সারাজীবনের তিলে তিলে গড়া তপ্ত সঞ্চয়, প্রবাসে হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘামঝরানো রেমিট্যান্সের শেষ বিন্দুটি পর্যন্ত লুটে নিয়ে সর্বস্বান্ত করা হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে। নিরাপদ মাথা গোঁজার ঠাঁই বা একটু স্বস্তির ঠিকানার স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের রক্ত-ঘাম ঝরানো শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে বিতর্কিত আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘বুশরা ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড’। পাওনা টাকা ফেরত পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরে আজ নিঃস্ব, আজন্ম লজ্জিত ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা।
কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ মূল কর্তাব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায়, এবার আর কোনো করুণা নয়—কঠোর আইনি পথে হেঁটে ফৌজদারি আদালতে গণমামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন সর্বস্বান্ত মানুষগুলো।
সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভুক্তভোগীদের আহাজারিতে এখন চারপাশ ভারাক্রান্ত। করুণ এই বাস্তবতার নির্মম শিকার-মেয়ের বিয়ের জমানো টাকা তুলে দিয়েছিলেন যারা। কঠিন রোগ নিরাময়ের শেষ সম্বলটুকু বিনিয়োগ করেছিলেন যারা। প্রবাসের বহু বছরের দুর্বিষহ কষ্টের উপার্জিত অর্থ তুলে দিয়েছিলেন এই প্রতারক চক্রের হাতে।
আজ পরিস্থিতি এমন এক চরম অতলে গিয়ে ঠেকেছে যে, বহু পরিবারে দিনে দুবেলা খাবার জোটা নিয়েও শুরু হয়েছে তীব্র হাহাকার। অথচ গ্রাহকদের এই চরম দুর্দশার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করছে না অভিযুক্ত কোম্পানিটির কর্তাব্যক্তিরা। উল্টো পাওনা টাকা চাইতে গেলে তাদের ওপর নেমে আসছে নানা ধরনের ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। গত ২২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বুশরা ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির একটি বিতর্কিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় শেখ শরিফুল ইসলাম-কে চেয়ারম্যান এবং শেখ ইকবাল কবীর-কে ব্যবস্থাপনা পরিচালক করে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়।
হতভাগ্য গ্রাহকদের বুকভরা আশা ছিল, হয়তো তাদের বকেয়া পাওনা বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা শুধুই প্রহসন প্রমাণিত হয়েছে! নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পরও গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ বা আন্তরিকতা দেখা যায়নি। বরং আগের মতোই কালক্ষেপণ ও টালবাহানার পুরনো নীতি বজায় রেখেছে কোম্পানিটি।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই ৮ সদস্যবিশিষ্ট নতুন কমিটিতে কোম্পানির চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলামের স্ত্রী এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল কবির পলাশের স্ত্রী-কেও সংযুক্ত করা হয়েছে। পুরোপুরি পারিবারিক এই খাসমহল কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এখন চরম বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
আর কোনো ফাঁকা প্রতিশ্রুতি বা আশ্বাসের ওপর ভরসা রাখতে নারাজ ভুক্তভোগী গ্রাহকরা। তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। ফৌজদারি মামলা দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় (বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণা) অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া এখন একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে।
একই সঙ্গে কোম্পানিটির লাইসেন্স, আমানত সংগ্রহের বৈধতা এবং অর্থপাচারের বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (RJSC)-এর কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বুশরা ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান শেখ শরিফুল ইসলাম-এর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ঘিরে করা কোনো প্রশ্নেরও তিনি বিন্দুমাত্র জবাব দেননি।
ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের পরিষ্কার দাবি—সাধারণ মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে এ ধরনের নামসর্বস্ব কোম্পানির অর্থ আত্মসাৎ ও লাপাত্তা হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং অপরাধের চরম সীমা। ক্ষতিগ্রস্তদের কষ্টার্জিত অর্থ উদ্ধার এবং এই ধূর্ত সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের কঠোর আওতায় আনতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাসমূহের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।