মোঃ ইশারাত আলী :
ঈদের আগে আগে উপজেলা চত্বরে এক অদ্ভুত নীরবতা। বাতাসে ফাইলের ধুলো ওড়ার শব্দ নেই, নেই তদবিরকারীদের চিরাচরিত হট্টগোল। চারদিকে শুধু একটা সুবাস-তা হলো ‘বিশেষ চা’য়ের সুবাস।
সরকারি দপ্তরে পিয়নেরা আজকাল আর ফাইল নিয়ে দৌড়ায় না, তারা দৌড়ায় ট্রে-হাতে। তবে এই চায়ের কাপে চিনির চেয়ে ‘হিসাবের মিষ্টি’ আর লিকারের চেয়ে ‘গোপন সমঝোতার রঙ’ একটু বেশি কড়া।
চায়ের দোকানে এক কাপ চায়ের দাম সর্বোচ্চ ১০ থেকে ২০ টাকা। কিন্তু আমাদের এই বিশেষ উপার্জনের চা-চক্রে অর্থনীতির সমস্ত সূত্র মার খেয়ে যায়। সম্পর্কের গভীরতা এবং ‘তথ্য গোপন রাখার যোগ্যতা’র ওপর ভিত্তি করে চায়ের কাপের মূল্য নির্ধারিত হয়। চলুন দেখে নেওয়া যাক এই চত্বরের চা-বাজারের সর্বশেষ দরদাম
প্রাথমিক চা (রং চা) ছোটখাটো সোর্স বা নবীন তথ্যসংগ্রাহক ৫০০ -১,০০০ টাকা| কড়া চা / কপি-মাঝারি গোছের রাজনৈতিক কর্মী ২,০০০ – ৩,০০০, স্পেশাল মালাই চা ঝানু সাংবাদিক (যারা ফাইল দেখেও না দেখার ভান করেন) | ৫,০০০ -১০,০০০ |
এই চায়ের বিল কিন্তু কোনো বিকাশ বা ক্যাশে পরিশোধ হয় না। এর জন্য রয়েছে একটি অত্যন্ত পরিশীলিত মাধ্যম-‘হলুদ খাম’। খামের ওপর অত্যন্ত নিখুঁত ও ভালোবাসা মাখানো ফন্টে চা-খোরের নাম লেখা থাকে। দেখে মনে হবে যেন ঈদের শুভেচ্ছা কার্ড, কিন্তু ভেতরে থাকে অফিসারদের অপকর্ম ঢাকা দেওয়ার এক জাদুকরী ‘টনিক’।
উপজেলা চত্বরে শুধু যে লিকুইড চা-ই পাওয়া যায়, তা কিন্তু নয়। যাদের ‘তেল মারার’ ক্ষমতা একটু বেশি, তাদের জন্য রয়েছে উপরি পাওনা। চত্বরের ফলজ গাছের সবচেয়ে মিষ্টি আমটি লগি দিয়ে পেড়ে লুকিয়ে রাখা হয় সেই বিশেষ পছন্দের মানুষের জন্য।
খামের পাশাপাশি বাড়ি চলে যায় ঈদের বিশেষ বাজার। সেখানে এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গের সুবাসের সাথে থাকে খাঁটি সয়াবিন তেল। তবে নীতি হলো-“আপনি যত ভালো তেল মারতে পারবেন, আপনার সংসারে তেলের অভাব তত কম হবে।”
আমি অবশ্য এবার বড় বাঁচা বেঁচে গেছি। মাত্র দুই কাপ চা খেয়েছি-তাও একদম স্বল্পমূল্যের, লিকার চা বলা চলে। আর এক কাপের অফার এসেছিল, কিন্তু পেটের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দিয়েছি। ফ্রি পেলেই কি আর 'ডিজিটাল চা' হজম করা যায়?
আমার যেসব পরম শ্রদ্ধেয় সরকারি ও বেসরকারি বন্ধুরা এই বিশেষ হলুদ খামের চা নিয়মিত খাচ্ছেন, তাদের জন্য রইল অন্তহীন শুভকামনা। আপনারা সত্যিই আশীর্বাদপুষ্ট, আপনাদের জীবন ধন্য!
ধরুন, ৬ কোটি টাকার একটি গ্রামীণ রাস্তার উন্নয়ন প্রকল্প পাস হলো। সেখান থেকে ঠিকাদার আর অফিসারের কল্যাণে যে ‘এক কাপ চা’ আপনার হলুদ খামে এসে পৌঁছাল, তা আপনার পরিবারের জন্য হয়তো অত্যন্ত ‘বরকতময়’। কিন্তু আফসোস, ওই ভাঙাচোরা রাস্তার হাজার হাজার মানুষ কিন্তু এক ফোঁটা পানিও পেল না! তাদের কপালে রইল শুধু ধুলাবালি।
ভাই সব, চা না খেলে হয়তো এই জমানায় চলাই মুশকিল। সমাজে টিকে থাকতে হলে একটু-আধটু চা-পানের অভ্যাস করতেই হয়। তবে একটা বন্ধুসুলভ পরামর্শ দিয়ে যাই-বেশি পঁচা, বাসি কিংবা দুর্গন্ধযুক্ত চা খাবেন না।
যে চায়ের গন্ধ বেশি দূর ছড়ায়, সেই চা খেলে কিন্তু যেকোনো সময় পেট নষ্ট হতে পারে। আর তখন কিন্তু ‘হলুদ খাম’ দিয়েও সেই পেটের রোগ সারানো যাবে না। শরীর সহ্য না করলে সেই চায়ের কাপে চুমুক না দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সবাইকে ‘হলুদ খাম’ ও ‘বিশেষ চা’ মুক্ত (কিংবা যুক্ত!) পবিত্র ঈদুল আজহার অগ্রিম শুভেচ্ছা!