মোঃ ইশারাত আলী : 

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে জলাবদ্ধতা এখন আর কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা নয়, বরং দীর্ঘদিনের দখল,  ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনাহীনতার ফল বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানি জমতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাওয়া খাল, অকার্যকর স্লুইজ গেট, অপরিকল্পিত ঘের ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের সংস্কারহীন পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের হাজার হাজার একর ফসলি জমি, মৎস্যঘের ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে, স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক, মৎস্যচাষী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আদি যমুনা, কাঁকশিয়ালী, গলঘেষিয়া, কালিন্দী, ইছামতী ও সোনাই নদীর সঙ্গে সংযুক্ত অসংখ্য খালের স্বাভাবিক প্রবাহ আজ বাধাগ্রস্ত। কোথাও খাল দখল হয়েছে, কোথাও ভরাট করা হয়েছে, আবার কোথাও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণে পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হয়েছে। ফলে নদীতে জোয়ার-ভাটা স্বাভাবিক থাকলেও বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না।

স্থানীয়দের দাবি, গত ২৫ বছরে অন্তত ৬০টি খাল দখল হয়ে গেছে। আরও অনেক খাল দখলের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে কয়েকটি খালের শ্রেণি পরিবর্তন করে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করা হয়েছে। কোথাও আবার খাল ভরাট করে প্লট আকারে বিক্রি করা হয়েছে। এ কারণে এক সময়ের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের নেটওয়ার্ক আজ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।

জলাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অপরিকল্পিত ঘের ব্যবস্থা। স্থানীয়দের ভাষ্য, কৃষিজমিতে যেভাবে মাছের ঘের গড়ে উঠেছে, তাতে বহু খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ঘের মালিকদের কারণে পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হলেও কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পান না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কুলতলী থেকে কাঁকশিয়ালী নদী হয়ে গলঘেষিয়া নদীর কালিকাপুর পর্যন্ত প্রায় ৬১ কিলোমিটার এলাকায় অসংখ্য খাল রয়েছে। আবার কালিগঞ্জ সদর থেকে কাঁকশিয়ালী হয়ে বাঁশতলা ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ২৭ কিলোমিটার নদীপথের দক্ষিণ পাশে প্রায় ৫০টি ছোট-বড় খাল এবং ১০টির বেশি স্লুইজ গেট রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসবের অধিকাংশই এখন কার্যকারিতা হারিয়েছে।

উপজেলার বিলগুল্লি, মাচুর, খারহাট, সুইলপুর, সাতবসু, খাঞ্জিয়া, বসন্তপুর, গোলখালী, আমিয়ান, আমবাড়ি, তাড়ালী, তেতুলিয়া, ঘুশুড়ী, বরেয়া, সুন্দরখালী, হাড়দ্দা, ডেমরাইল, বাহাদুরপুর, কুলতলী, পরাণপুর, উত্তর শ্রীপুর, গোবিন্দকাঠি, কুমারখালী, ইউসুফপুর, কালিকাপুর, সাপখালী, ঝুরঝুরিয়া, পুটিমারি, শুকরোখালী, ঝাউতলী, নিমতলী, সন্ন্যাসীর চক, বালিয়াডাঙ্গা, জালালতলা, সন্ধ্যার খাল, ঝপঝুপিয়া ও বাগারখালীসহ অসংখ্য খাল পুনরুদ্ধার করা গেলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।

স্থানীয়দের ভাষ্য, অধিকাংশ স্লুইজ গেট নির্মিত হয়েছে ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে। মাত্র ৫ থেকে ৬ ফুট প্রশস্ত এসব স্লুইজ গেট এখনকার পানি প্রবাহের তুলনায় অপ্রতুল। অনেকগুলোর যন্ত্রাংশ নষ্ট, কোথাও পলি জমে কার্যকারিতা কমে গেছে, আবার কোথাও দুই পাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। দীর্ঘদিনেও এসব স্লুইজ গেট আধুনিকায়নের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।

গত বর্ষা মৌসুমে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনুজা মন্ডল ঠেকরা চৌমুহনী থেকে খেজুরতলা পর্যন্ত বড় খাল দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। জরিপ শেষে উচ্ছেদ অভিযানের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর বদলির পর সেই উদ্যোগ থেমে যায়।

ঠেকরা গ্রামের হারুন অর রশিদ অভিযোগ করে বলেন, এলজিইডি একটি সড়ক নির্মাণের সময় প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ একটি গুরুত্বপূর্ণ খালের পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে প্রতিবছর বর্ষায় বিস্তীর্ণ মৎস্যঘের তলিয়ে যায় এবং কৃষক ও মৎস্যচাষীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন।

তারালী ইউনিয়নের গোলখালী গ্রামের আব্দুস ছাত্তার বলেন, কাঁকশিয়ালী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত আমিয়ান ও গোলখালী খাল পুনঃখনন করা হলে পুরো এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অনেকটাই সচল হবে।

ঘের ব্যবসায়ী জিন্নাত আলী খান বলেন, শুকনো মৌসুমে ঘেরে পানি তুলতে পারেন না, আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানি বের হওয়ার পথ না থাকায় মাছ ভেসে যায়। এতে প্রতিবছর লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।

নদী ও খাল নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা অ্যাডভোকেট জাফর উল্যাহ ইব্রাহিম বলেন, একসময় কালিগঞ্জে শতাধিক খাল ছিল, যা পাঁচটি নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। সেই প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এখন প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। তাঁর মতে, খাল দখলমুক্ত করা, পুনঃখনন এবং অবৈধ বন্দোবস্ত বাতিল ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

এদিকে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাল খননের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড ৩৩টি, এলজিইডি ১১টি এবং বিএডিসি ১৬টি খালের তালিকা করেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, তালিকার বাইরে এখনো শতাধিক খাল এবং প্রায় ৫০টি স্লুইজ গেট অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কালিগঞ্জ পওর উপ-বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন সরদার বলেন, ইতোমধ্যে ৩৩টি খাল খননের তালিকা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে খনন এবং পুরোনো রেগুলেটর ও স্লুইজ গেট সংস্কারের কাজ করা হবে। সরকারের চলমান উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই, বর্ষা তো শুরু হয়ে গেছে। খাল ও স্লুইজ গেট সচল করার কাজ শেষ হওয়ার আগেই যদি টানা বৃষ্টি নামে, তাহলে কালিগঞ্জের বিস্তীর্ণ জনপদকে আরেকটি ভয়াবহ জলাবদ্ধতার দুর্ভোগই কি অপেক্ষা করছে?