মোঃ ইশারাত আলী :
২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে মধ্যপ্রাচ্যের রাজন্যবর্গের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কার। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি, অন্যদিকে ইরানের পাল্টা আঘাত-এই দুইয়ের মাঝে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রগুলো এখন অস্তিত্ব রক্ষার নতুন কৌশল খুঁজছে।
সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (MBS) এখন ক্ষমতার চূড়ান্ত শিখরে। ২০২৬ সালে এসে তিনি রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে-সেনাবাহিনী থেকে অর্থনীতি-সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
বাদশাহ সালমানের বয়স ৯০ ছাড়িয়ে যাওয়ায় এমবিএস কার্যত একক শাসক। তার ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে 'ভিশন ২০৩০'-এর সাফল্যের ওপর। তেল-নির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন ও প্রযুক্তি খাতে দেশকে এগিয়ে নেওয়াই তার মূল লক্ষ্য।
সাম্প্রতিক ইরান-মার্কিন যুদ্ধের প্রলয়ঙ্কারী প্রভাবে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রিয়াদ এখন ওয়াশিংটনের ওপর সামরিকভাবে আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) এখন সৌদি আরবের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন পথে হাঁটছে। ইসরায়েলের সাথে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়িয়ে তারা নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চাইছে।
ইয়েমেন এবং সুদান ইস্যুতে সৌদি আরবের সাথে আমিরাতের নীতিগত দূরত্ব বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালে আবুধাবি নিজেকে একটি স্বাধীন বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সামরিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, যা জিসিসি (GCC) জোটের ভেতর কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করছে। এই দুটি দেশ বরাবরের মতোই ভারসাম্য রক্ষার নীতি গ্রহণ করেছে।
কাতার ও ওমান এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার প্রধান সেতু হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের মার্চে ইরানি নেতৃত্বের পরিবর্তনের পর সৃষ্ট অস্থিরতা প্রশমনে দোহা ও মাসকাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই ভারসাম্য বজায় রাখার দক্ষতার ওপর।
মার্কিন ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও ইরানি ড্রোন ও মিসাইল হামলা রাজতন্ত্রগুলোর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেলের বাজারের অস্থিরতা এবং ভ্যাট (VAT) বৃদ্ধির ফলে রাজতন্ত্রের দীর্ঘদিনের 'সামাজিক চুক্তি' (বিনামূল্যে সেবা) ঝুঁকির মুখে। 'জেনারেশন এমবিএস' বা তরুণ প্রজন্ম এখন ধর্মের চেয়ে জাতীয়তাবাদ ও আধুনিকতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন আর কেবল তেলের ওপর নির্ভর করছে না। ২০২৬ সালের এই উত্তাল সময়ে তারা একদিকে যেমন আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে সামরিক নিরাপত্তার জন্য পরাশক্তিগুলোর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকছেন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি যদি সফল হয়, তবেই এই রাজতন্ত্রগুলো দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার দেখা পেতে পারে।
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ক থিঙ্ক-ট্যাংক এবং ২০২৬-এর সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন।