কালিগঞ্জ সীমান্তে টানা অভিযানে মাদক উদ্ধার, নারী মাদক কারবারিসহ স্বামী আটক, আগাম খবর পেয়ে পালাল চিহ্নিত ৩জন

কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি:
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা যে দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচারের নিরাপদ করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে-বিজিবি ও র্যাবের পরপর দুই দিনের যৌথ অভিযানে তারই বাস্তব প্রমাণ মিলেছে। নীলডুমুর ব্যাটালিয়ন (১৭ বিজিবি) এলাকার সীমান্তে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) ও শনিবার (২৪ জানুয়ারি) মোট ১ হাজার ৩০৮ বোতল মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযানে একজন নারী মাদক কারবারি ও তার স্বামী আটক হলেও, অভিযানের আগাম আভাস পেয়ে আরও তিনজন চিহ্নিত মাদক কারবারি পালিয়ে যাওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে তথ্য ফাঁস ও সংঘবদ্ধ চক্রের তৎপরতা নিয়ে।
বিজিবি সূত্র জানায়, শনিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত ১৭ বিজিবির অধীনস্থ সোলপুর বিওপির দায়িত্বপূর্ণ ভাড়াসিমলা দমদমঘাট এলাকায় এই যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ বন্ধ করা এবং স্থানীয় বিতরণ নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়াই ছিল অভিযানের মূল লক্ষ্য।
অভিযানে সোলপুর বিওপির নায়েক সুবেদার মোঃ ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে বিজিবির ১১ সদস্য এবং র্যাব-৬ খুলনার সিপিসি-১, সাতক্ষীরা ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) জয়উদ্দিন মোহাম্মদ জিহাদের নেতৃত্বে র্যাবের ২৫ সদস্য অংশ নেন। মোট ৩৬ সদস্যের সমন্বিত দল পুরো এলাকা ঘিরে ব্যাপক তল্লাশি চালায়।
অভিযান চলাকালে উপজেলার বাগবাটি গ্রামের মোছাঃ ইয়াসমিন জাহান (৩২) ও তার স্বামী মোঃ মিজানুর রহমানকে আটক করা হয়। তাদের হেফাজত থেকে উদ্ধার করা হয় ১১ বোতল ফেনসিডিল, ৫৩০ বোতল স্কাফ সিরাপ ও ৪৪৩ বোতল উইনছিরক্স সিরাপ-সব মিলিয়ে ৯৮৪ বোতল মাদকদ্রব্য। এ সময় মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত একটি ডিসকভার মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়, মাদকসহ যার বাজারমূল্যসহ আনুমানিক প্রায় ৩ লাখ টাকা বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে অভিযানের মাঝেই ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় আরও তিনজন চিহ্নিত মাদক কারবারি-মোঃ মহাসিন আলী (৩৭) নারায়ণপুর, শেখ ইমান আলী (৪৬) খারহাট এবং মোছাঃ শাহানারা পারভীন (৩৯) শীতলপুর এলাকার বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্র জানায়, তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত দিয়ে মাদক সংগ্রহ ও সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। অভিযানের আগাম তথ্য তারা কীভাবে পেল-তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র সন্দেহ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) বাগবাটি এলাকায় পৃথক অভিযানে সবুজ গাজীকে হাতেনাতে ৩২৪ বোতল ফেনসিডিল সাদৃশ্য কোডিন ফসফেট মিশ্রিত নিষিদ্ধ এসফাক কাশির সিরাপসহ আটক করা হয়। পরপর দুই দিনের অভিযানে উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০৮ বোতলে।
থানা সূত্রে জানা গেছে, আটককৃত আসামি, উদ্ধারকৃত মাদকদ্রব্য ও জব্দকৃত মোটরসাইকেল কালিগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
টানা অভিযানে বড় চালান উদ্ধার হলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে-সীমান্ত দিয়ে মাদক আসার মূল রুটগুলো কি আদৌ বন্ধ হচ্ছে? নারী ও পরিবারের সদস্যদের ব্যবহার করে মাদক পাচারের কৌশল কতটা বিস্তৃত? পলাতকদের পেছনে কারা মদদ দিচ্ছে?
কালিগঞ্জ সীমান্তে এই অভিযানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-মাদক চক্র এখনো সক্রিয় ও সংঘবদ্ধ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই সাফল্য প্রশংসনীয় হলেও, পুরো চক্র ভাঙতে নিয়মিত ও গভীর অনুসন্ধানমূলক অভিযানই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
















