কালিগঞ্জে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাঁদাবাজি ও প্রতারণার রাজত্ব কায়েমকারী আব্দুল করিম এখন কারাগারে

মোঃ ইশারাত আলী : 

“এত খারাপ জানতাম না!”-সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ থানা চত্বরে পুলিশভ্যানে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে এক অভিযুক্তের নগ্ন ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দেখে খোদ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের মুখ থেকেও অজান্তেই বেরিয়ে আসে এই যুগপৎ বিস্ময় ও ধিক্কারসূচক মন্তব্য। রাজনৈতিক সাইনবোর্ড ব্যবহার করে যিনি দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছিলেন, একের পর এক মিথ্যে মামলা, চাঁদাবাজি এবং বসতভিটা থেকে উচ্ছেদের হুমকি দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন-সেই আব্দুল করিম গাইনের আসল রূপ এখন উন্মোচিত। শেষরক্ষা হয়নি তাঁর; নড়াইল পুলিশের জালে ধরা পড়ে শেষ পর্যন্ত আদালতের মাধ্যমে তাকে পাড়ি জমাতে হয়েছে অন্ধকার কারাগারে।

গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই ভয়ঙ্কর তথ্যচিত্র তুলে ধরেন রতনপুর বাজারের মা হোমিও হলের স্বত্বাধিকারী ও স্থানীয় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ডা. মোজাফফর হোসেনসহ একদল ভুক্তভোগী মানুষ।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ডা. মোজাফফর হোসেন অভিযোগ করেন, কালিগঞ্জ উপজেলার ধলবাড়িয়া ইউনিয়নের গান্দুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা আশরাফ হোসেনের ছেলে আব্দুল করিম গাইন এবং তাঁর ভাই আব্দুল হামিদ গাইন মিলে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র গড়ে তুলেছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচয়ের পেশিশক্তি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায় করতেন। দাবিকৃত চাঁদা বা অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালেই নেমে আসত মিথ্যা মামলা, হামলা ও পুলিশি হয়রানির খড়্গ। এই চক্রের ভয়ে গোটা এলাকায় এক ধরনের আতঙ্কজনক পরিবেশ বিরাজ করছে। 

সংবাদ সম্মেলনে সুনির্দিষ্ট কিছু দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরেন ভুক্তভোগীরা। ডা. মোজাফফর হোসেন জানান, এলাকায় বিভিন্ন বিরোধ ও মামলা আপস-মীমাংসার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়াই ছিল করিমের মূল পেশা। উদাহরণস্বরূপ-মশিউর রহমান নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে শুধু মীমাংসার নাম করেই নগদ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

শুধু দেশেই নয়, বিদেশে লোক পাঠানো, ভিসা প্রসেসিং, পাসপোর্ট ও বিমান টিকিট বুকিংয়ের লোভ দেখিয়ে এলাকার নিরীহ বেকার যুবকদের কাছ থেকেও লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে এই চক্র। সংবাদ সম্মেলনে এসব অবৈধ আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং নথিপত্র নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার জোরালো দাবি জানানো হয়।

সাধারণ মানুষের ওপর চলা এই নিপীড়নের পরিধি কতটা বিস্তৃত ছিল, তার প্রমাণ মেলে আব্দুল করিমের বিরুদ্ধে থাকা মামলার তালিকা থেকে। সংবাদ সম্মেলনে তাঁর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন অন্তত ছয়টি চাঞ্চল্যকর মামলার বিবরণ তুলে ধরা হয়। মামলাগুলোর ভয়ংকর ফিরিস্তি নিচে তুলে ধরা হলো: ১. সাতক্ষীরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল: মামলা নং ১৭০/২৫ ২. মানিকগঞ্জ আমলি আদালত: সিআর মামলা নং ৪৮০/২৫ ৩. নড়াইল কালিয়া আমলি আদালত: সিআর মামলা নং ২০/২৬ ৪. নড়াইল লোহাগড়া থানা: জিআর মামলা নং ১৬১/২৬ ৫. সাতক্ষীরা আদালত: সিআর মামলা নং ৭৩৫/২৬ ৬. গোপালগঞ্জ আমলি আদালত: সিআর মামলা নং ৫৪০/২৬ সহ আরও কয়েকটিমামলা।

একাধিক জেলায় এতগুলো মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল এবং সাধারণ মানুষকে হেনস্তা করছিল-তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। এসব মামলার নেপথ্যের কুশীলবদের খুঁজে বের করতে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানান ভুক্তভোগীরা।

অপরাধের মাত্রা এতই চূড়ায় পৌঁছেছিল যে শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাওয়া যায়নি। গত রবিবার চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট একটি মামলায় নড়াইল থানা পুলিশ কুখ্যাত আব্দুল করিমকে আটক করে। পরবর্তীতে তাকে কালিগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বেলা ১২টার দিকে তাকে কড়া পুলিশি পাহারায় আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

তবে মূল নাটকীয়তা তৈরি হয় ঠিক ওই মুহূর্তেই। থানা চত্বরে যখন তাকে পুলিশভ্যানে তোলার প্রস্তুতি চলছিল, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই নিজের খাসলত প্রকাশ করে বসে করিম। পুলিশের উপস্থিতির তোয়াক্কা না করে সে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে এবং চরম ঔদ্ধত্য দেখায়। একজন আসামির এমন বেপরোয়া ও অপরাধীসুলভ আচরণ দেখে উপস্থিত পুলিশ সদস্য ও উৎসুক জনতাও হতবাক হয়ে যান। কর্তব্যরত এক পুলিশ কর্মকর্তা বিরক্তি প্রকাশ করে বলেই ফেলেন- “এত খারাপ জানতাম না!”

সংবাদ সম্মেলনে ডা. মোজাফফর হোসেন ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন শাহিনুর রহমান, ফরিদ হোসেন, মশিউর রহমান, সুমন গাইন, মারুফ হোসেন, কাশেম গাইন, আরিফুল ইসলাম, সিরাজ ও সোহরাব হোসেনসহ এলাকার অর্ধশত ভুক্তভোগী।

তাঁরা স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, এই লড়াই কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নয়; বরং এলাকার শান্তি, শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লড়াই। এলাকার সাধারণ মানুষ যাতে আর কখনো কোনো রাজনৈতিক দুর্বৃত্তের ভয়ভীতি ও মিথ্যা মামলার শিকার না হন, প্রশাসন যেন সেই সুরক্ষাবলয় নিশ্চিত করে।

আব্দুল করিমের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেনের হিসেব এবং তার সহযোগীদের মুখোশ উন্মোচন করে দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই ধরনের অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন এলাকাবাসী। এখন দেখার বিষয়, আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে এই প্রতারক চক্রের মূল উৎপাটন কত দ্রুত সম্পন্ন হয়।