কালিগঞ্জে অবৈধ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকের রমরমা বাণিজ্য: সিভিল সার্জনের অভিযান, ফাঁস হলো ভয়াবহ অনিয়ম

মোঃ ইশারাত আলী :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলায় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নামে বছরের পর বছর ধরে চলছিল অবৈধ চিকিৎসা বাণিজ্য। সরকারি অনুমোদন, লাইসেন্স, প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছাড়াই পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে গড়ে উঠেছিল দালালনির্ভর কমিশন বাণিজ্য ও অপচিকিৎসার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। দীর্ঘদিনের গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সকাল ১১টার পর সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোঃ আব্দুস সালাম কালিগঞ্জ উপজেলার লাইফ কেয়ার হাসপাতাল, নলতা হাসপাতাল ও নলতা ডায়াবেটিক্স এন্ড জেনারেল হাসপাতাল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনে উঠে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর অনিয়ম।
অনুমোদন নেই, জনবল নেই, কাগজপত্র নেই-তবু চলছে চিকিৎসা! পরিদর্শনে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নেই বৈধ লাইসেন্স, নেই নবায়নকৃত কাগজপত্র, নেই এমবিবিএস চিকিৎসক, ডিপ্লোমা নার্স, প্যাথলজিস্ট বা প্রশিক্ষিত ল্যাব টেকনোলজিস্ট। এমনকি পরিবেশ অধিদপ্তর, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই চলছে কথিত চিকিৎসা সেবা।
নলতা ডায়াবেটিক্স এন্ড জেনারেল হাসপাতালের ক্লিনিক সেকশন তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সিভিল সার্জন জানান, এই প্রতিষ্ঠানে ক্লিনিক পরিচালনার জন্য যে ধরনের জনবল ও কাগজপত্র থাকার কথা—তার কিছুই নেই। ফলে আইন অনুযায়ী ক্লিনিক সেকশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
নলতা হাসপাতাল পরিদর্শনে আরও ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে। সরকারি অনুদানে ওষুধ কেনাকাটা কমিটির স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় ওই প্রতিষ্ঠানের সরকারি অনুদান স্থগিত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কীভাবে আইনসম্মতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে সে বিষয়ে নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
লাইফ কেয়ার হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক সাইটে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, কনসালটেন্ট ও বৈধ কাগজপত্রের চরম ঘাটতি পাওয়া যায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—গত তিন বছর ধরে লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই ডায়াগনস্টিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল। দীর্ঘদিন ধরে রোগীদের ভুল রিপোর্ট ও অনিয়মের অভিযোগ থাকায় ডায়াগনস্টিক সাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রাম্য ডাক্তার ও দালালদের মাধ্যমে রোগী ভাগাভাগির মাধ্যমে বিশেষ করে ডেলিভারি রোগীদের কাছ থেকে ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। চিকিৎসার নামে চলে গলাকাটা বাণিজ্য, যেখানে রোগীর নিরাপত্তা ছিল চরম ঝুঁকিতে।
সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ক্লিনিক চালাতে হলে আইন মেনেই চালাতে হবে। লিগ্যাল কাগজপত্র, লাইসেন্স ও জনবল ছাড়া কোনোভাবেই ব্যবসা করা যাবে না। আমি কালিগঞ্জের ইউএনও মহোদয়কে ফোন করে বলেছি-যেসব ক্লিনিকের কাগজপত্র ও অবকাঠামো নেই, সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে বন্ধ করে দিতে।” তিনি আরও বলেন, এই অভিযান এখানেই শেষ নয়—পুনরায় কালিগঞ্জে অভিযান চালিয়ে সকল অভিযুক্ত ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ২০১০ অনুযায়ী-ধারা ৪: নিবন্ধন ও অনুমোদন ছাড়া ক্লিনিক পরিচালনা সম্পূর্ণ অবৈধ, ধারা ৬: নির্ধারিত সময়ে লাইসেন্স নবায়ন বাধ্যতামূলক, ধারা ১২: অবৈধভাবে ক্লিনিক পরিচালনায় অর্থদণ্ড, লাইসেন্স বাতিল ও সিলগালার বিধান রয়েছে। এছাড়া ভুল চিকিৎসা ও ভুয়া রিপোর্টের অভিযোগ দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ধারা ৩০৪ক, ৪২০, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮, ভ্যাট আইন ২০১২ ও আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
কালিগঞ্জবাসীর দাবি- এসব অনিয়মে অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার তাৎক্ষণিক সিলগালা, মালিক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, দায়িত্বে অবহেলাকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, নিয়মিত মনিটরিং ও লাইসেন্স নবায়নে জিরো টলারেন্স নীতি বহাল করতে হবে।
এখন প্রশ্ন একটাই, এতদিন প্রশাসনের চোখের আড়ালে কীভাবে চলছিল এই অবৈধ চিকিৎসা বাণিজ্য? কালিগঞ্জের মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এবার কি স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে-নাকি কিছুদিন পর আবারও সব আগের মতো চলবে? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন অপেক্ষমাণ কালিগঞ্জবাসী।









