মোঃ ইশারাত আলী :

সদ্য বিদায়ী মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন আজ, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে তার পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। রাজধানী ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকায় হাতে অস্ত্র নিয়ে একটি মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।

তার পদত্যাগের মূল ঘটনাবলী নিচে তুলে ধরা হলো:

বিতর্কের সূত্রপাত: গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন তার নির্বাচনী এলাকা গেন্ডারিয়ায় অনুসারীদের নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে নামেন। সেখানে তাকে এবং তার সঙ্গীদের প্রকাশ্য অস্ত্র হাতে দেখা যায়, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ও পদত্যাগ: উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে সোমবার দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। [1, 2, 3]

ইশরাকের বক্তব্য: সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, দল ও সরকারকে কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে না ফেলতেই তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে পদ ছাড়লেও একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে তার মাদকবিরোধী ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান অব্যাহত রাখবেন বলে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি দল চাইলে তিনি আগামীতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন করতেও নিজের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।

তবে :

মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয় নয়, এটি একটি প্রজন্মকে রক্ষা করার অঙ্গীকার। মাদকাসক্তি যখন পরিবার ভাঙে, তরুণদের কর্মক্ষমতা নষ্ট করে, অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায় এবং সমাজের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে, তখন এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রের দায়িত্বও হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন সচেতনতা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা।

এই বাস্তবতায় সদ্য বিদায়ী প্রতিমন্ত্রীর মাদকবিরোধী উদ্যোগ ও ভূমিকা মূল্যায়নের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে কাউকে মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করতে হলে তাঁর বক্তব্যের চেয়ে কাজের প্রমাণ, উদ্যোগের ধারাবাহিকতা এবং অর্জনের বাস্তব চিত্রকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

মাদকবিরোধী লড়াই শুধু অভিযান নয়-

মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান প্রয়োজন। কিন্তু অভিযান পরিচালনা করলেই মাদক সমস্যার সমাধান হয় না। একজন মাদকাসক্ত তরুণকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে দূরে সরিয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু তাঁকে চিকিৎসার আওতায় এনে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন।

একটি কার্যকর মাদকবিরোধী নীতিতে তাই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, মাদক সরবরাহ ও পাচারের পথ বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, তরুণদের এমন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া, যেখানে মাদকের প্রতি আকর্ষণ কমে আসে।

প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে যদি এসব ক্ষেত্রে বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেগুলোর মূল্যায়ন হওয়া উচিত তথ্য ও ফলাফলের ভিত্তিতে। কতটি অভিযান হয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, কতটি মাদক নিরাময়কেন্দ্র কার্যকরভাবে কাজ করছে, কতজন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ জীবনে ফিরেছেন, এসব প্রশ্নের উত্তরই একটি উদ্যোগের কার্যকারিতা বুঝতে সাহায্য করবে।

প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে আইন কতটা নিরপেক্ষ?

মাদকবিরোধী লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ের একজন মাদক বহনকারী বা বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মাদক ব্যবসার পেছনে অর্থ, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা সংগঠিত নেটওয়ার্কের ভূমিকা থাকলে সেখানে তদন্ত কতটা এগোয়, সেটিই জনআস্থার মূল প্রশ্ন।

মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের সাফল্য তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হবে, অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে দায়মুক্তি দেবে না।

এখানে সদ্য বিদায়ী প্রতিমন্ত্রীর ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য। তাঁর সময়ে মাদকবিরোধী কার্যক্রম কি সব শ্রেণির মানুষের জন্য সমানভাবে কার্যকর ছিল? কোনো অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের আওতায় এসেছে কি? সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জবাবদিহির মধ্যে আনা হয়েছে কি? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ব্যক্তিগত প্রশংসা কিংবা সমালোচনা, কোনোটিই পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হতে পারে না।

বিদায়ের পরও যে দায়িত্ব শেষ হয় না-

একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বকাল শেষ হতে পারে, কিন্তু তাঁর নেওয়া নীতি, গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান এবং জনস্বার্থে শুরু করা কার্যক্রমের প্রভাব থেকে যায়। তাই সদ্য বিদায়ী প্রতিমন্ত্রীর মাদকবিরোধী ভূমিকা নিয়ে আলোচনার সময় তাঁর উত্তরসূরিদের জন্য কী রেখে যাওয়া হয়েছে, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

যদি কোনো কার্যকর উদ্যোগ চালু হয়ে থাকে, তবে তা যেন ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল না থাকে। মাদক নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমকে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষ করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মাদকাসক্ত তরুণদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। পরিবারগুলো অনেক সময় সামাজিক লজ্জা ও ভয়ের কারণে মাদকাসক্ত সদস্যকে চিকিৎসার জন্য সামনে আনতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো, গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং সহজলভ্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

দৃষ্টান্তের স্বীকৃতি আসুক কাজের ভিত্তিতে-

মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার মিশনে একজন সদ্য বিদায়ী প্রতিমন্ত্রী অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কি না, তা নির্ধারণের জন্য আবেগ নয়, প্রয়োজন বাস্তব তথ্য। তাঁর সময়ে মাদক নিয়ন্ত্রণে কী পরিবর্তন এসেছে, কোন উদ্যোগগুলো দীর্ঘমেয়াদি সুফল দিয়েছে, কোথায় ব্যর্থতা ছিল এবং ভবিষ্যতের জন্য কী সুপারিশ রেখে গেছেন, এসব বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন।

সত্যিকারের দৃষ্টান্ত শুধু সফলতার গল্পে তৈরি হয় না। ব্যর্থতা স্বীকার করা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং অসমাপ্ত কাজের জন্য পরবর্তী কর্তৃপক্ষকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়াও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লড়াই কোনো একক মন্ত্রী, সরকার কিংবা রাজনৈতিক দলের একার নয়। এটি রাষ্ট্রের ধারাবাহিক দায়িত্ব এবং সমাজের সম্মিলিত অঙ্গীকার। সদ্য বিদায়ী প্রতিমন্ত্রীর উদ্যোগ যদি এই লড়াইয়ে কার্যকর পরিবর্তন এনে থাকে, তবে তার যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। আর যদি কোথাও ঘাটতি থেকে থাকে, তবে তা চিহ্নিত করাও সমান জরুরি।

কারণ, মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রকৃত দৃষ্টান্ত কোনো ব্যক্তির প্রশংসায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সার্থকতা তখনই, যখন মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে আইন কার্যকর হয়, মাদকাসক্ত মানুষ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ পায় এবং দেশের তরুণ প্রজন্ম নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা খুঁজে পায়।