সাতক্ষীরা কালিগঞ্জ উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অথচ ঢুকতেই কাদাপানি। শ্রেণিকক্ষে চলছে পাঠদান, কিন্তু ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল। প্রায় ১৬০ কোমলমতি শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়টির নাম ১০৩ নম্বর কালিগঞ্জ সদর এম খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বছরের পর বছর অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও দুর্ভোগের পথ নিয়েই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।

উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মিত হলেও সদর এম খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেন উন্নয়নের তালিকার বাইরে। স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত সংকটের সমাধান না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।

গত ২৭ আগস্ট দুপুরে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটক থেকে ভেতরে যাওয়ার পথটি কাদামাটিতে পরিণত হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই পথটি কাদাপানি ও জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়। ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাদা-পানি মাড়িয়েই বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে হচ্ছে।

শুধু যাতায়াত পথ নয়, বিদ্যালয়ের ভবন নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা গেছে। স্থানীয় অভিভাবকদের আশঙ্কা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ভালো শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক কক্ষ ও লাইব্রেরিরও সুব্যবস্থা নেই।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আরিজুল ইসলাম বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ের জমি মাত্র পাঁচ শতাংশ। এ কারণে বারবার বাজেট এসে ফিরে যায়।” সহকারী শিক্ষক হাসিব মেহেদী হাসান বলেন, “নতুন ভবন নির্মাণের জন্য কয়েকবার বাজেট এসেছিল। পরবর্তীতে তা বাতিল হয়ে গেছে। কী কারণে বাতিল হয়েছে, তা আমার জানা নেই।”

প্রধান শিক্ষক গঙ্গা সরকার বলেন, “আমাদের জায়গা অল্প। চলাচলের পথের জন্য আলাদা জায়গা কোথায় পাব? কালিগঞ্জ পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের মাঠের পাশ দিয়ে রাস্তা করতে গেলে তারা জায়গা দিতে চান না। তবে কোনো না কোনোভাবে চলাচলের পথের ব্যবস্থা করা যায়। এজন্য চেষ্টা করতে হবে।”

তবে প্রশ্ন উঠেছে, মাত্র পাঁচ শতাংশ জমির মধ্যে নতুন ভবন নির্মাণের উপায় কি একেবারেই নেই? প্রয়োজন হলে নকশা ও পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে কিংবা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয়ে কি এই সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়? উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে থাকা একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বছরের পর বছর জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকবে কেন, সেই প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের।

সদর এম খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কালিগঞ্জ পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় একই বাউন্ডারির মধ্যে অবস্থিত। তাই শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচলের পথ নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় অভিভাবকরা।

কালিগঞ্জ পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্র বাঁচাড় বলেন, “সদর এম খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জায়গা খুবই সীমিত। তারা আমাদের স্কুলের পথ দিয়ে চলাচলের পথ করলে মাঠের জায়গা কমে যাবে। তাছাড়া আমাদের একটি পুরাতন ভবন রয়েছে। সেটি বরাদ্দ হলে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ হতে পারে। এ কারণে স্থায়ী সড়ক করতে দেওয়া সম্ভব হবে না। তবে অস্থায়ীভাবে ইট সোলিং করলে অসুবিধা হবে না। আপাতত মাঠের দক্ষিণ পাশ দিয়ে চলাচল করলে আমাদেরও কোনো আপত্তি নেই।”

স্থানীয়দের মতে, দুই প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর বসে দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করলে অন্তত শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করা সম্ভব।

জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রধান শিক্ষকসহ মোট ছয়জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। তারা হলেন প্রধান শিক্ষক গঙ্গা সরকার, সিনিয়র সহকারী শিক্ষক শেখ সিরাজুল ইসলাম, হাসিব মেহেদী হাসান, সুজন দত্ত, আরিজুল ইসলাম ও নাজমুন নাহার। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুরবস্থার কারণে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের পার্শ্ববর্তী অন্যান্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করছেন। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধরে রাখা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিদ্যালয়ের দুরবস্থার বিষয়ে কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন সাহা বলেন, বর্তমান যুগে কালিগঞ্জ সদরে এমন জরাজীর্ণ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে, এটি আমার জানা ছিল না। বিষয়টি এই প্রথম শুনলাম। আমি দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করব। এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কালিগঞ্জ উপজেলা সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দীপক কুমার বিশ্বাস বলেন, “বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এ বিষয়ে আমার জানা ছিল না। আমি জরুরি ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষককে ডেকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখব এবং দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব।”

স্থানীয় অভিভাবকদের দাবি, একটি বিদ্যালয়ের জন্য নিরাপদ ভবন ও চলাচলের উপযোগী রাস্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মৌলিক নিরাপত্তার বিষয়। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান আর বৃষ্টিতে কাদাপানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াতের এই বাস্তবতা দ্রুত বদলানো দরকার।

তাদের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার অথবা নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের চলাচলের জন্য স্থায়ী বা কার্যকর একটি পথের ব্যবস্থা করা হোক। উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে থাকা সরকারি বিদ্যালয়টির উন্নয়ন নিয়ে এখন স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই—আর কতদিন অপেক্ষা করবে ১৬০ কোমলমতি শিক্ষার্থী? নতুন ভবন ও নিরাপদ পথ কি এবার হবে?