মোঃ ইশারাত আলী:
কালিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণশ্রীপুর ইউনিয়নের উত্তরশ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ রোববার (১ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জনসমুদ্রে রূপ নেয়। মাঠজুড়ে মানুষের ঢল, স্লোগানের গর্জন, মিছিলের ঢেউ - সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে একটি নামই বারবার ফিরে আসে - অধ্যাপক ডা. শহিদুল আলম।
ফুটবল প্রতীককে ঘিরে এই জনস্রোত নিছক একটি নির্বাচনী সভা নয়; বরং এটি হয়ে ওঠে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা প্রত্যাশা, ক্ষোভ আর বিশ্বাসের প্রকাশ। রাজনৈতিক সমীকরণের প্রতিফলন?
জনসভায় আসা অনেকেই তাকে ডাকেন “গরিবের ডাক্তার” নামে। কারও মুখে শোনা যায় -
“টাকা না থাকলেও তিনি চিকিৎসা দিয়েছেন।” কারও কণ্ঠে শোনা যায় - “কাউকে তিনি ফিরিয়ে দেননি।”
জনসভায় সবার দাবি, প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি সাতক্ষীরার মানুষের চিকিৎসাসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন - ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন মানুষের আপনজন। রাজনীতির বাইরেও তার এই মানবিক পরিচয়ই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। সেই সম্পর্কেরই প্রতিফলন এখন ভোটের মাঠে।
সভাস্থলের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মধ্যবয়সী নারী চোখ মুছতে মুছতে বলেন, “ডাক্তার সাহেব না থাকলে আমার মা বাঁচতো না। টাকা ছিল না, তবু চিকিৎসা দিছে।” এ রকম গল্প ছড়িয়ে আছে কালিগঞ্জ - আশাশুনির অলিগলিতে। কেউ বলেন, ফ্রি চিকিৎসা দিয়েছেন। কেউ বলেন, প্রেসক্রিপশনের পাশাপাশি ঔষধ কেনার টাকা দিয়েছেন আবার কেউ সাহসের কথা বলেছেন। এই কারণেই মানুষ তাকে ডাকে “গরিবের ডাক্তার”।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও ডা. শহিদুল আলমের জনসভায় উপস্থিত ছিলেন রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখেরা। বক্তব্য রাখেন সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শাহাদাৎ হোসেন, জাতীয় পার্টির নেতা খান লতিফুর রহমান বাবলু, মাহবুবর রহমান, বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম, নলতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমানসহ ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের একাধিক নেতা।
এছাড়া আশাশুনি থেকে আগত বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নূরুল হক, যুবদলের আহ্বায়ক মোঃ ফিরোজ আহম্মেদ, যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ হাফিজুর রহমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
মাঠে চোখ রাখলেই বোঝা যায় প্রচারণায় সক্রিয় রয়েছে সুসংগঠিত দলীয় জনবল। সব দলের অংশগ্রহণে তিনি সুসংগঠিত স্বতন্ত্র প্রার্থী। স্থানীয় ছাত্রনেতা রেজোয়ান আহম্মেদ বলেন, “এই রাজনৈতিক সমঝোতার কারণেই ফুটবল প্রতীকের পক্ষে এত বড় গণজোয়ার তৈরি হয়েছে।”
ডা. শহিদুল আলম তার বক্তব্যে বলেন, “রাস্তাঘাট, কালভার্ট ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করবো।” এই কথাগুলো শুনে মাঠে করতালির ঝড় ওঠে। কারণ এই এলাকাগুলোতেই দীর্ঘদিনের অবহেলা আর ক্ষোভ জমে আছে। স্বাস্থ্যসেবার প্রশ্নে একজন চিকিৎসকের কাছে মানুষের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
জনসভায় চোখে পড়ার মতো ছিল নারী ও তরুণ ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তরুণী উর্মিলা বলেন, “তিনি অন্তত একজন পরিচ্ছন্ন মানুষ। তাকে বিশ্বাস করা যায়।” দীর্ঘ সময়েও তার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি, সহিংস রাজনীতির অভিযোগ নেই-বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যা প্রায় বিরল।
অধ্যাপক ডা. শহিদুল আলম আজ কেবল একজন প্রার্থী নন। তিনি কারও কাছে ঋণের কাগজ ছিঁড়ে দেওয়া ডাক্তার, কারও কাছে রাতের অন্ধকারে ভরসার মানুষ, কারও কাছে আবার আশার প্রতীক। রাজনীতির বাইরে মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা এই সম্পর্কই তার সবচেয়ে বড় পুঁজি। তিনি একদিকে মানুষের আশা, অন্যদিকে রাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দু।
ফুটবল প্রতীকের এই জোয়ার শেষ পর্যন্ত পরিবর্তনের বার্তা বহন করবে, নাকি পুরনো রাজনীতির নতুন রূপ হিসেবেই থেমে যাবে-সে উত্তর দেবে ভোটের দিন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সবাই মিলে। এখন দেখার পালা ফুটবলের গণজোয়ার গোল পোস্টের জালে কিভাবে জড়ায়।