মোঃ ইশারাত আলী :
মাঠে স্টল নির্মাণ, সুদূরদূরান্ত থেকে আনা নার্সারির গাছপালা, কসমেটিকসসহ বিভিন্ন দোকানপাট এবং ব্যবসায়ীদের বিশাল বিনিয়োগ-সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের চাঁচাই ফুটবল মাঠে আয়োজিত ১০ দিনব্যাপী বৃক্ষমেলার উদ্বোধন ঘিরে তৈরি হয়েছিল নজিরবিহীন অনিশ্চয়তা। মেলার প্রশাসনিক অনুমোদন নিয়ে চরম প্রশ্ন ওঠায় এবং শেষ মুহূর্তে উদ্বোধক বদলের খেলায় দিশেহারা ব্যবসায়ীরা শেষ পর্যন্ত বড়সড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। মাঠের লাখ লাখ টাকার বিনিয়োগ আর ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন একটাই-অনুমোদন নিশ্চিত না করে এই খামখেয়ালি আয়োজন আর লোকসানের দায় এখন কে নেবে?
চাঁচাই সবুজ সংঘের আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য এই মেলার উদ্বোধক হিসেবে সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মুহাঃ রবিউল বাশারের নাম নির্ধারিত থাকলেও তিনি সময় দিতে পারেননি। পরবর্তীতে সাবেক এমপি ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী আলাউদ্দীন মেলার উদ্বোধনের ঘোষণা দিলে কিছুটা স্বস্তি ফেরার কথা থাকলেও, নেপথ্যের প্রশাসনিক অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হয়। এর আড়ালেই গোপনে বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন ও পকেট ভারী করার রমরমা তথ্য ফাঁস হতে শুরু করে।
আয়োজক কমিটির সভাপতি মো. রেজাউল করিম মুখে মেলার অনুমোদন রয়েছে বলে দাবি করলেও মাঠপর্যায়ে এর বৈধ কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। উল্টো একটি গোপন আঁতাতের মাধ্যমে মেলা চালানোর নানা ফন্দিফিকির ও মনগড়া খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মেলা শুরুর আগে প্রশাসন থেকে বাধ্যতামূলক ছাড়পত্র বা অনুমতি নিশ্চিত করার প্রাথমিক দায়িত্ব আয়োজকদের হলেও, সেই আইন ও নিয়মের তোয়াক্কা না করে তড়িঘড়ি করে মাঠ সাজানো হয়। যার প্রত্যক্ষ খড়্গ গিয়ে পড়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্থানীয়ভাবে একটি মোটর গ্যারেজের ১০ দিনের পুরো মূল্য ২ লাখ টাকা আবার জমির মাপকাঠিতে যেখানে ভাড়া ২৫ হাজার টাকা, সেখানে মাঠজুড়ে শত শত স্টল বসিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে লাখ লাখ টাকা! গ্যারেজ বা সাধারণ জায়গার ভাড়ার সাথে স্টল প্রতি আদায় করা অংকের এই আকাশ-পাতাল ব্যবধান ও বিশাল অঙ্কের টাকার হিসাব নিয়ে তীব্র কানাঘুষা চলছে ব্যবসায়ী মহলে। কোন নিয়মে, কার ইন্ধনে এবং কোন অদৃশ্য চুক্তিতে এই হরিলুট চলল—তার কোনো সদুত্তর বা শ্বেতপত্র প্রকাশ করেনি আয়োজক কমিটি।

মেলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন নার্সারি মালিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানিরা অগ্রিম স্টল ভাড়া পরিশোধ করে এবং ঋণ বা তিল তিল করে জমানো পুঁজি বিনিয়োগ করে মালামাল তুলেছিলেন। কিন্তু উদ্বোধনের ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা ও মেলা বন্ধের উপক্রমে তারা চরম আর্থিক ক্ষতির শিকার হন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা এসব ব্যবসায়ী কমিটির আশ্বাসের ফাঁদে পড়ে আজ পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত। অথচ মেলা স্থগিত বা বাতিল হলে সেই আর্থিক ক্ষতি বা বিনিয়োগের টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা বা নীতিমালা আয়োজকদের পক্ষ থেকে ছিল না।
স্থানীয়দের একাংশের জোরালো অভিযোগ, মেলা আয়োজনের আড়ালে স্টল বরাদ্দ, জামানত বা বিভিন্ন ভুয়া খাতের নামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির মতো মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে। যদি বৈধ লেনদেন হয়ে থাকে, তবে তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা আয়োজকদের নৈতিক দায়িত্ব। তা না হলে রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে সাধারণ ব্যবসায়ীদের পকেট কাটার এই সিন্ডিকেট অপরাধ হিসেবেই ইতিহাসে খোদিত হবে।
শেষ পর্যন্ত গত ৩ অক্টোবর সাবেক এমপি কাজী আলাউদ্দীনের উপস্থিতিতে মেলার লোক দেখানো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হলেও, চাঁচাই বৃক্ষমেলা স্থানীয় অর্থনীতিতে একটি কালো দাগ রেখে গেছে। ফিতা কাটা বা রাজনৈতিক শোডাউনের চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে মাঠের সাধারণ ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা। অনুমোদন ও আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা ছাড়া এ ধরনের অপরিকল্পিত আয়োজন ভবিষ্যতে গ্রামীণ অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে-এটাই এখন কালিগঞ্জের সচেতন মহলের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।