হাতে বুশরা গ্রুপের মানি রিসিট, কাগজে টাকা জমা দেওয়ার প্রমাণ, অথচ পাওনা ফেরত চাইতে গিয়ে গ্রাহকের হাতে উঠছে না সেই টাকা। একদিকে বছরের পর বছর আমানত আটকে থাকার অভিযোগ, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির কথিত পরিচালনা পর্ষদের তালিকায় নাম আছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই বলছেন স্বাক্ষর তাঁদের নয়। কুতুব উদ্দীন আহমদ ও মো. আব্দুল গফফারের পৃথক লিখিত প্রতিবাদে নতুন করে সামনে এসেছে বুশরা গ্রুপের আর্থিক লেনদেন, পরিচালনা পর্ষদের বৈধতা ও নথিপত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন।
রসিদ যদি সত্য হয়, পাওনা যদি স্বীকৃত হয়, তাহলে টাকা কোথায়? আর যে পর্ষদ গ্রাহকদের অর্থের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই পর্ষদই যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, তাহলে দায় নেবে কে? একারনে বুশরা গ্রুপের আর্থিক লেনদেন ও কথিত পরিচালনা পর্ষদ তদন্তে সাতক্ষীরার সব এমপি ও ডিসির হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সংশ্লিষ্ট গ্রাহক ও অভিযোগকারীরা।
এরই মধ্যে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি কথিত পরিচালনা পর্ষদের তালিকায় নিজেদের নাম দেখতে পেয়ে কুতুব উদ্দীন আহমদ ও মো. আব্দুল গফফার পৃথক লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, তাঁরা বুশরা ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির ওই পরিচালনা পর্ষদের সদস্য নন। এমনকি তালিকায় তাঁদের নামে ব্যবহৃত স্বাক্ষরও তাঁদের নয় বলে তাঁরা লিখিতভাবে দাবি করেছেন।
দুজনই বিষয়টির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে এখন বুশরা গ্রুপকে ঘিরে দুটি প্রশ্ন পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে: গ্রাহকের টাকা নেওয়ার প্রমাণ হিসেবে মানি রিসিট আছে, তাহলে টাকা ফেরত নেই কেন? আর পরিচালনা পর্ষদের তালিকায় নাম আছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই যদি বলেন তাঁরা সদস্য নন এবং স্বাক্ষর তাঁদের নয়, তাহলে ওই তালিকা তৈরি করল কে? মানি রিসিট আছে, টাকা নেই কেন?
বুশরা গ্রুপের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের একটি বড় অভিযোগ হলো, তাঁরা প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা দিয়েছেন এবং তার বিপরীতে মানি রিসিটও পেয়েছেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় বা দাবি অনুযায়ী সেই অর্থ ফেরত পেতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন গ্রাহকের হাতে থাকা মানি রিসিট শুধু একটি কাগজ নয়। সেটি যদি প্রতিষ্ঠানের বৈধ রসিদ হয়ে থাকে, তাহলে তার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানের হিসাবখাত থাকার কথা। প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ কোথায় গেল?
কত টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে? কত টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে? কত টাকা এখনো গ্রাহকদের কাছে পাওনা? প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে কত টাকা রয়েছে? স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ কত? গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের জন্য সেই সম্পদের কী পরিকল্পনা রয়েছে? এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর না থাকলে সন্দেহ আরও বাড়বে, অভিযোগও আরও জোরালো হবে।
গ্রাহকদের হাতে থাকা মানি রিসিট ধরে বুশরা গ্রুপের সত্যতা যাচাই করা জরুরি। রসিদে প্রতিষ্ঠানের নাম, অর্থের পরিমাণ, তারিখ, স্বাক্ষর বা অনুমোদনের তথ্য থাকলে সেগুলো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার। কারণ রসিদ দিয়ে টাকা নেওয়া হয়ে থাকলে, সেই অর্থের হিসাবও থাকার কথা।
তাহলে সেই হিসাব কোথায়? গ্রাহক যদি বলেন, “আমি টাকা দিয়েছি, আমার হাতে রসিদ আছে”, আর প্রতিষ্ঠান যদি টাকা ফেরত না দেয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, গ্রাহকের পাওনা স্বীকার করা হচ্ছে কি না? স্বীকার করা হলে পরিশোধ করা হচ্ছে না কেন? আর স্বীকার না করলে, প্রতিষ্ঠানের দেওয়া রসিদের ব্যাখ্যা কী? এখানেই প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত।
তার ওপর পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে ‘নাম আছে, স্বাক্ষর নেই’ বিতর্ক। গ্রাহকদের আমানত ফেরতের প্রশ্নের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে বুশরা গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদের একটি তালিকা। প্রতিবেদকের হাতে থাকা কুতুব উদ্দীন আহমদ ও মো. আব্দুল গফফারের পৃথক লিখিত প্রতিবাদপত্রে তাঁরা জানিয়েছেন, প্রকাশিত তালিকায় তাঁদের নাম থাকলেও তাঁরা ওই পরিচালনা পর্ষদের সদস্য নন।
তাঁদের আরও দাবি, তালিকায় ব্যবহৃত স্বাক্ষর তাঁদের নয়। যদি তাঁদের বক্তব্য তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোন নথির ভিত্তিতে তাঁদের নাম পরিচালনা পর্ষদের তালিকায় যুক্ত করা হলো? কে ওই তালিকা প্রস্তুত করল? কে অনুমোদন দিল? তাঁদের নামে থাকা স্বাক্ষর কোথা থেকে এলো? ওই তালিকা কি কোনো সরকারি, ব্যাংকিং বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দাখিল করা হয়েছিল? তাঁদের নাম ব্যবহার করে কোনো সিদ্ধান্ত বা আর্থিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল কি না? এগুলোর কোনো প্রশ্নই এখন ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
‘পর্ষদ’ কার, সিদ্ধান্ত কার? একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদই যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, তাহলে আরও বড় প্রশ্ন সামনে আসে। গ্রাহকদের অর্থ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কারা নিয়েছেন? যে ব্যক্তিরা পরিচালক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন, তাঁদের নিয়োগের বৈধ নথি কোথায়?
