সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলাজুড়ে রাতভর টানা বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। শ্রাবণের বৃষ্টিতে উপজেলার নলতা, ভাড়াশিমলা, দক্ষিণশ্রীপুরসহ প্রায় সব ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। রাস্তাঘাট, বসতভিটা, কৃষিজমি ও মাছের ঘের পানিতে ডুবে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক ও মৎস্যচাষীরা। বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি উঠতি আমন ধানের জমিতে পানি জমে ফসল পচে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে মাছের ঘের প্লাবিত হওয়ায় ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় রয়েছেন চাষিরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা এলেই একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে। অথচ জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের অভাবে সমস্যাটি আরও প্রকট হয়ে উঠছে। অনেক এলাকায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ দখল হয়ে গেছে। খাল, নালা ও জলাধার ভরাট করে গড়ে উঠেছে বসতভিটা, স্থাপনা এবং অপরিকল্পিত মাছের ঘের। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে পড়ে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকদের বীজতলা পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক জমিতে কয়েক দিন পানি জমে থাকলে ধানের চারা ও অন্যান্য ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে শত শত মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মাছ বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মৎস্যচাষীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
এদিকে জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে স্থানীয় বাজারেও। কালিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, মাঠ থেকে সবজি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক কৃষক জমিতে প্রবেশ করতে পারছেন না। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে মূল্য বেড়ে গেছে। এতে সাধারণ ভোক্তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের প্রধান খাল ও নালাগুলো বছরের পর বছর দখল ও ভরাট হয়ে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। অপরিকল্পিত ঘের ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক স্থানে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখার ফলে পাশের গ্রামগুলো দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, জলাবদ্ধতার জন্য কেবল প্রাকৃতিক বৃষ্টিপাত দায়ী নয়। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরগুলোর উদাসীনতাও সমানভাবে দায়ী। তাদের অভিযোগ, মৎস্য অধিদপ্তর ঘের ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। কৃষি বিভাগ কৃষকদের সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন স্লুইস গেটগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, সময়মতো পরিচালনা এবং প্রয়োজনীয় খাল পুনঃখননের অভাবে পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয়দের মতে, এখনই জরুরি ভিত্তিতে পানি সরানোর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়বে, কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে যাবে এবং বর্ষা মৌসুমে আমন ধান চাষ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এতে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না, প্রয়োজন সমন্বিত প্রশাসনিক উদ্যোগ। অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে খাল ও নালা পুনরুদ্ধার, পানি চলাচলের পথ উন্মুক্ত করা, অপরিকল্পিত ঘের ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্লুইস গেট কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, উপজেলা প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে খাল-নালা দখলমুক্ত করা, অবৈধ বাঁধ অপসারণ, জরুরি ভিত্তিতে খাল খনন এবং পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষায়, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শুধু চলতি মৌসুমের ফসল নয়, আগামী দিনের কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।