সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে এক সময় বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা ধর্মীয় আয়োজনের সাজসজ্জার কথা উঠলেই সবার আগে উচ্চারিত হতো ‘শুভেচ্ছা ডেকোরেটর’-এর নাম। নব্বইয়ের দশকে ‘রাজকীয় সাজসজ্জায় শুভেচ্ছা ডেকোরেটর আপনার পাশে’ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন গোপী রঞ্জন অধিকারী। সময়ের প্রবাহে বদলেছে বাজার, বেড়েছে ভ্যান ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি, বাঁশ, কাপড় ও বিভিন্ন সরঞ্জামের দাম। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি কাজের ভাড়া, বরং অনেক ক্ষেত্রে কমেছে। ফলে এক সময়ের প্রাণচঞ্চল ও লাভজনক ডেকোরেটর ব্যবসা এখন টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ে। গোপী রঞ্জনের ‘শুভেচ্ছা ডেকোরেটর’-এর মতো বহু প্রতিষ্ঠানই আজ আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

গোপী রঞ্জনের হাত ধরে কিংবা তাকে অনুসরণ করে কালিগঞ্জের বিভিন্ন হাট-বাজার ও মোড়ে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক ডেকোরেটর প্রতিষ্ঠান। কারও ব্যবসা মোটামুটি চললেও অনেকেই টিকে থাকার লড়াইয়ে রয়েছেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একদিকে ভ্যান ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি, বাঁশ, কাপড়, চেয়ার-টেবিলসহ সরঞ্জামের দাম ও অন্যান্য খরচ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। অন্যদিকে কাজ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় কম দামে কাজ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ায় ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ফলে সংকট শুধু ব্যবসার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে ব্যবসায়ীদের পারিবারিক জীবনেও। অনেকেই জানান, আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য না থাকায় সন্তানদের পড়াশোনা, সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে কালিগঞ্জের ডেকোরেটর ব্যবসায়ীরা এখন ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের সমস্যা চিহ্নিত করা, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা কমানো এবং জেলা সমিতির নির্ধারিত রেটের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করার লক্ষ্যে সাতক্ষীরা জেলা ডেকোরেটর মালিক কল্যাণ সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।

সোমবার (১৭ আগস্ট) বেলা ১১টায় কালিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম হলরুমে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সাতক্ষীরা জেলা ডেকোরেটর মালিক কল্যাণ সমিতির কর্মকর্তাদের কালিগঞ্জে আগমন উপলক্ষে আয়োজিত সভায় জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের ডেকোরেটর ব্যবসায়ীরা অংশ নেন।

কালিগঞ্জ ডেকোরেটর মালিক সমিতির সভাপতি গোপীরঞ্জন অধিকারীর সভাপতিত্বে সভাটি সঞ্চালনা করেন কালিগঞ্জ প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার সভাপতি এম. হাফিজুর রহমান শিমুল।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সাতক্ষীরা জেলা ডেকোরেটর মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. হেদায়েতুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান কামু, সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান বুলি, মহিলা সম্পাদিকা তামান্না তাসলিমা, কোষাধ্যক্ষ ইমরান হোসেন, দপ্তর সম্পাদক শেখ খায়রুল ইসলাম ও প্রচার সম্পাদক আব্দুল জলিল।

এ ছাড়া কালিগঞ্জ উপজেলা ডেকোরেটর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি সদস্য সিরাজুল ইসলাম, শরিফুল ইসলাম ছোটসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন।

সভায় সাংবাদিক ইশারাত আলী, এস. এম. আহম্মদ উল্লাহ বাচ্চু, জাহাঙ্গীর হোসেন, ফজলুল হক, শিমুল হোসেন, তাপস কুমার ঘোষ, শাহাদাত হোসেন, আলমগীর হোসেন, শ্রী মহাদেব দও, শ্রী সুমন কুমার আশিক, আনারুল ইসলাম, মিখাইল হোসেন ও রাকিব হোসেনসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ডেকোরেটর মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ ও সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় কালিগঞ্জ ছাড়াও শ্যামনগর, দেবহাটা, আশাশুনি, কলারোয়া ও সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ডেকোরেটর মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ ও সদস্যরা অংশ নেন।

বক্তারা বলেন, ডেকোরেটর ব্যবসা জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত। বিয়ে, সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে ডেকোরেটর ব্যবসায়ীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অথচ এই খাতে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে অতিরিক্ত কম দামে কাজ নেওয়ার প্রবণতা ব্যবসায়ীদের অস্তিত্বের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জেলা ডেকোরেটর মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, ডেকোরেটর ব্যবসা এখন নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খরচ বাড়ছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে কাজের রেট কমে যাচ্ছে। এভাবে চললে ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারবেন না। তাই ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবসায়িক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। জেলা সমিতির নির্ধারিত রেটের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সবাইকে কাজ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, একজন ব্যবসায়ী আরেকজনের প্রতিদ্বন্দ্বী নন, বরং একই পেশার সহযোদ্ধা। পারস্পরিক সহযোগিতা, সৌহার্দ্য ঐক্য বজায় রাখতে পারলে এই খাতকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। সংগঠন শক্তিশালী হলে ব্যবসায়ীদের ন্যায্য অধিকার স্বার্থ রক্ষাও সহজ হবে।

বক্তারা বলেন, শুধু রেট নির্ধারণ করলেই হবে না, তা বাস্তবায়নে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। কেউ যেন অস্বাভাবিক কম দামে কাজ নিয়ে অন্য ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মুখে না ফেলেন, সেদিকেও নজর দিতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, সহযোগিতা ও সংগঠনের সিদ্ধান্ত মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সভা শেষে ডেকোরেটর ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সমস্যা পর্যায়ক্রমে সমাধান, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

তিন দশক আগে ‘রাজকীয় সাজসজ্জা’র স্বপ্ন নিয়ে যে ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের পরিবর্তনে তার চিত্রও পাল্টেছে। তবে ডেকোরেটর ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস, প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতা, বিভক্তির বদলে ঐক্য এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠিত হলে এ খাত আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে কালিগঞ্জের ডেকোরেটর ব্যবসা নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাবে-এমন প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্টদের।