কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি :
যথাযথ মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আগামী ২০ নভেম্বর ‘কালিগঞ্জ মুক্ত দিবস’ উদযাপনের প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কালিগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে আয়োজিত এই প্রস্তুতি সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তানিয়া আক্তার।
২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দুপুরে সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন কালিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহিনুর রহমান। এছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ, আব্দুল গফফার, শেখ হাবিবুর রহমান, মোঃ গোলাম রসুল, নূরুল ইসলাম, শেখ ওজিয়ার রহমান, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সঞ্জিব কুমার ঘোষ শেখ সিরাজুল ইসলাম সহ এলাকার বিশিষ্ট বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ। সভায় দিবসটি উদ্যাপনের বিভিন্ন কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয় এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও বীরত্বগাথা ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।
উল্লেখ্য ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সাতক্ষীরা জেলা ছিল ঐতিহাসিক ৮ ও ৯ নম্বর সেক্টরের অধীন। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই সাতক্ষীরার ভোমরা ও কালিগঞ্জ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল প্রতিরোধ ক্যাম্প ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পথ বেয়ে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর শান্ত সুশীতল কালিগঞ্জও উত্তাল হয়ে ওঠে। ৮ মার্চ কালিগঞ্জ ডাকবাংলা চত্বরে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দিয়ে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট ‘কালিগঞ্জ সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও জনতা একাত্তরের মে মাসের মধ্যে দেশমাতৃকার টানে ভারতে হিংগলগঞ্জ, বিহারের চাকুলিয়া ও টাকীসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন।
কালিগঞ্জের মাটি পাক হানাদার মুক্ত করতে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন স্থানে খণ্ডযুদ্ধ ও ঐতিহাসিক অপারেশন পরিচালনা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা হলো:
১৩ জুন ১৯৭১: সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নূরুল হুদার নেতৃত্বে ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা বসন্তপুর পাকসেনা ক্যাম্পে আক্রমণ চালালে ২০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়।
৩০ আগস্ট ১৯৭১: উকসা-গোবিন্দপুরে ৯ ঘণ্টাব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মাইন বিস্ফোরণে ৮ জন পাক সেনা নিহত হয়, যা স্থানীয়ভাবে ‘উকসার মরণ ফাঁদ’ নামে পরিচিত।
২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭১: সাব-সেক্টর কমান্ডার লে. মাহফুজ আলম বেগ ও কমান্ডার শেখ ওয়াহিদুজ্জামানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা কালিগঞ্জ রাজাকার ক্যাম্পকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন এবং একই দিনে তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান (বর্তমান সোনালী ব্যাংক) থেকে অপারেশন করে অস্ত্র হস্তগত করেন।
১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর ভোর ৫টায় কালিগঞ্জ ওয়াপদা কলোনিতে অবস্থানরত পাকিস্তানি রেঞ্জার ও রাজাকার বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালান মুক্তিযোদ্ধারা। টানা দুই ঘণ্টার তুমুল যুদ্ধের পর পাক বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং ৪০ জন পাকিস্তানি সেনা মুক্তিবাহিনীর হাতে বন্দী হন। লে. আহসানউল্লাহ ২২ জন এবং নায়েক সুবেদার গফুর ৬ জন সেনাকে আটক করেন। বাকি সেনারা কালিগঞ্জ ছেড়ে পালিয়ে সাতক্ষীরার আলিপুর ও পুষ্পকাটি নামক স্থানে শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করে।
শত্রুমুক্ত হওয়ার এই আনন্দ সংবাদ মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে কালিগঞ্জের গ্রামে গ্রামে। কালিগঞ্জের ডাকবাংলা চত্বরের বকুলতলায় উত্তোলিত হয় স্বাধীন বাংলার লাল-সবুজ পতাকা। বিজয়ের সেই আনন্দাশ্রু আর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ কালিগঞ্জবাসীর হৃদয়ে আজও চিরস্মরণীয় ও চিরগৌরবোজ্জ্বল হয়ে আছে। প্রতিবছর এই দিনটি কালিগঞ্জ মুক্ত দিবস হিসেবে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়ে আসছে।