষ্ণার্ত জনপদ।
প্রতিনিধির নাম 















