মোঃ ইশারাত আলী :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক ছাত্রীর বাল্যবিয়েতে খোদ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে ৩২ জন ছাত্রীর অংশ নেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সরকারের কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা ও প্রশাসনের জিরো টলারেন্স নীতি থাকলেও, দায়িত্বশীল শিক্ষকদের এমন প্রত্যক্ষ প্রশ্রয় ও নিষ্ক্রিয়তা এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ৩২ জন ছাত্রী ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে তাদের এক সহপাঠীর বাল্যবিয়ে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যায়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দীনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ছাত্রীরা বিয়ের অনুষ্ঠানে গেছে।” বিয়েটি বাল্যবিয়ে কি না এবং ছাত্রীর বয়স আইনি সীমার নিচে কি না-এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি স্বীকার করেন যে মেয়েটি তাদের স্কুলের দশম শ্রেণিতে পড়ে।
আইনি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, “না, আমরা কোনো পদক্ষেপ নিইনি।” তবে এই বিয়েতে বিদ্যালয়ের কোনো সহযোগিতা বা সম্মতি রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি জানান যে দুজন ছাত্রী স্কুলে এসে ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিল।
অন্যদিকে, বিদ্যালয়ের কম্পিউটার শিক্ষক রওশনারা খাতুনের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিয়ে হচ্ছে আমরা শুনেছি।” অথচ বাল্যবিয়ে প্রতিরোধসংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এ ধরনের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরকে জানানোর কথা থাকলেও তারা তা জানাননি। এ বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, “আমরা কাউকে ইনফরমেশন করিনি।”

এদিকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতার মধ্যেই বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। তাৎক্ষণিকভাবে কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানিয়া আক্তার,
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা অর্না চক্রবর্তী, থানা পুলিশ এবং আনসার সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বাল্যবিয়েটি তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মেয়ের বাবার কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয় এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় স্থানীয় কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
পরবর্তীতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জবাবদিহিতার মুখে পড়েন অভিযুক্ত শিক্ষকরা। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দিন বলেন, “যেহেতু শিক্ষা অফিসার আমাদের ডেকেছেন এবং ইউএনও মহোদয় বিষয়টি অবহিত হয়েছেন, এই কারণে আমাদের কিছু বলার নেই। ওনারা যে পদক্ষেপ নেন আমরা তা মেনে নেব।”
উপজেলা শিক্ষা অফিসার জয়নাল আবেদীন বলেন, “শিক্ষকদের নিয়ে ইউএনও মহোদয়ের সাথে আমরা বসেছি। ইউএনও মহোদয় লিখিত জবাব দিতে বলেছেন, তাঁরা লিখিত জবাব দেবেন।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও দায়িত্বশীল শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বাল্যবিয়েতে শিক্ষার্থীদের যাওয়ার অনুমতি দেওয়া এবং প্রশাসনকে তথ্য না জানানো আইনগত অপরাধ ও চরম দায়িত্বহীনতা। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কার্যক্রমকে ফলপ্রসূ করতে এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