পর্ষদ গঠনের রেজুলেশন কোথায়? সদস্যদের সম্মতিপত্র কোথায়? পরিচালকদের স্বাক্ষরযুক্ত মূল নথি কোথায়? কোম্পানির আর্থিক সিদ্ধান্তের সভাগুলোর কার্যবিবরণী কোথায়? গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ নিয়ে পরিচালনা পর্ষদের কোনো সিদ্ধান্ত থাকলে সেটি কী? এখন প্রয়োজন বক্তব্যের চেয়ে নথি।
বুশরা গ্রুপকে ঘিরে গ্রাহকদের আমানত ফেরতের অভিযোগ, মানি রিসিট থাকা সত্ত্বেও টাকা না পাওয়ার অভিযোগ এবং পরিচালনা পর্ষদের তালিকায় নাম-স্বাক্ষর ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি এখন স্থানীয় পর্যায়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রশাসনিক নজরদারির দাবি রাখে। গ্রাহকদের স্বার্থে সাতক্ষীরা জেলার সব সংসদ সদস্য এবং জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করা হচ্ছে।
তাঁদের প্রতি প্রশ্ন, সাতক্ষীরার কত মানুষ বুশরা গ্রুপে অর্থ জমা দিয়েছেন? তাঁদের মোট পাওনা কত? কতজন টাকা ফেরত পেয়েছেন? কতজন এখনো অপেক্ষায়?
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, গ্রাহক ও নথিপত্র যাচাই করে একটি স্বচ্ছ চিত্র বের করার দাবী জানিয়েছে গ্রাহকরা। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ও আর্থিক তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে বুশরা গ্রুপের আর্থিক লেনদেন, গ্রাহকদের আমানত, সম্পদ, দায় এবং পরিচালনা পর্ষদের বৈধতা যাচাইয়ের দাবি উঠছে। তারা বলছে ভুক্তভোগী গ্রাহকের হাতে যদি টাকা জমা দেওয়ার বৈধ রসিদ থাকে, তাহলে তাঁর পাওনা নিয়ে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হওয়া উচিত নয়।
গ্রাহকরা বুশরার কাছে এখন ১০টি সরাসরি প্রশ্ন রেখেছে: ১. গ্রাহকদের কাছ থেকে মোট কত টাকা নেওয়া হয়েছে? ২. বর্তমানে গ্রাহকদের মোট পাওনা কত? ৩. গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী? ৪. গ্রাহকদের দেওয়া মানি রিসিটের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানের হিসাব কোথায়? ৫. প্রতিষ্ঠানের বর্তমানে মোট সম্পদের পরিমাণ কত? ৬. প্রকাশিত পরিচালনা পর্ষদের তালিকা কে তৈরি করেছে? ৭. কুতুব উদ্দীন আহমদ ও আব্দুল গফফারের নাম ওই তালিকায় কীভাবে এলো? ৮. তাঁদের নামে ব্যবহৃত স্বাক্ষরের মূল নথি কোথায়? ৯. পরিচালনা পর্ষদের প্রকৃত সদস্য কারা? ১০. গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত কোন বৈধ পরিচালনা পর্ষদ নিয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু গ্রাহকদের নয়, সাতক্ষীরার প্রশাসন ও সাধারণ মানুষেরও জানার অধিকার রয়েছে।
বুশরা গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্ত ছাড়া চূড়ান্তভাবে বলা সম্ভব নয়। একইভাবে কুতুব উদ্দীন আহমদ ও মো. আব্দুল গফফারের স্বাক্ষর ব্যবহারের অভিযোগও তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ায় যাচাই হওয়া প্রয়োজন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, গ্রাহকের হাতে যদি মানি রিসিট থাকে, তাহলে সেই অর্থের হিসাব চাইতেই পারেন গ্রাহক।
আর পরিচালনা পর্ষদের তালিকায় যদি এমন ব্যক্তির নাম ও স্বাক্ষর থাকে, যাঁরা লিখিতভাবে তা অস্বীকার করছেন, তাহলে সেই তালিকার সত্যতাও যাচাই করতেই হবে। এখন প্রয়োজন কারও বিরুদ্ধে আগাম রায় নয়, নথি খুলে দেখা। প্রয়োজন গ্রাহকদের আমানতের পূর্ণ হিসাব। প্রয়োজন পরিচালনা পর্ষদের প্রকৃত তালিকা। প্রয়োজন রেজুলেশন ও সম্মতিপত্রের যাচাই। প্রয়োজন স্বাক্ষরের সত্যতা পরীক্ষা। প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায়ের স্বচ্ছ হিসাব।
সবশেষে প্রশ্ন একটাই: গ্রাহকের হাতে যখন বুশরার মানি রিসিট, তখন সেই টাকার হিসাব কোথায়? আর যে পরিচালনা পর্ষদের হাতে গ্রাহকদের অর্থের সিদ্ধান্ত, সেই পর্ষদই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে গ্রাহকের আমানতের দায় নেবে কে?
সাতক্ষীরার সব সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসকের কাছে তাই ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি, বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
বুশরা গ্রুপ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।