একটি রাষ্ট্র, একটি প্রশাসন কিংবা একটি প্রতিষ্ঠান কখনো একদিনে দুর্বল হয়ে পড়ে না। বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, দায়হীনতা এবং জবাবদিহির সংকট যখন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়, তখন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরের শক্তি। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের মতো কালিগঞ্জের ঘটনাপ্রবাহও সেই প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে দেশে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিরোধী মতের সংকোচন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক, দলীয়করণের অভিযোগ এবং নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন জনপরিসরে বারবার উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা ও ব্যাপ্তি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট, এই দীর্ঘ সময়ের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার দায় আজও বহন করছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

ক্ষমতা যখন দীর্ঘদিন এককেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, তখন প্রশাসনের একটি অংশের মধ্যে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যেখানে আইন নয়, প্রভাব; যোগ্যতা নয়, পরিচয়; নীতি নয়, তদবির বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। এর ফলাফল হয় ভয়াবহ। দক্ষ কর্মকর্তা নিরুৎসাহিত হন, সৎ কর্মীরা একঘরে হয়ে পড়েন, আর সুযোগসন্ধানীরা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে।

কালিগঞ্জের সাম্প্রতিক বাস্তবতায়ও এমন নানা প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। কোথাও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ, কোথাও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার সমালোচনা, কোথাও আবার রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের অভিযোগ। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ অভিযোগ উপেক্ষা করা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

একটি বড় সংকট হলো, অতীতের অনিয়মের সংস্কৃতি যদি নতুন সময়েও অটুট থাকে, তবে শুধু সরকার বদলালেই বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটে না। প্রশাসনের ভেতরে যদি সেই একই প্রভাবশালী চক্র, একই তদবিরনির্ভর মানসিকতা এবং একই দায়হীন আচরণ টিকে থাকে, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। ব্যক্তি বদলাবে, কিন্তু ব্যবস্থার রোগ থেকে যাবে।

রাজনীতির কাজ হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণ। প্রশাসনের কাজ হওয়া উচিত নিরপেক্ষভাবে সেই নীতি বাস্তবায়ন। কিন্তু যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রশাসনিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে, কিংবা প্রশাসন নিজেই সিদ্ধান্তহীনতা ও জবাবদিহির সংকটে পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। উন্নয়ন থেমে যায়, সেবা ব্যাহত হয়, আর দুর্নীতিবাজরা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

দুর্নীতি কখনো একা আসে না। এর সঙ্গে আসে ভয়, নীরবতা, তদবির, পক্ষপাত এবং অযোগ্যতার প্রতিষ্ঠা। যে সমাজে সৎ মানুষের চেয়ে তদবিরকারীর মূল্য বেশি, সেখানে প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারে না। সেখানে জনগণের আস্থাও ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়।

আজ প্রয়োজন প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। প্রয়োজন অতীতের অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা, নিয়োগ ও পদায়নে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দল-পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবস্থা নেওয়া। যে অনিয়মই হয়ে থাকুক, যে সময়েই হয়ে থাকুক, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করাই আইনের শাসনের দাবি।

সতেরো বছরের যে অভিযোগ, ক্ষোভ ও বঞ্চনার কথা মানুষ বলে আসছে, তার বিচার ইতিহাস করবে। কিন্তু বর্তমানের দায়িত্ব বর্তমানকেই নিতে হবে। যদি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়া হয়, যদি প্রশাসনকে সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা না যায়, তবে নতুন সময়েও পুরোনো সংকটই নতুন মুখোশ পরে ফিরে আসবে।

বাংলাদেশের মানুষ প্রতিশোধের রাজনীতি চায় না। তারা চায় সুশাসন, নিরপেক্ষ প্রশাসন, দুর্নীতির বিচার এবং এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না। সেটিই হোক আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।