রাশুয়া থেকে সরাসরি তেঁতুলিয়ার দুরত্ব ৫৭০-৬০০ কিলোমিটার। রাশুয়ার বণ্যার পানি বাংলাদেশে আসার নদীপথ নেই। তবে হিমালয়ের একাধিক নদীতে একযোগে প্রবাহ বাড়লে এবং আকাশ বন্যা হলে উত্তরাঞ্চলে বাড়তে পারে বন্যার ঝুঁকি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্কজনক নানা দাবি। বলা হচ্ছে, নেপালের রাশুয়ায় ভয়াবহ বন্যা ও জলাধার ভেঙে পড়ার পানি ভারতের মাত্র ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত ‘চিকেন নেক’ অতিক্রম করে সরাসরি বাংলাদেশের তেঁতুলিয়ায় ঢুকে পড়তে পারে। এমনকি এই পানির ঢলে উত্তরাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কার কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু নদীর গতিপথ, ভৌগোলিক অবস্থান ও পানি প্রবাহের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
রাশুয়ার বন্যার পানি সরাসরি তেঁতুলিয়ায় ঢোকার কোনো স্বাভাবিক নদীপথ নেই। রাশুয়া থেকে নেমে আসা প্রধান প্রবাহ নদী ভোতে এরপর কোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদী হয়ে গণ্ডক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে এবং পরে গঙ্গার দিকে যায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের তেঁতুলিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রধান নদী ব্যবস্থা হলো মহানন্দা-মেচি। তিস্তা নদীর প্রবাহও পৃথক। ফলে ‘রাশুয়ার পানি চিকেন নেক পেরিয়ে সরাসরি তেঁতুলিয়ায় ঢুকছে’ বা উত্তর বঙ্গে ঢুকছে এমন দাবি বাস্তব নদীপথের সঙ্গে মেলে না।
রাশুয়ার পানি আসলে কোন পথে?
রাশুয়ার ভয়াবহ বন্যার পানি যে নদী ব্যবস্থায় নেমে গেছে, তার প্রধান প্রবাহপথকে মোটামুটি এভাবে দেখানো যায়:
রাশুয়া → লহেন্দে খোলা → ভোতে কোশি → ত্রিশূলী → নারায়ণী → গণ্ডক → গঙ্গা → বঙ্গোপসাগর
এই পানি প্রবাহপথ তেঁতুলিয়ার দিকে যায় না।
অর্থাৎ রাশুয়ার পাহাড়ি এলাকায় কোনো বাঁধ, প্রাকৃতিক জলাধার বা নদীর বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি নেমে এলেও সেই পানি স্বাভাবিকভাবে নির্ধারিত নদী অববাহিকা অনুসরণ করবে। শুধু ভারতের শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেন নেক’ কাছাকাছি থাকার কারণে পানি এক নদী অববাহিকা থেকে অন্য নদী অববাহিকায় চলে যাবে না।
তাহলে তেঁতুলিয়ার পানি কোথা থেকে আসে?
তেঁতুলিয়ার বন্যা পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখতে হবে মহানন্দা ও মেচি নদী ব্যবস্থাকে।
একটি সম্ভাব্য প্রবাহপথ হলো:
নেপালের পূর্বাঞ্চল → মেচি নদী → ভারতের উত্তরবঙ্গ → মহানন্দা নদী → তেঁতুলিয়া → বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল
এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেচি ও মহানন্দা নদী ব্যবস্থা নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হলেও এটিকে রাশুয়ার ভোতে কোশি-ত্রিশূলী-নারায়ণী প্রবাহের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
‘চিকেন নেক’ নিয়ে যত বিভ্রান্তি
শিলিগুড়ি করিডর, যাকে প্রচলিতভাবে ‘Chicken’s Neck’ বলা হয়, কোনো নদী বা জলপ্রবাহের পথ নয়। এটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের একটি সরু স্থলভাগ।
ফলে ‘২২ কিলোমিটার চিকেন নেক’কে এমন একটি জায়গা হিসেবে উপস্থাপন করা যে, সেখানে রাশুয়ার পানি কোনোভাবে বাধা পেরিয়ে তেঁতুলিয়ায় ঢুকে যাবে, তা ভূগোলগতভাবে বিভ্রান্তিকর।
পানি রাজনৈতিক সীমান্ত দেখে পথ বদলায় না, আবার ইচ্ছামতো এক নদী অববাহিকা থেকে অন্য অববাহিকায়ও চলে যায় না। পানি চলে ভূমির ঢাল ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহপথ অনুসরণ করে।
তবে কি বাংলাদেশের কোনো ঝুঁকি নেই?
এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
রাশুয়ার বন্যার পানি সরাসরি তেঁতুলিয়ায় আসার আশঙ্কা না থাকলেও হিমালয় ও উত্তরবঙ্গজুড়ে একই সময়ে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত হলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যা ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কারণ এই অঞ্চলের সঙ্গে একাধিক আন্তঃসীমান্ত নদী যুক্ত। তিস্তা, মহানন্দা, মেচি, করতোয়া, আত্রাইসহ বিভিন্ন নদীতে উজানের অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি নামলে বাংলাদেশে নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে।
বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকার পরিস্থিতি বাংলাদেশের লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুরসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে মহানন্দা-মেচি ব্যবস্থায় অতিরিক্ত পানি তেঁতুলিয়া ও পঞ্চগড় অঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ ঝুঁকিটা রাশুয়ার পানি সরাসরি তেঁতুলিয়ায় ঢোকার নয়; বরং একই সময়ে বৃহত্তর হিমালয়-উত্তরবঙ্গ অঞ্চলে একাধিক নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার।
গুজব বনাম বাস্তবতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে কথাটি সবচেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে, সেটি হলো:
“রাশুয়ার বাঁধ বা জলাধার ভেঙে ২২ কিলোমিটার চিকেন নেক পেরিয়ে সরাসরি তেঁতুলিয়ায় পানি ঢুকবে।”
এই দাবির সঙ্গে বাস্তব নদীপথের মিল নেই।
রাশুয়ার প্রধান বন্যাপ্রবাহ ভোতে কোশি-ত্রিশূলী-নারায়ণী-গণ্ডক ব্যবস্থার দিকে যায়। তেঁতুলিয়ার জলপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত নদী হলো মেচি-মহানন্দা ব্যবস্থা। আর তিস্তা হচ্ছে আরেকটি স্বতন্ত্র আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থা।
আসল সতর্কতা কোথায়?
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো আতঙ্ক ছড়ানো নয়, বরং উজানের নদীগুলোর পানি পর্যবেক্ষণ করা। হিমালয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টি অব্যাহত থাকলে, একই সময়ে সিকিম, দার্জিলিং, উত্তরবঙ্গ ও নেপালের পূর্বাঞ্চলে নদীর পানি বেড়ে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
তাই তেঁতুলিয়া-পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য নজর রাখা প্রয়োজন:
মহানন্দা → মেচি → তিস্তা → করতোয়া → আত্রাইসহ সংশ্লিষ্ট নদীর পানি পরিস্থিতির দিকে।
শেষ কথা
রাশুয়ার বন্যাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে আতঙ্ক ছড়ানোর আগে নদীর মানচিত্র দেখা জরুরি। রাশুয়ার পানি সরাসরি ‘চিকেন নেক’ পেরিয়ে তেঁতুলিয়ায় ঢোকার কোনো স্বাভাবিক নদীপথ নেই। কিন্তু হিমালয় অঞ্চলে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে একাধিক আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি একযোগে বেড়ে গিয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাই গুজবে আতঙ্ক নয়, নদীর পানি ও সরকারি বন্যা পূর্বাভাসের তথ্যই হোক সতর্কতার ভিত্তি।
নদীপথ এক নজরে
রাশুয়ার প্রবাহ:
রাশুয়া → ভোতে কোশি → ত্রিশূলী → নারায়ণী → গণ্ডক → গঙ্গা
তেঁতুলিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রবাহ:
নেপালের পূর্বাঞ্চল → মেচি → মহানন্দা → তেঁতুলিয়া → বাংলাদেশ
তিস্তা প্রবাহ:
সিকিম → তিস্তা → উত্তরবঙ্গ → বাংলাদেশ → যমুনা → বঙ্গোপসাগর
সুতরাং রাশুয়া থেকে সরাসরি তেঁতুলিয়া নয়, বরং একই বৃহত্তর হিমালয়-উত্তরবঙ্গ অঞ্চলের একাধিক নদীর সম্মিলিত পানি প্রবাহই বাংলাদেশের জন্য বাস্তব পর্যবেক্ষণের বিষয়।